।।বিকে আন্তর্জাতিক ডেস্ক।।
হরমুজ প্রণালিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। একদিকে ইরানি গণমাধ্যম মার্কিন যুদ্ধজাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি করেছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র সেই দাবি সরাসরি অস্বীকার করেছে।
একই সঙ্গে উভয়পক্ষের সামরিক প্রস্তুতি, পাল্টা হুমকি এবং কূটনৈতিক বার্তায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ফার্স নিউজ স্থানীয় সূত্রের বরাতে দাবি করেছে, ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলিউশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সতর্কতা উপেক্ষা করার পর জাস্ক দ্বীপের কাছে একটি মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। একই ধরনের তথ্য তাসনিম নিউজও প্রকাশ করে, যেখানে বলা হয়, ইরানি বাহিনী হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন জাহাজের অগ্রযাত্রা ঠেকিয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এই দাবি নাকচ করে জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন কোনো যুদ্ধজাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেনি। সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে সেন্টকম জানায়, মার্কিন বাহিনী ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ অভিযানের অংশ হিসেবে ওই এলাকায় কার্যক্রম চালাচ্ছে এবং ইরানি বন্দরগুলোতে নৌঅবরোধ কার্যকর করছে।
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামে একটি সামরিক উদ্যোগের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালিতে আটকেপড়া বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের সময় অনুযায়ী গতকাল সোমবার সকাল থেকে এই অভিযান শুরু হওয়ার কথা। ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি একটি ‘মানবিক পদক্ষেপ’। কারণ অনেক জাহাজে খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। তিনি হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, এ উদ্যোগে কেউ বাধা দিলে তাকে কঠোরভাবে মোকাবিলা করা হবে।
মার্কিন সেন্টকম জানিয়েছে, এ অভিযানে প্রায় ১৫ হাজার সেনা, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা-সক্ষম ডেস্ট্রয়ার এবং শতাধিক যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা হবে। তাদের লক্ষ্য, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার।
অন্যদিকে, ইরান এই উদ্যোগকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে। দেশটির সামরিক বাহিনী সতর্ক করে বলেছে, হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশের চেষ্টা করলে মার্কিন বাহিনীর ওপর হামলা চালানো হবে। এক বিবৃতিতে তারা দাবি করে, এই জলপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ইরানের সামরিক বাহিনীর এবং কোনো বিদেশি শক্তিকে এ বিষয়ে একতরফা পদক্ষেপ নিতে দেওয়া হবে না।
ইরানের পার্লামেন্ট সদস্য ও সাবেক আইআরজিসি কমান্ডার ইব্রাহিম আজিজি আরও একধাপ এগিয়ে বলেন, হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের যে কোনো হস্তক্ষেপ ‘যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন’ হিসেবে বিবেচিত হবে। তিনি দাবি করেন, এই প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ ইরানের ‘মৌলিক অধিকার’।
এদিকে, ইরান হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকার একটি মানচিত্র প্রকাশ করেছে। ফার্স নিউজে প্রকাশিত ওই মানচিত্র অনুযায়ী, ইরানের মাউন্ট মুবারক থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরার দক্ষিণাংশ পর্যন্ত এবং কেশম দ্বীপ থেকে উম্ম আল কুয়াইন পর্যন্ত একটি রেখার মধ্যবর্তী অঞ্চলকে তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা হিসেবে দেখিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এ বিষয়ে এখনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি তেলের ট্যাংকারে হামলার ঘটনা। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে, হরমুজ প্রণালিতে তাদের একটি ট্যাংকারে হামলা হয়েছে, যদিও এতে কেউ হতাহত হয়নি। তারা এই ঘটনাকে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে এবং ইরানকে উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানায়।
এদিকে, হরমুজ প্রণালিতে দক্ষিণ কোরিয়ার পতাকাবাহী একটি জাহাজ হামলার শিকার হয়েছেÑ এমন গোয়েন্দা তথ্যের সত্যতা যাচাই করছে দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার।
দেশটির বার্তা সংস্থা ইয়োনহাপ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যমতে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। তবে সরকার ঘটনার ‘সঠিক তথ্য ও সত্যতা যাচাই’ করছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি ওমান উপসাগর থেকে আটক করা ইরানি জাহাজ এমভি তুসকার ২২ জন নাবিককে পাকিস্তানে হস্তান্তর করেছে। সেখান থেকে তাদের দেশে ফেরার কথা রয়েছে। মার্কিন পক্ষ জানায়, নৌ অবরোধ ভঙ্গের অভিযোগে জাহাজটি জব্দ করা হয়েছিল, যদিও ইরান এটিকে ‘জলদস্যুতা’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
এমন উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই ইরানে তিনজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে, যাদের মধ্যে দুজনের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের হয়ে কাজ করার অভিযোগ রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও বাহ্যিক চাপÑ- দুই দিক থেকেই ইরান কঠোর অবস্থান দেখাতে চাইছে।