।।বিকে আন্তর্জাতিক ডেস্ক।।
জাপানের লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এলডিপি)-এর নেত্রী ‘সানায়ে তাকাইচি’ সংসদে ভোটাভুটির মাধ্যমে দেশটির নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন। একইসঙ্গে তিনি জাপানের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইতিহাস গড়লেন।
মঙ্গলবার ২১ অক্টোবর সংসদের নিম্নকক্ষে অনুষ্ঠিত প্রথম দফার ভোটেই ২৩৭ ভোট পেয়ে জয়লাভ করেন, যেখানে তার প্রতিদ্বন্দ্বী, সংবিধানতান্ত্রিক ডেমোক্র্যাটিক পার্টির নেতা ইয়োশিহিকো নোদা পান ১৪৯ ভোট। ফলে দ্বিতীয় দফার ভোটের প্রয়োজন হয়নি। টোকিও থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানায়।
ভোটের সময় সংসদ সদস্যরা তাকাইচিকে করতালির মাধ্যমে শুভেচ্ছা জানান। নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরেও পুরো সংসদ করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে।
এর আগের দিনই এলডিপি ও জাপান ইনোভেশন পার্টি (জেআইপি)-এর মধ্যে একটি জোট চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা তাকাইচির জয়ের পথ প্রায় নিশ্চিত করে দেয়। এই সমঝোতা তাকে বিরোধী জোটের যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রয়োজনীয় সমর্থন এনে দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, তার এই উত্থান নারীবাদের কোনো বিজয় নয়, বরং ৬৪ বছর বয়সী এই নেত্রী চলতি মাসে ক্ষমতাসীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) নেতৃত্বে এসেছেন। তিনি নিজেকে প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকেন্দ্রিক কঠোর অবস্থানের রাজনীতিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
মঙ্গলবার সকালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচিত হওয়ার আগেই তাকাইচি তার নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের প্রস্তুতি শুরু করেন। তবে জানা গেছে, জেআইপি (অন্য নাম নিপ্পন ইশিন নো কাই)-এর কোনো সদস্য নতুন মন্ত্রিসভায় থাকবেন না।
প্রাথমিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এলডিপির নেতৃত্ব নির্বাচনে তাকাইচির প্রতিদ্বন্দ্বীরা— ইওশিমাসা হায়াশি, শিনজিরো কোইজুমি এবং সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী তোশিমিতসু মোরিগি— নতুন সরকারে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রিপদ পেতে পারেন। আজ সকালে এই তিনজনই শিগেরু ইশিবার মন্ত্রিসভা থেকে একযোগে পদত্যাগ করেছেন।
এলডিপি নেতৃত্বের নির্বাচনী প্রচারণায় তাকাইচি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, তিনি ক্ষমতায় এলে বেশ কিছু নারী সংসদ সদস্যকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করবেন।
অন্যদিকে, এলডিপি–জেআইপি জোট গঠনের অন্যতম স্থপতি ও জেআইপি সংসদীয় কমিটির প্রধান তাকাশি এন্দো-কে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার কথা রয়েছে।
প্রায় ৩০ বছর ধরে সংসদের নিম্নকক্ষে দায়িত্ব পালন করে আসা তাকাইচি অতীতে ‘অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী’ হিসেবেও কাজ করেছেন।
চলতি মাসের শুরুতে তাকাইচি ক্ষমতাসীন দল এলডিপির নেতা নির্বাচিত হন। তবে তাঁর নেতৃত্বাধীন জোট সরকার ভেঙে পড়লে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রচেষ্টা ভেস্তে যায়। এর পর থেকে এলডিপি নতুন রাজনৈতিক জোট গঠনের চেষ্টা চালিয়ে আসছে, যা তাকাইচির প্রধানমন্ত্রিত্বের সম্ভাবনাকে আবারও জোরদার করে তুলেছে। এলডিপি তাকাইচিকে জোট গঠনের দায়িত্ব দিয়েছে। অবশেষে আজ ভোটাভুটিতে তাকাইচি জাপানের দুই কক্ষে নির্বাচিত হয়েছেন।
গত পাঁচ বছরের মধ্যে তাকাইচি জাপানের চতুর্থ প্রধানমন্ত্রী। তিনি এমন এক সময় ক্ষমতায় এলেন, যখন এলডিপি রাজনৈতিক কেলেঙ্কারিতে জর্জরিত। তাদের জনসমর্থনও বেশ কমে যাচ্ছে। ঠিক এমন এক সময়ে তাকাইচির জয় গুরুত্বপূর্ণ।
জাপানের ‘আয়রন লেডি’ হিসেবে পরিচিত তাকাইচি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের ঘনিষ্ঠ অনুসারী এবং তাঁর মতোই দৃঢ় রক্ষণশীল ভাবধারার রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত।
একসময় কলেজ জীবনে হেভি মেটাল ব্যান্ডের ড্রামার ছিলেন তাকাইচি। তিনি প্রয়াত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারকে নিজের রাজনৈতিক অনুপ্রেরণা হিসেবে মনে করেন।
টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক সদাফুমি কাওয়াতো এএফপি’কে বলেন, ‘তাকাইচির নির্বাচিত হওয়া রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে একধাপ অগ্রগতি হলেও তিনি পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তেমন আগ্রহী নন।’
লিঙ্গ বিষয়ে তাকাইচির মতামত এলডিপি’র রক্ষণশীল ডান ঘরানার সঙ্গে মিলে। তিনি উনিশ শতকের সেই আইন সংশোধনের বিরোধিতা করেন, যা দম্পতিকে একই পদবি ব্যবহার করতে বাধ্য করে। ফলে নারীদের অধিকাংশই স্বামীর পদবি গ্রহণ করেন।
তাকাইচি একই ব্যক্তিকে দুইবার বিয়ে করেছেন। তার স্বামী দেশটির একজন সাবেক সংসদ সদস্য। প্রথম বিবাহে তিনি স্বামীর পদবি নেন। দ্বিতীয়বার স্বামী তার পদবি গ্রহণ করেন।
কাওয়াতোর বলেন, ‘দম্পতিকে একই পদবি ব্যবহারের বিষয়টি তার মেয়াদকালে সমাধান হবে বলে মনে হয় না।’
তবে নির্বাচনী প্রচারে তাকাইচি প্রতিশ্রুতি দেন, তার মন্ত্রিসভায় লিঙ্গ ভারসাম্য ‘নর্ডিক দেশের পর্যায়ে’ উন্নীত করবেন।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ২০২৫ সালের জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট অনুযায়ী, সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ পর্যায়ে নারীর কম উপস্থিতির কারণে জাপানের অবস্থান ১৪৮টি দেশের মধ্যে ১১৮তম; বিপরীতে আইসল্যান্ড, ফিনল্যান্ড ও নরওয়ে শীর্ষ তিন স্থানে রয়েছে।
তাকাইচি জাপানে বিদেশিদের অর্থনৈতিক প্রভাব ও অপরাধ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং কঠোর নিয়ম প্রবর্তনের আহ্বান জানিয়েছেন। যা বিশ্লেষকদের মতে, অভিবাসন বিরোধী নতুন জাতীয়তাবাদী দলের দিকে চলে যাওয়া ভোটারদের ফেরানোর কৌশল।
তিনি এ মাসে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি যদি জাপানের জন্য ক্ষতিকর বা অন্যায্য প্রমাণিত হয়, তাহলে তিনি তা পুনরায় আলোচনার উদ্যোগ নেবেন।