।।বিকে রিপোর্ট।।
জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট থেকে সরে আসার পেছনে আদর্শগত ও রাজনৈতিক—উভয় কারণই দেখাল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। সেই সঙ্গে জামায়াতে ইসলামের বর্তমান নীতি শরিকদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না, তা পর্যালোচনা করতে দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে চরমোনাই পীরের দল। আর জামায়াত দৃশ্যত প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির সঙ্গে বৈঠক করার পর জাতীয় সরকার গঠনের কথা বলায় নির্বাচন পাতানো হবে কি না তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে।
শুক্রবার ১৬ জানুয়ারী বিকালে পুরানা পল্টনের নোয়াখালী টাওয়ারে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নেতৃবৃন্দ এসব কথা বলেন।
দলের মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান বলেন, এখানে (জোটে) বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী একটা বড় শক্তি ছিল—অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তাদের শক্তি-সামর্থ্য অনেক বেশি—ঠিক আছে। কিন্তু আমরা আদর্শিকভাবে নৈতিকভাবে আমরা কারোর চেয়ে দুর্বল নই।
আজকে আমাদের দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, আমরা অবাক বিস্ময়ের সঙ্গে দেখলাম—জামায়াতে ইসলামী সম্মানিত আমির জনার জনাব ডাক্তার শফিকুর রহমান তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন যে, তারা ক্ষমতায় গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন।
এবং তিনি যে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলছিলেন; সেই খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের একজন সম্মানিত নারী তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন যে, ‘আমরা আশ্বস্ত হয়েছি যে জামায়াতের আমির শরিয়া আইন প্রতিষ্ঠা করবেন না- এই ওয়াদা তিনি করেছেন, এজন্য আমরা আশ্বস্ত হয়েছি’।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব আতাউর বলেন, “এই বিষয়টা যখন আমরা জানতে পারলাম, তখন আমরা স্পষ্ট হয়ে গেলাম—আমরা যে লক্ষ্য নিয়ে চলছি, সেই লক্ষ্য অর্জিত হবে না। কারণ আজকে যখন রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাওয়ার মতো একটা পরিবেশ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে; এখন যারা প্রধান শক্তি তারাই যদি ইসলামের সুমহান আদর্শ থেকে ভিন্ন দিকে চলে যায়, যদি ইসলামি আইনের প্রতি তাদের আস্থা না থাকে—তাহলে আমরা যে কর্মী-সমর্থক নিয়ে সারা দেশে ইসলামের পক্ষে কাজ করে যাচ্ছি; এই স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে।
আজকে আমরা অবাক বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করছি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের জন্মের পর থেকে একটা মৌলিক স্লোগান ছিল যে, ‘আল্লাহর আইন চাই, সৎ লোকের শাসন চাই’। এখন যখন ক্ষমতায় যাওয়ার মতো অবস্থা তৈরি হয়েছে, তখন তারা আল্লাহর আইন থেকে সরে গেলেন!
তারা প্রচলিত আইনে রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন—এই কথা যখন ঘোষণা করলেন, তখন আমাদের প্রশ্ন জাগে যে, সারা দেশে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের এই যে আবেগ-অনুভূতি, এই বিষয়টার প্রতি তারা আসলে খেয়াল করে নাই। আমাদের যেটা মনে হয়েছে, তারা ক্ষমতাটাকেই একমাত্র মুখ্য মনে করছে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটে না গিয়ে ২৬৮ আসনে এককভাবে নির্বাচন করবে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। সেই সঙ্গে বাকি ৩২ আসনে অন্যদের সমর্থন দেবে দলটি।
মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান বলেন, এখন আমরা আসলে তাদের (জামায়াতের) ক্ষমতায় যাওয়ার পথে বাধা হতে চাই না। আমরা বিনয়ের সাথে বলতে চাই, এই প্রচলিত আইনে বিগত ৫৪ বছর রাষ্ট্র পরিচালিত হয়েছে। এই প্রচলিত আইন—শান্তি প্রতিষ্ঠায়, কল্যাণ প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়েছে। এই প্রচলিত আইন বৈষম্য তৈরি করেছে। অন্যায়-অবিচারের মূল হলো প্রচলিত আইন।
অতএব, আমরা তো সবসময় বলে আসছি প্রচলিত আইন পরিবর্তন করে সেখানে আল্লাহর দেওয়া আইন এবং ইসলামের সুমহান আইন, যেটা সকলের জন্য সমান এবং ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের অধিকার প্রতিষ্ঠা করবে; আমরা তো সেই আইন প্রতিষ্ঠার জন্যই আন্দোলন করি।
এখন শেষ মুহূর্তে যদি আমরা দেখি যে—আসলে প্রধান যে রাজনৈতিক শক্তি, আমাদের সহযোগী শক্তি ছিলেন, তারা যখন নাকি বলছেন যে—তারা সে আল্লাহর আইনের পথে চলবেন না, বরং প্রচলিত আইনেই তারা রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন; তখন আমরা আর তাদের সহযোগী হওয়ার জন্য আমরা প্রস্তুত নই।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট হবে। মনোনয়নপত্র বাছাই শেষে আপিল নিষ্পতির ধাপে রয়েছে নির্বাচন কমিশন। ২০ জানুয়ারি প্রার্থী চূড়ান্ত হবে।
নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বে যে ‘১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য’ গড়ে ওঠে, তার সূচনা ঘটে ধর্মভিত্তিক আট দলের যুগপৎ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে।
পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন এবং সংসদ নির্বাচনের আগে গণভোটের দাবিতে শুরু হয়েছিল সেই যুগপৎ আন্দোলন।
শুরুতে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), নেজামে ইসলাম পার্টি ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি) ছিল এই মোর্চায়।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলে এই মোর্চাকে নির্বাচনি জোটে রূপ দেওয়ার আলোচনা শুরু হয়। এর মধ্যে মনোনয়নপত্র জমার সময় শেষ হওয়ার আগের দিন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও এলডিপি এবং তার পরদিন এবি পার্টি এই জোটে যোগ দেয়।
জামায়াতের জোটের শরিকদের উদ্দেশে আতাউর বলেন, আমরা তাদের আবেগের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই; অনেকেরই অনেক রকম আবেগ তৈরি হয়েছিল—এই ঐক্যকে নিয়ে, আমরা তাদের প্রতি সম্মান জানাই, শ্রদ্ধা জানাই। আর বিশেষ করে এখন পর্যন্ত যারা জোটবদ্ধ আছেন সেখানে, আরো ইসলামী সংগঠন আছেন, তাদের প্রতি আমরা শ্রদ্ধা জানাই, তাদের প্রতি আমাদের কোনো বিরূপ ধারণা নেই।
তবে আমি তাদেরকে বিনয়ের সাথে অনুরোধ করব, তারা যাতে এই জামায়াতে ইসলামীর প্রধান যে বক্তব্যটা দিয়েছেন, এইটার ব্যাপারে যদি তাদের নীতি-আদর্শের সাথে সাংঘর্ষিক তারা মনে করেন (কি না), তারা যাতে এটা ক্লিয়ার হয়ে নেন।