ইউরোপজুড়ে ইসরাইলি পণ্য বর্জনের আন্দোলন এখন আর সাধারণ কর্মীদের প্রতিবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণের পর্যায়ে পৌঁছেছে।
আয়ারল্যান্ডের একটি সুপারমার্কেট কর্মীর ব্যক্তিগত নৈতিক অবস্থান থেকে শুরু হওয়া এই প্রতিবাদ এখন পুরো মহাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে।
ওই কর্মী গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসনের প্রতিবাদে চেকআউট কাউন্টারে ইসরাইলি ফল ও সবজি বিক্রি করতে অস্বীকৃতি জানান। শুরুতে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলেও, ইউনিয়ন ও সাধারণ মানুষের চাপে কর্তৃপক্ষ তাকে পুনরায় কাজে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।
এই ঘটনাটি ইউরোপের অন্যান্য কর্মীদের জন্য একটি নজির হিসেবে কাজ করছে যে নৈতিক কারণে তারা ইসরাইলি পণ্য হাত দিয়ে স্পর্শ করতে বা বিক্রি করতে অস্বীকার করতে পারেন।
আয়ারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য এবং নরওয়ের মতো দেশগুলোর ট্রেড ইউনিয়নগুলো ইতোমধ্যে প্রস্তাব পাস করেছে যে কর্মীদের ওপর ইসরাইলি পণ্য নাড়াচাড়া করার জন্য জোর দেওয়া যাবে না। যুক্তরাজ্যের কো-অপারেটিভ এবং ইতালির কো-অপ অ্যালেঞ্জা ৩.০-এর মতো বড় বড় রিটেইল চেইনগুলোও গাজা যুদ্ধের প্রতিবাদে বেশ কিছু ইসরাইলি পণ্য তাদের তালিকা থেকে সরিয়ে নিয়েছে।
অ্যাক্টিভিস্টরা ১৯৮৪ সালে আয়ারল্যান্ডের ডান স্টোরসের কর্মীদের বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন, যার ফলে আয়ারল্যান্ডই ছিল প্রথম পশ্চিমা দেশ যারা দক্ষিণ আফ্রিকার ওপর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। তাদের মতে, বর্তমানে ইসরাইলের বিরুদ্ধেও একই ধরনের নাগরিক ও পেশাজীবী নেতৃত্বাধীন চাপ ফলপ্রসূ হচ্ছে।
রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে স্পেন ও স্লোভেনিয়া দখলকৃত পশ্চিম তীরের ইসরাইলি বসতি থেকে আসা পণ্যের ওপর ইতোমধ্যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। স্লোভেনিয়া ২০২৫ সালের আগস্টে এবং স্পেন ২০২৬ সালের শুরু থেকে এই আইন কার্যকর করে। নেদারল্যান্ডসেও ক্যাম্পাসগুলোতে তীব্র ছাত্র বিক্ষোভের পর সংসদ সদস্যরা অবৈধ বসতির পণ্য নিষিদ্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
এদিকে আয়ারল্যান্ডে তাদের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ‘অকিউপাইড টেরিটরি বিল’ পাসের চেষ্টা চালাচ্ছে, যা ইসরাইলি বসতির পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করবে। তবে এই বিলটি পাসের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি লবিস্টদের পরোক্ষ চাপের কারণে দেরি হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন দেশটির অনেক রাজনীতিবিদ।
ইসরাইল পন্থি সংগঠনগুলো এবং স্বয়ং ইসরাইল সরকার এই বর্জন আন্দোলন রুখতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। বিভিন্ন লবিস্ট গ্রুপ সতর্ক করেছে যে ইসরাইলি পণ্য বর্জন করলে মার্কিন কোম্পানিগুলোর সঙ্গে ইউরোপীয় দেশগুলোর ব্যবসায়িক স্বার্থ বিঘ্নিত হতে পারে।
ফাঁস হওয়া নথিপত্র থেকে জানা গেছে, ইসরাইলের কৌশলগত বিষয়ক মন্ত্রণালয় ইউরোপে বর্জন আন্দোলন পর্যবেক্ষণ ও দমনে লক্ষাধিক ইউরো খরচ করে আইন সংস্থাও নিয়োগ করেছে। এছাড়া জার্মানির মতো দেশগুলোতে বর্জন আন্দোলনকে ‘অ্যান্টি-সেমিটিক’ বা ইহুদি বিদ্বেষ হিসেবে চিহ্নিত করে এর অর্থায়ন বন্ধের প্রস্তাব পাস করা হয়েছে।
এই বহুমুখী লড়াই ইউরোপের বাজার এবং রাজনীতিতে ইসরাইলের অবস্থানকে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
সূত্র: আলজাজিরা