।।বিকে আন্তর্জাতিক ডেস্ক।।
জুলাই ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পর্দার আড়ালেই রয়েছেন। মাঝে মাঝে অডিও রেকর্ড বা কথোপকথন সামনে এলেও তিনি ভিডিওতে এখনো সামনে আসেননি। রায়টার্সের সাথে ইন্টারভিউ হয় ইমেইলে প্রশ্নোত্তরে।
এরই মাঝে কদিন ধরেই জল্পনা ছিল বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনসম্মুখে হাজির হবেন। বিশেষ করে সাংবাদিকদের সামনে।
শুক্রবার ২৩ সেপ্টেম্বর সেটা হলো। কিন্তু সরাসরি বা ভিডিও মাধ্যমে নয়- এক অডিওবার্তা নিয়ে। ভারতীয় গণমাধ্যম হিন্দুস্তান বাংলার এক প্রতিবেদনে এ খবর জানা যায়।
Hasina Audio in Delhi Club: ভোটের মুখে বাংলাদেশ.. দিল্লির ক্লাব থেকে চলল হাসিনার পারদ চড়ানো অডিও বার্তা, টার্গেটে ইউনুস শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে বহুবারই বাংলাদেশ দিল্লিতে চিঠি পাঠিয়েছে বলে দাবি করতে থেকেছে ঢাকা। এবার সেই দিল্লিতেই ফরেন করেসপন্ডেন্ট্স ক্লাবের এক কর্মসূচিতে চলল শেখ হাসিনার অডিও ক্লিপ।
বাংলাদেশের অভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারানো শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের ৫ অগস্ট ভারতে আসেন। আশ্রয় নেন এদেশেই। তারপর থেকে হাসিনাকে ফেরত চেয়ে জোরালো সওয়াল করতে থাকে মহম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ। এই ইস্যুতে বহুবার সরব হয়েছে ঢাকা। এবার সেই দিল্লির মাটিতেই শেখ হাসিনার অডিয়ো ক্লিপ এল প্রকাশ্যে। যে অডিয়ো বার্তায় আগাগোড়া মুজিবকন্যা টার্গেটে রাখেন বর্তমান বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনুসকে।
মহম্মদ ইউনুসকে ‘বিদেশিদের হাতের পুতুল’ বলে উল্লেখ করে, একের পর এক তোপ দাগেন। সামনেই বাংলাদেশে ভোট। ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে ভোটের আগে, ভারতের রাজধানী দিল্লি থেকে এই অডিয়ো বার্তা উঠে আসা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা।
হাসিনার পার্টি আওয়ামি লিগ এবারের বাংলাদেশের ভোটে নেই। এদিকে, এই অডিও বার্তায় শেখ হাসিনা বলেন,’বাংলাদেশ আজ এক অতল গহ্বরের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে, একটি জাতি যা আঘাতপ্রাপ্ত ও রক্তাক্ত, তার ইতিহাসের সবচেয়ে বিপজ্জনক অধ্যায়গুলির একটি অতিক্রম করছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সর্বোচ্চ মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে জয়ী স্বদেশভূমি এখন উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তি এবং বিদেশী অপরাধীদের ভয়াবহ আক্রমণে বিধ্বস্ত। আমাদের একসময়ের শান্ত ও উর্বর ভূমি আহত, রক্তাক্ত ভূখণ্ডে পরিণত হয়েছে। সত্যি বলতে, সমগ্র দেশটি একটি বিশাল কারাগার, একটি ফাঁসির ক্ষেত্র, একটি মৃত্যু উপত্যকায় পরিণত হয়েছে।
তাঁর ভাষণে হাসিনা, একজন সুদখোর, অর্থ পাচারকারী, লুণ্ঠনকারী, এবং একজন দুর্নীতিগ্রস্ত, ক্ষমতালোভী বিশ্বাসঘাতক’ বলে ইউনুসকে উল্লেখ করেন। এখানেই শেষ নয়। পারদ চড়ানো ভাষণে শেখ হাসিনা বলেন, সর্বত্রই কেবল ধ্বংসের মধ্যে বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রামরত মানুষের আর্তনাদ শোনা যাচ্ছে। জীবনের জন্য মরিয়া আবেদন। ত্রাণের জন্য হৃদয়বিদারক আর্তনাদ। খুনি ফ্যাসিস্ট ইউনূস, একজন সুদখোর, একজন অর্থ পাচারকারী, একজন লুণ্ঠনকারী এবং একজন দুর্নীতিগ্রস্ত, ক্ষমতালোভী বিশ্বাসঘাতক, তার সর্বগ্রাসী আদর্শ দিয়ে আমাদের জাতিকে রক্তাক্ত করে তুলেছে, আমাদের মাতৃভূমির আত্মাকে কলঙ্কিত করেছে।’
তিনি বলেন, ৫ আগস্ট, ২০২৪ তারিখে, একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে, জাতীয় শত্রু, খুনি ফ্যাসিস্ট ইউনূস এবং তার রাষ্ট্রবিরোধী জঙ্গি সহযোগীরা আমাকে জোরপূর্বক ক্ষমতাচ্যুত করে, যদিও আমি সরাসরি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। সেই দিন থেকে, জাতি সন্ত্রাসের যুগে নিমজ্জিত হয়েছে, নির্দয়, নির্মম এবং শ্বাসরুদ্ধকর। গণতন্ত্র এখন নির্বাসনে।
তাঁর ভাষণে বিএনপিকেও টার্গেট করেন হাসিনা। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের নির্বাচন সম্পর্কে, তারা বলেছিল যে তারা অংশগ্রহণ করবে না। আমরা তাদের আনার চেষ্টা করেছি, কিন্তু তারা আসেনি, তারা বয়কট করেছে। আওয়ামি লীগ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে এবং জিততে পেরেছে। আজ পর্যন্ত, এই নির্বাচন সম্পর্কে তারা যে প্রশ্নগুলি উত্থাপন করে .. তারা কি একটিও অনিয়ম হয়েছে তা দেখাতে পেরেছে?’
এদিকে দিল্লির ফরেন করেসপনডেন্ট ক্লাবে তার অডিওবার্তাটি নতুন কিছু প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিপুলসংখ্যক সাংবাদিকের উপস্থিতিতে শেখ হাসিনা তার সরকারের কোনো ভুল, কোনো ভ্রান্তির প্রসঙ্গ টেনে আনেননি। ক্ষমা নয়, দুঃখও প্রকাশ করেননি। তবে নতুন কিছু প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন। যা রাজনীতিতে আলোচনার খোরাক হতে পারে। তিনি দেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে অত্যন্ত ভয়াবহ বলে বর্ণনা করেছেন। দেশটি ধংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছে এমন অভিযোগ করেছেন। তার অভিযোগের নিশানা হচ্ছেন প্রফেসর ইউনূস । হাসিনা পাঁচ দফা দাবি পেশ করেছেন এই অডিও বার্তায়।
এক, বাংলাদেশের সামনে অন্ধকার সময়। গণতন্ত্র ধংস হয়ে গেছে। অবিলম্বে গণতন্ত্র পুণরুদ্ধার করতে হবে। আর এজন্য অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগসহ সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। তবে তার ভাষায়- ইউনূস সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ হতে পারে না।
দুই, সহিংসতা ও নৈরাজ্য বন্ধ করতে হবে। বন্ধ করতে হবে রক্তপাত। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালু করতে হবে।
তিন, সংখ্যালঘুসহ নারী ও শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
চার, সাংবাদিকসহ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে।
পাঁচ, জাতিসংঘকে আনুষ্ঠানিকভাবে ’২৪-এর ঘটনাবলীর নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। কীভাবে এই ঘটনা ঘটলো তা জনগণকে জানাতে হবে।
অডিওবার্তায় শেখ হাসিনা আরো বলেন, বাংলাদেশ ইতিহাসের এক দুঃসময় পার করছে। পরিণত হয়েছে এক বিশাল কারাগারে। এছাড়া তিনি দেশি-বিদেশি চরমপন্থী গোষ্ঠীর হাত থেকে দেশকে উদ্ধার করারও আহ্বান জানান।
উল্লেখ্য যে, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। এরইমধ্যে একটি মামলায় তাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে।