।।বিকে রিপোর্ট।।
ঢাকার কেরানীগঞ্জে এক মা ও তার স্কুলপড়ুয়া মেয়েকে ‘শ্বাসরোধে হত্যা’ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
বৃহস্পতিবার রাতে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ এ খবর পেয়ে কেরানীগঞ্জের মুক্তিরবাগ এলাকার একটি ভবনের দ্বিতীয় তলার শিক্ষিকার ফ্ল্যাট থেকে নিখোঁজ ছাত্রী ও তার মায়ের অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ কথা জানিয়েছেন কেরানীগঞ্জ মডেল থানার পরিদর্শক ইলিয়াস হোসাইন।
এ ঘটনায় ওই শিক্ষিকা মীম বেগম (২৪), তার স্বামী হুমায়ুন মিয়া (২৮), মীমের বড় বোন নুরজাহান বেগম (৩০) ও এক কিশোরী (১৫)এই চারজনকে আটক করেছে পুলিশ।
নিহত ব্যক্তিরা হলেন- অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী জোবাইদা রহমান ওরফে ফাতেমা (১৪) ও তার মা রোকেয়া রহমান (৩২)।
শিক্ষিকা মীম বেগমের (২৪) শোবার ঘরের খাটের নিচ থেকে রোকেয়া রহমান ও ওই ফ্ল্যাটের বাথরুমের ফলস ছাদ থেকে শিক্ষার্থী ফাতেমার লাশ উদ্ধার করা হয়। লাশ দুটি ময়নাতদন্তের জন্য স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত ২৫ ডিসেম্বর বিকেলে ফাতেমা প্রাইভেট পড়তে গৃহশিক্ষিকা মীম বেগমের বাসায় যায়। ওই সময় থেকেই ফাতেমা ও তার মা নিখোঁজ হন।, তাঁদের কোনো খোঁজ না পেয়ে রোকেয়া রহমানের স্বামী শাহীন আহম্মেদ ২৬ ডিসেম্বর কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরে চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি তিনি অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে থানায় একটি অপহরণ মামলা করেন। থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হলেও পুলিশ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেয়নি বলে অভিযোগ করেছেন নিহতদের স্বজনরা।
কেরানীগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এম সাইফুল আলম সাংবাদিকদের জানান, মা ও মেয়ে নিখোঁজের ঘটনায় থানায় জিডি করা হয়েছিল। তখন গৃহশিক্ষিকা মীমকে থানায় ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তাঁর দেওয়া তথ্যমতে, গত ২৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় ফাতেমা প্রাইভেট পড়ে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। ওই এলাকার সিসিটিভি ক্যামেরা দেখে এর সত্যতা পাওয়া যায়। এর পর থেকে পুলিশ তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নিখোঁজ দুজনের খোঁজার চেষ্টা করছিল।
এদিকে কয়েক দিন ধরে মুক্তিরবাগ এলাকায় তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে বৃহস্পতিবার রাতে এলাকাবাসী নিজেরাই দুর্গন্ধের উৎস অনুসন্ধান করতে গিয়ে মীম বেগমের ফ্ল্যাটে পৌঁছান। ফ্ল্যাটের দরজা খুলতে অস্বীকৃতি জানালে তারা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে তল্লাশি চালিয়ে লাশ উদ্ধার করে।
গ্রেফতারের পর পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে হত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক বিবরণ। ২৫ ডিসেম্বর বিকেলে ফাতেমা পড়া শেষে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে গৃহশিক্ষিকার মেজো বোন নুরজাহান বেগম ফাতেমার গলায় ওড়না পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে। কিছুক্ষণ পর মেয়েকে খুঁজতে ফাতেমার মা রোকেয়া রহমান ওই বাসায় আসেন। ঘরে ঢুকে মেয়ের হত্যার বিষয়টি জানতে পারার পর গৃহশিক্ষিকা মীম বেগম ও তার বোন নুরজাহান মিলে তাকেও শ্বাসরোধে হত্যা করে।
ঘটনার পর হত্যাকাণ্ড আড়াল করতে তারা কৌশল নেয়। নুরজাহান নিহত ফাতেমার পরনের জামাকাপড় খুলে নিজে তা পরে বাইরে বের হয়। এতে সিসিটিভি ক্যামেরায় দেখা যায়, পড়া শেষে ফাতেমা বাসা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে—যা দেখে সবাই বিভ্রান্ত হয়। এরপর ১০–১৫ মিনিট পর নুরজাহান বোরকা পরে আবার ফ্ল্যাটে প্রবেশ করে, যাতে কেউ সিসিটিভি ফুটেজ দেখে সন্দেহ না করে।
পরে দুইবোন মিলে ককসিট দিয়ে ফাতেমার লাশ বাথরুমের ফলস ছাদের ওপর এবং রোকেয়ার লাশ নুরজাহানের শোবার ঘরের খাটের নিচে লুকিয়ে রাখে। এ সময় মীমের ছোট বোন মাহি পুরো ঘটনা প্রত্যক্ষ করলেও তার স্বামী হুমায়ুন মিয়া তখন বাসার বাইরে ছিলেন।
নিহত রোকেয়ার ভাই জাহিদ হোসেন বলেন, গত ২৫ ডিসেম্বর আমার বোন ও ভাগনি নিখোঁজ হয়। এ ঘটনার পরদিন কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় সাধারন ডায়েরি (জিডি) করি। আমরা শুরু থেকেই গৃহশিক্ষিকা মীমকে সন্দেহ করছিলাম। বিষয়টি আমরা একাধিকবার পুলিশকে জানিয়েছি। কিন্তু তারা গুরুত্ব দেননি; বরং আমাদের অপেক্ষা করতে বলেছে। আজ এত দিন পর আমার বোন ও ভাগনির লাশ পেলাম। আমার ভাগনি ও বোনের গলায় সোনার চেইন ছিল। চেইন নেওয়ার জন্যই মীম দুজনকে হত্যা করেছেন।
কেরানীগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এম সাইফুল আলম জানান, গৃহশিক্ষিকা মীম বেগম বিভিন্ন জায়গা থেকে ঋণ নিয়েছিলেন, যার জামিনদার ছিলেন ফাতেমার মা রোকেয়া রহমান। ঋণের টাকা পরিশোধ না করায় পাওনাদারেরা বারবার রোকেয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করছিল।
এতে ক্ষুব্ধ হয়ে রোকেয়া রহমান ঋণ পরিশোধের জন্য চাপ দিলে পরিকল্পিতভাবে মা ও মেয়েকে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা গৃহশিক্ষিকা মীম বেগম ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি দিয়েছেন বলে জানান পুলিশের এই কর্মকর্তা।