।।বিকে আন্তর্জাতিক ডেস্ক।।
ফরাসি সরকারের বাজেট সংকোচন ও কৃচ্ছ্র নীতির বিরুদ্ধে দেশব্যাপী ধর্মঘট ও বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে ফ্রান্স।
বৃহস্পতিবার ১৮ সেপ্টেম্বর (স্থানীয় সময়) দেশজুড়ে অ্যান্টি-অস্টেরিটি বা অর্থনৈতিক কড়াকড়ি-বিরোধী বিক্ষোভে অংশ নেন কয়েক লাখ মানুষ।
ট্রেড ইউনিয়ন ও বামপন্থি দলগুলোর আহ্বানে বৃহস্পতিবার রাজধানী প্যারিসসহ ছোট-বড় বিভিন্ন শহরে রাস্তায় নেমে এসেছেন লাখ লাখ মানুষ। যোগ দেন শিক্ষক, ট্রেন চালক, ফার্মাসিস্ট, হাসপাতালের ক,র্মী অংশ নেয় কিশোর-কিশোরীরাও। প্যারিসসহ বেশ কয়েকটি শহরে সকাল থেকেই বিদ্যালয়ের প্রবেশপথ অবরোধ করে রাখেন তারা।
এর ফলে রাজধানী প্যারিস থেকে মার্সেই, লিওন, নান, রেনেস, মনপেলিয়ে, বোর্দো ও তুলুজসহ বড় শহরগুলোতে জনজীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
সিজিটি ইউনিয়নের প্রধান সোফি বিনে জানিয়েছেন, যতদিন না শ্রমিকদের দাবি পূরণ হচ্ছে, ততদিন আন্দোলন চলবে। তার কথায়, বাজেটের সিদ্ধান্ত রাস্তাতেই হবে।
বিক্ষোভকারীদের মূল দাবি, পূর্ববর্তী সরকারের কঠোর বাজেট পরিকল্পনা বাতিল করা। জনসেবায় ব্যয় বাড়ানো, ধনীদের ওপর উচ্চ কর আরোপ এবং অবসরের বয়স বাড়ানোর সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করার দাবিতে স্লোগানমুখর হয়ে ওঠে প্যারিসসহ বিভিন্ন নগরী।
প্যারিসে সকাল থেকেই বহু মেট্রো লাইন বন্ধ ছিল। ট্রেন চলাচল ব্যাহত হয়েছে এবং স্কুলের প্রবেশপথও বন্ধ ছিল। মার্সেইতে প্রধান সড়ক, লিওনে আবর্জনা জ্বালিয়ে রাস্তা অবরোধ করা হয়।

নানে মহাসড়ক অবরোধ করা হয়, রেনেসে একটি বাস জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, মনপেলিয়েতে রাউন্ডঅ্যাবাউট অবরোধ হলে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করে। বোর্দো ও তুলুজে ট্রেন সেবা ব্যাহত হয় এবং কয়েকটি সড়ক বন্ধ হয়।
সরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানি ইডিএফ জানায়, ভোরে ফ্ল্যাম্যানভিল পারমাণবিক চুল্লিতে উৎপাদন প্রায় ১.১ গিগাওয়াট কমে যায়।
ফ্রান্সের অর্থনীতি বর্তমানে বড় ধরনের বাজেট ঘাটতিতে জর্জরিত। গত বছর ঘাটতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমার প্রায় দ্বিগুণ। নতুন প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নু ২০২৬ সালের বাজেট পাশ করানোর চেষ্টা করছেন, তবে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় তা কঠিন। তার পূর্বসূরি ফ্রাঁসোয়া বেইরু ৪৪ বিলিয়ন ইউরোর কৃচ্ছ্র পরিকল্পনা নিয়ে সংসদে আস্থা ভোটে হেরে ক্ষমতাচ্যুত হন।
ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ধর্মঘট ও বিক্ষোভে প্রায় ৮ লাখ মানুষ অংশ নিয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সারা দেশে ৮০ হাজার পুলিশ ও জেন্ডারমেরি মোতায়েন করা হয়েছে। গ্রেফতার হন অন্তত ১৪০ জন।
এদিকে প্যারিসে মূল মিছিলের আগে কালো পোশাকধারী কিছু যুবক বস্তু নিক্ষেপ করলে পুলিশ টিয়ারগ্যাস ছোড়ে। এরপরও মিছিল অব্যাহত থাকে। ফরাসি গণমাধ্যম জানায়, লিয়ঁতে সংঘর্ষে কয়েকজন আহত হন। কয়েকটি শহরে পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, দেশজুড়ে প্রায় দেড়শ’ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুরো দিনে নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রায় ড্রোন এবং সাঁজোয়া যানও ব্যবহার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এবং নতুন প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নুর প্রতি জনগণের ক্ষোভকে স্বীকৃতি দিতে এবং বাজেট কাটছাঁটের সিদ্ধান্ত বাতিল করতে আহ্বান জানান ইউনিয়ন নেতারা। সরকার অনড় থাকলে আন্দোলন আরও জোরদার করার হুঁশিয়ারি দেন তারা।
ফ্রান্সজুড়ে এই আন্দোলন শুধু অর্থনৈতিক অসন্তোষ নয়, প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সরকারের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। ইউনিয়নগুলো জানিয়েছে, তাদের দাবি না মানা পর্যন্ত রাজপথেই সরকারের বাজেটের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ হবে।
উল্লেখ্য, ফরাসি সরকারের বাজেট সংকোচন ও কৃচ্ছ্র নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন কয়েক ধাপে বেড়ে ওঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ‘Bloquons Tout’ (Block Everything) তত্ত্বগত আন্দোলনটি মিড-২০২৫ থেকে সক্রিয় হতে থাকে। সেপ্টেম্বরের শুরুতেই তা রাস্তায় দৃশ্যমান হয়। প্রথম বড় গোলযোগ হিসেবে ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ মহাসড়ক অবরোধ, ব্যারিকেড জ্বালানো এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এরপর ইউনিয়নগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়ে ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫-এর জন্য দেশব্যাপী ধর্মঘট ও বিক্ষোভ ডাক দেয়।
এ সময় সংঘর্ষে আহত হয়েছে অন্তত তিনজন এবং গ্রেফতার করা করা হয়েছে প্রায় দেড়শোজনকে, জানায় ফরাসী মিডিয়া। আন্দোলন প্রতিরোধে এদিন প্রায় ৮০ হাজার পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিলো শহরজুড়ে।