।।বিকে রিপোর্ট।।
সিলেটে বিএনপির প্রথম নির্বাচনী জনসভার মঞ্চে উঠেছেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তবে জনসভা মঞ্চে ওঠার আগে বৃহস্পতিবার সকালে হোটেল গ্র্যান্ড সিলেটে তরুণ নেতাকর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন তারেক রহমান।
বৃহস্পতিবার ২২ জানুয়ারী দুপুর ১২টা ২৮ মিনিটে সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে জনসভা মঞ্চে পৌঁছান তিনি। মঞ্চে ওঠার সময় হাত তুলে সবাইকে অভিবাদন জানান তারেক রহমান। এ সময় হাজারো নেতাকর্মী তাকে হাত তুলে স্বাগত জানান।
তখন মাঠজুড়ে উপস্থিত নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস দেখা যায়। সেই সঙ্গে স্লোগানে-স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে জনসভার মাঠ।।‘তারেক রহমানের আগমন, শুভেচ্ছা স্বাগতম, সিলেটবাসীর পক্ষ থেকে লাল গোলাপ শুভেচ্ছা, ভোট দিব কিসে, ধানের শীষে, লাগারে লাগা, ধান লাগা’ প্রভৃতি স্লোগান দিতে থাকেন। ১২টা ৫৮ মিনিটে তারেক রহমান বক্তব্য শুরু করেন। ১টা ২৫ মিনিটে তাঁর বক্তব্য শেষ হয়।
এদিকে সকাল ১০টা ৫০ মিনিটের সময় কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে বিএনপির প্রথম নির্বাচনী জনসভার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। স্থানীয় নেতারা মঞ্চে বক্তব্য দেওয়া শুরু করেন। সিলেট জেলা ও মহানগর এবং সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির উদ্যোগে এ সভার আয়োজনে সভাপতিত্ব করছেন সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী। বিশেষ অতিথি বক্তব্য দেবেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। জনসভা সঞ্চালনা করছেন মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী ও মহানগরের সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী প্রমুখ।
তিনি বলেন, আমরা আজ এখানে একত্র হতে পেরেছি সেই মানুষগুলোর জীবনের বিনিময়ে, যারা আমাদের সকলের জন্য রাজপথে নেমে এসেছিলেন। আমরা আজ এখানে একত্র হতে পেরেছি সেই মানুষগুলোর ত্যাগের বিনিময়ে, যারা বিভিন্নভাবে নির্যাতিত, অত্যাচারিত ও পঙ্গুত্ববরণ করেছেন।
তারেক রহমান বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের মানুষ একাত্তর সালে যেভাবে দেশকে স্বাধীন করেছিল, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সেই স্বাধীনতাকে বাংলাদেশের মানুষ রক্ষা করেছে তাদের অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য।
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, এখানে বহু মুরব্বি উপস্থিত আছেন, যারা কালের সাক্ষী—শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময় কীভাবে দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র রচিত হয়েছে। বহু ভাই-বোনেরা এখানে উপস্থিত আছেন—যারা কালের সাক্ষী দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার সময় কীভাবে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের ভিত্তি রচনা করা হয়েছিল। একটু আগে আমি আমার বক্তব্যে বলেছি, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের উদাহরণ দিয়ে যে, কীভাবে এই দেশে তথাকথিত উন্নয়নের নামে দেশ থেকে মানুষের অর্থ লুটপাট করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমরা এই অবস্থার পরিবর্তন করতে চাই।
বক্তব্যের মাঝে তিনি উপস্থিত জনতার মধ্য থেকে হঠাত একজনকে মঞ্চে ডেকে আনেন। মাইকের সামনে তাঁর নামপরিচয় জনে নেন। তার হজ করেছেন কিনা জানতে চান। তিনি জানতে চান কাবার মালিক কে, সবাই সমস্বরে জবাব দেন আল্লাহ। আমরা মুসলমান সবাই, এই দ্বীন- দুনিয়ার মালিক কে? আবারও জন জোয়ারে আওয়াজ ওঠে আল্লাহ। এই গ্রহ-নক্ষত্র সকল জাহানের মালিক কে? সবাই একই আওয়াজে বলনে- আল্লাহ। বেহেশতের মালিক কে আরও জোরে আওয়াজ ওঠে আল্লাহ। জাহান্নামের মালিক কে? একই তালে উত্তর আসে আল্লাহ। তখন উনাকে বিদায় দিয়ে তারেক রহমান বলেন, আপনার সবাই স্বাক্ষী দিলেন। সকল কিছুর মালিক আল্লাহ। আরে ভাই যেটার মালিক আল্লাহ সেটা কি অন্য কেউ দেওয়ার ক্ষমতা রাখে? সবাই সমস্বরে বলেন- না। তাহলে নির্বাচনের আগে একটি দল বলছে টিকেট দিবে? কি বলছে না? সবাই বলেন- হ্যা। যেটার মালিক মানুষ না সেটার টিকেট দেয়ার বলে শিরকি করা হচ্ছে, নির্বাচনে জেতার জন্য বেহেশতের টিকেট বিক্রি করে! এটা স্পষ্ট শিরক। কারণ এর মালিক একমাত্র আল্লাহ। শুধু আল্লাহর অধিকার সবকিছুর উপর।
পর ধানের শীষকে জয়যুক্ত করতে আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, প্রিয় ভাই-বোনেরা আপনারা কি আছেন আমার সঙ্গে এই অবস্থার পরিবর্তন করতে? প্রিয় ভাই-বোনেরা আমরা সারা বাংলাদেশের কৃষক ভাইদের পাশে দাঁড়াতে চাই। যদি ইনশাআল্লাহ আপনারা আগামী ১২ তারিখে ধানের শীষকে জয়যুক্ত করেন, করতে পারেন—আমরা ইনশাআল্লাহ সারা বাংলাদেশের কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে পারবো। দাঁড়াতে চান কৃষকদের পাশে?’
তারেক রহমান বলেন, প্রিয় ভাই-বোনেরা আমরা দেখেছি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময় যেভাবে খাল খনন করা হয়েছিল সারা বাংলাদেশে, সেই খাল খনন করার মাধ্যমে কৃষকদের সেচ সুবিধাসহ মানুষের পানির সমস্যার সমাধান হয়েছিল।
নির্বাচিত হলে আবারও খাল খনন কর্মসূচি চালু করতে চান উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘প্রিয় ভাই-বোনেরা বিএনপি ইনশাআল্লাহ ১২ তারিখের ভোটে নির্বাচিত হলে আমরা আবার খাল খনন কর্মসূচি শুরু করতে চাই। কারা কারা শুরু করতে চান?
তিনি বলেন, আমরা দেশে খাল কাটবো। দেশের নদীতে পানি নিয়ে আসবো। খালে বিলে পানি নিয়ে আসব। কেন? আপনাদের মনে আছে- কয়েক বছর আগে কীভাবে ওইপাশ থেকে পানি ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। সারা সিলেট শহর ভেসে গিয়েছিল বন্যার পানিতে। মনে আছে? সে জন্যই আমরা বলেছি, একটি কথা। আমরা দেখেছি গত ১৫/১৬ বছর কীভাবে এই দেশকে অন্য দেশের কাছে বন্ধক দিয়ে দেয়া হয়েছিল। সেজন্যই আমি বলেছি- দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, নয় অন্য কোনো দেশ । সবার আগে বাংলাদেশ।
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, প্রিয় ভাই বোনেরা- আমি আরেকটি কথা বলেছিলাম, যখন স্বৈরাচার এই দেশের মানুষের ঘাড়ে চেপে বসেছিল। সেই কথাটা ছিল, টেইকব্যাক বাংলাদেশ। মনে আছে? আমরা টেইক ব্যাক বাংলাদেশের অর্ধেক পথে, হাফ পথে এসে দাঁড়িয়েছি। দেশকে আমরা স্বৈরাচারমুক্ত করেছি। আমরা গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠার যাত্রা শুরু করেছি। এখনো সেই যাত্রা শুরু হয়নি। ১২ তারিখে ধানের শীষকে নির্বাচিত করার মাধ্যমে গণতন্ত্রের সেই যাত্রা শুরু হবে।
তারেক রহমান বলেছেন, আমরা দেখেছি বিগত ১৫-১৬ বছরে উন্নয়নের নাম করে কীভাবে দেশের মানুষের সম্পদ লুটপাট করে বিদেশে পাচার করে দেয়া হয়েছে। আজকে এই যে ঢাকা থেকে সিলেট বা সিলেট থেকে ঢাকার যে মহাসড়ক; ২০০৫ সালে আমি এসেছিলাম সুনামগঞ্জে, বন্যা হয়েছিল। আমার আসতে লেগেছিল সাড়ে ৪ ঘণ্টার মতন।
কিন্তু আজ আজ আমরা দেখি ১০ ঘণ্টার মতন সময় লাগে। সিলেটের এই পূণ্যভূমির মানুষ বহু মানুষ আছেন, যারা লন্ডনে যাতায়াত করেন; লন্ডন যেতেও এত সময় লাগে না প্লেনে করে যেতেও-এই হচ্ছে আজকে উন্নয়নের ফিরিস্তি।
তিনি বলেন, গত ১৫-১৬ বছরে আমরা দেখেছি, কীভাবে একের পর এক নির্বাচনে ব্যালট বক্স ছিনতাই হয়েছে; কীভাবে আমি-ডামির নির্বাচন হয়েছে; কীভাবে নিশি রাতের নির্বাচন হয়েছে। এবং এই নির্বাচনগুলোর মাধ্যমে, তথাকথিত নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের ভোটের অধিকার তথা রাজনৈতিক অধিকারকে কেড়ে নেয়া হয়েছিল। আজ আমরা এখানে একত্রিত হয়েছি সেই মানুষগুলোর জীবনের বিনিময়ে, যারা আমাদের সকলের জন্য রাজপথে নেমে এসেছিল।
আমরা একত্রিত হয়েছি সেই মানুষগুলোর জীবনের বিনিময়ে- যারা বিভিন্নভাবে নির্যাতিত হয়েছে, অত্যাচারিত হয়েছে। বাংলাদেশের সেই মানুষগুলোর জীবনের বিনিময়ে আজ আমরা আবার এই রাজনৈতিক অধিকার ফিরে পাওয়ার অধিকার আদায়ের পথে নেমেছি।
তারেক রহমান সিলেট ছাড়াও আজ আরও ছয়টি জেলার ছয়টি স্থানে নির্বাচনী জনসভায় যোগ দেবেন। সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে প্রধান অতিথির ভাষণ শেষে তিনি সড়কপথে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হবেন। পথিমধ্যে তিনি সিলেট-ঢাকা মহাসড়কসংলগ্ন ছয় জেলায় আয়োজিত সভায় ভাষণ দেবেন। এর মধ্যে প্রথমে মৌলভীবাজারের সদর উপজেলার শেরপুরের আইনপুর খেলার মাঠে এবং পরে হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার প্রস্তাবিত নতুন উপজেলা পরিষদের মাঠে আয়োজিত সভায় যোগ দেবেন।
পরে তারেক রহমান ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার কুট্টাপাড়া ফুটবল খেলার মাঠে, কিশোরগঞ্জের ভৈরব স্টেডিয়ামে, নরসিংদীর পৌর পার্কে এবং নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার অথবা রূপগঞ্জ গাউসিয়া এলাকায় আয়োজিত সমাবেশে যোগ দেবেন। এসব জনসভায় তিনি সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোর বিএনপি-মনোনীত ও সমর্থিত প্রার্থীদের আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয় করিয়ে দেবেন।
উল্লেখ্য, এর আগে গতকাল রাত ৮টার দিকে বিমানে সিলেট পৌঁছান তারেক রহমান। পরে হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করেন তিনি। এরপর তিনি দক্ষিণ সুরমা উপজেলার বিরাইমপুর গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে যান। সেখানে উপস্থিত নেতা–কর্মী এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখেন তারেক রহমান।