।।বিকে আন্তর্জাতিক ডেস্ক।।
ইরানের বিক্ষুব্ধ জনতাকে সরকারবিরোধী আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উস্কানী অব্যহত রয়েছে।
মঙ্গলবার ১৩ জানুয়ারী (স্থানীয় সময়) ট্রাম্প নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট করা এক বার্তায় ইরানের আন্দোলনরত জনতার উদ্দেশে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, ইরানের দেশপ্রেমিক জনগণ, আপনারা বিক্ষোভ-আন্দোলন কর্মসূচি চালিয়ে যান—নিজেদের জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দখল নিন। হত্যাকারী-নির্যাতনকারীদের নাম নথিবদ্ধ করুন। তাদের অনেক চড়া মূল্য দিতে হবে।
জনতাকে দেশটির জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দখল নেওয়ার নির্দেশনাও দিয়েছেন তিনি।
এদিকে ইরানে চলমান বিক্ষোভ ইস্যুতে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনা নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছে কাতার।
মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলের এই দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গতকাল এক বিবৃতিতে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনাবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে গোটা মধ্যপ্রাচ্য এবং এর আশপাশের অঞ্চলে বিপর্যয় দেখা দেবে।
গতকাল রাজধানী দোহায় কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল আনসারি বলেন, (ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে) যে কোনো প্রকার উত্তেজনাবৃদ্ধি পুরো মধ্যপ্রাচ্যে তো বটেই, এর আশাপাশের অঞ্চলগুলোতেও বিপর্যয় বয়ে আনতে পারে। এ কারণে আমরা যতদূর সম্ভব উত্তেজনা এড়িয়ে চলতে চাই।
উল্লেখ্য, গত বছর জুনে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত হয়েছিল। সে সময় ইরানের পরমাণু প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোতে বোমাবর্ষণ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। জবাবে কাতারে আল উদেইদে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল ইরান।
কাতারের ভূখণ্ডে সেটি ছিল প্রথম কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের হামলা। অবশ্যই সেই হামলাকে কাজে লাগিয়ে সে সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতির ক্ষেত্রে প্রধান মধ্যস্থতার ভূমিকায় ছিল কাতার। সে যুদ্ধবিরতি এখনও বলবৎ আছে।
গত দু’সপ্তাহ ধরে ব্যাপক আকারে সরকারবিরোধী আন্দোলন চলছে ইরানে। দিন যতো গড়াচ্ছে, আন্দোলনের মাত্রাও তত তীব্র হচ্ছে।
বর্তমানে ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়েলের মান ৯ লাখ ৯৪ হাজার ৫৫। অর্থাৎ ইরানে এখন এক ডলারের বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে ৯ লাখ ৯৪ হাজার ৫৫ ইরানি রিয়েল।
জাতীয় মুদ্রার এই দুরাবস্থার ফলে দীর্ঘদিন ধরে ভয়াবহ মূল্যস্ফীতি চলছে ইরানে। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদাগুলো মেটাতে রীতিমতো হিমসিম খাচ্ছেন ইরানের সাধারণ জনগণ।
এই পরিস্থিতিতে গত গত ২৮ ডিসেম্বর মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে ধর্মঘটের ডাক দেন রাজধানী তেহরানের বিভিন্ন বাজারের পাইকারি ও খুচারা ব্যবসায়ীরা। সেই ধর্মঘট থেকেই বিক্ষোভের সূত্রপাত।
এরপর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে ইরানের ৩১টি প্রদেশের প্রায় সবগুলো শহর-গ্রামে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভ এবং দিনকে দিন বিক্ষোভের তীব্রতা বাড়তে থাকে। বর্তমানে পুরো দেশকে কার্যত অচল করে দিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা।
বিক্ষোভ দমন করতে দেশজুড়ে ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে ইরানের ইসলামিক প্রজাতন্ত্র সরকার। সেই সঙ্গে পুলিশ ও নিরাপত্তাবাহিনীর পাশাপাশি সেনাবাহিনীও মোতায়েন করা হয়েছে। বিক্ষোভকারী ও সামরিক সদস্যদের মধ্যকার সংঘাতে এ পর্যন্ত ১২ হাজার মানুষের প্রাণ গেছে বলে জানা গেছে।
বিক্ষোভের শুরু থেকেই ইরানের জনগণকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়ে আসছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সর্বশেষে গত কাল মঙ্গলবার ইরানি জনতাকে বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘শিগগিরই মার্কিন সহায়তা আসছে’।
এদিকে ইরানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মার্কিন বাহিনী ইরানে হামলা চালালে তারা মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা করবে ইরানের সেনাবাহিনী।
এরই মাঝে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গতকাল ট্রুথ সোশ্যালের পোস্টে তিনি বলেন, ইরানে বিক্ষোভ দমন করতে নির্বিচারে গুলি চালানো হচ্ছে। এই নির্বোধ হত্যা যতদিন না বন্ধ হয়, ততদিন পর্যন্ত ইরানের কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে আমি বৈঠক করব না। (ইরানের বিক্ষোভকারীদের জন্য) সহযোগিতা আসছে। ইরানকে আবার মহান করে তুলুন (মিগা-মেইক ইরান গ্রেট এগেইন)।
ট্রুথ সোশ্যালে এই পোস্ট দেওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন ও দপ্তরে সাংবাদিকরা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে জানতে চান, নিজের পোস্টে ‘সহযোগিতা আসছে’ বলতে কী বুঝিয়েছেন তিনি।
জবাবে ট্রাম্প বলেন, আমি দুঃখিত (আপনাদের এ ব্যাপারে বলতে পারব না)। আপনাদের এটা খুঁজে বের করতে হবে।
তবে পরে একই দিন মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য অভিযান সম্পর্কিত এক প্রশ্নের উত্তরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, ইরানে হতাহত সংক্রান্ত যাচাইকৃত তথ্য এখনও যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আসেনি। মূলত এ কারণেই ইরানে সম্ভাব্য হামলার ব্যাপারে এখন পর্যন্ত স্থির সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি ওয়াশিংটন।
তবে ইরানে সামরিক অভিযান চালানোর সম্ভাবনা নাকচ করেননি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। সিবিএসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, শেষ খেলা হলো জয়, আর আমি জিততে ভালবাসি।
সূত্র : আলজাজিরা, আরটি, সিবিএস