।।বিকে রিপোর্ট।।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার স্মরণে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় নাগরিক সমাজের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়েছে নাগরিক শোকসভা।
শুক্রবার ১৬ জানুয়ারি বেলা ৩টা ৫ মিনিটে পবিত্র কুরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে সভার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়।
এ শোকসভায় সভাপতিত্ব করেন সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছির হোসেন। অনুষ্ঠানের প্রধান উদ্যোক্তা হিসেবে রয়েছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ। শোকসভায় অংশ নেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান, তার পরিবারবর্গ, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, বিদেশি কূটনীতিক এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।

এর আগে শোকসভায় অংশ নিতে দুপুর থেকেই সংসদ ভবন এলাকায় মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে।
শোকসভায় স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল বলেন, খালেদা জিয়া যখন জীবিত ও বন্দি ছিলেন, তখন তার পক্ষে কথা বলার মতো মানুষ খুঁজে পাওয়া যেত না।
তিনি বলেন, ওনার একটা অদ্ভুত বিচার হয়েছিল, উদ্ভট বিচার। সেই বিচারে উনি শকড হয়েছিলেন অন্য পক্ষের আইনজীবীর কথা শুনে। উনি অবাক হয়ে বলেছিলেন যে “আমি মেরে খেয়েছি এতিমের টাকা?” বিস্মিত এবং ব্যথিত হয়ে বলা এই বাক্যটাকে বিচারক লিখেছিলেন যে, বেগম জিয়া নিজেই স্বীকার করেছেন তিনি কাজটা করেছেন। আইন উপদেষ্টা আরও উল্লেখ করেন, তিনি তখন এই জঘন্য বিচারের বিপক্ষে বিবৃতি সংগ্রহের জন্য অনেকের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও ভয়ের কারণে চারজনের বেশি মানুষ পাননি।
তিনি বলেন, আজকে আমার ভালো লাগছে, সবাই আমরা মুক্তভাবে বেগম জিয়ার প্রতি ভালোবাসা জানাতে পারছি। এজন্যই এক নেত্রীর ঠাঁই হয়েছে মানুষের হৃদয়ে, আরেকজনের ঠাঁই হয়েছে বিতাড়িত ভূমিতে।’ আসিফ নজরুল মন্তব্য করেন, বাংলাদেশকে ভালো থাকতে হলে খালেদা জিয়াকে আত্মস্থ করতে হবে, কারণ তিনি ছিলেন সৎ, দেশপ্রেমিক এবং পরমতসহিষ্ণু।
ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম তার বক্তব্যে খালেদা জিয়ার উদারতার প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ‘আমি একজন স্বাধীন সাংবাদিক। সে হিসেবে আমার মন জয় করে নিয়েছেন তিনি।’ মাহফুজ আনাম গত ৭ আগস্ট দেওয়া খালেদা জিয়ার ভাষণের কথা স্মরণ করে বলেন, জেল ও গৃহবন্দি থাকার পরও মুক্ত হয়ে তিনি প্রতিশোধের কথা বলেননি। বরং তিনি বলেছিলেন, ধ্বংস বা প্রতিহিংসা নয়, ভালোবাসা ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে হবে। মাহফুজ আনাম আহ্বান জানান, খালেদা জিয়ার সেই শেষ বাণী ধারণ করে যেন জ্ঞানভিত্তিক দেশ গড়ে তোলা হয়।

আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে আগেই জানানো হয়েছিল, শোকসভার গাম্ভীর্য রক্ষার্থে কোনো রাজনৈতিক নেতা মঞ্চে বক্তব্য দেবেন না। তারা দর্শকসারিতে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। মঞ্চে কেবল বিশিষ্ট পেশাজীবী, গবেষক ও ধর্মীয় প্রতিনিধিরা বক্তব্য রাখেন।
সভায় অংশগ্রহণকারীদের জন্য সেলফি তোলা, হাততালি দেওয়া বা দাঁড়িয়ে থাকা নিষিদ্ধ ছিল। এটিকে রাজনৈতিক জনসভার বদলে ‘শ্রদ্ধা জানানো ও নীরব উপস্থিতির অনুষ্ঠান’ হিসেবে অভিহিত করা হয়।
শোকসভায় বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন তার স্ত্রী জুবাইদা রহমান, মেয়ে জাইমা রহমান এবং খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শর্মিলা রহমান।
এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছির, সাংবাদিক শফিক রেহমান, মাহমুদুর রহমান ও গণফোরামের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সুব্রত চৌধুরীসহ অনেকে। বিদেশি কূটনীতিকদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, পাকিস্তান, কানাডা, নেদারল্যান্ডস, শ্রীলঙ্কা, ইরান, অস্ট্রেলিয়া, ভুটান, ফিলিপাইন ও ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনাররা এই আয়োজনে যোগ দেন।
অনুষ্ঠানস্থল ও এর আশেপাশে নেওয়া হয়েছিল কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ, এপিবিএন, র্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা নিয়োজিত ছিলেন। গেটে আর্চওয়ে বসানো হয় এবং আমন্ত্রিত অতিথিদের কার্ড প্রদর্শন সাপেক্ষে তল্লাশির মাধ্যমে ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়। যারা ভেতরে প্রবেশ করতে পারেননি, তাদের জন্য বাইরে এলইডি বোর্ডের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার ইবনে মিজান জানান, নিরাপত্তার কোনো ঘাটতি ছিল না এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতির ওপর পূর্ণ নজরদারি বজায় রেখেছিল।