গাজা যুদ্ধবিরতি : ৩ জনকে মুক্তি দিল হামাস ১৮৩ জন ফিলিস্তিনি বন্দিকে মুক্তি দিল ইসরায়েল

আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় হওয়া সর্বশেষ চলমান যুদ্ধবিরতি চুক্তির অধীনে আরও তিনজন ইসরায়েলি বন্দিকে মুক্তি দিয়েছে হামাস।

শনিবার ৮ ফেব্রুয়ারী (স্থানীয় সময়) সকালে ইলি শরাবি, ওহাদ বিন আমি ও ওর লেভিকে রেডক্রসের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর তারা ইসরাইলে পরিবারের সঙ্গে মিলিত হন।

৫২ বছর বয়সী এলি শরাবি এবং ৫৬ বছর বয়সী ওহাদ বেন আমি, দুজনই কিবুতজ বেইরির একটি সমবায় খামার থেকে অপহৃত হন, আর ৩৪ বছর বয়সী ওর লেভি ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলার সময় নোভা সংগীত উত্সব থেকে অপহৃত হন।

শরাবির পরিবার, যারা যুক্তরাজ্যে বসবাস করেন, তার ‘ক্ষীণকায়’ চেহারা দেখে হতবাক হন এবং তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

অন্যদিকে, ইসরায়েল শনিবার আরও পরের দিকে আরও ১৮৩ জন ফিলিস্তিনি বন্দিকে মুক্তি দেয়। গত মাসে ইসরায়েল এবং হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে এটি পঞ্চম বিনিময়।

যুদ্ধবিরতির প্রথম পর্যায়ে, যা ছয় সপ্তাহ স্থায়ী হওয়ার কথা, শত শত ফিলিস্তিনি বন্দিকে মুক্তি দেওয়ার বিনিময়ে হামাস পর্যায়ক্রমে ৩৩ জন ইসরায়েলি বন্দিকে মুক্তি দিবে। এখন পর্যন্ত, হামাসের হামলার সময় অপহৃত ১৩ জন ইসরায়েলি বন্দি এবং পাঁচজন থাই শ্রমিক মুক্তি পেয়েছে, এর বিনিময়ে ইসরায়েলি কারাগার থেকে প্রায় ৬০০ বন্দি, যাদের অধিকাংশই ফিলিস্তিনি, মুক্তি দেওয়া হয়েছে।

এদিকে মুক্তি পাওয়া ফিলিস্তিনি বন্দিদের অধিকৃত পশ্চিম তীরের রামাল্লায় উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়। তাদের প্রতিনিধি জানান, তারা সবাই ‘চিকিৎসা সেবার’ প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন, তবে বিস্তারিত কিছু জানাননি।

শনিবার ইসরাইল ১৮৩ ফিলিস্তিনি বন্দীকে মুক্তি দেয়। এদের মধ্যে ৭০ জনের বেশি দীর্ঘমেয়াদি বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ছিলেন, আর ১১১ জন গাজায় আটক হয়েছিলেন। সাতজনকে মুক্তির পর নির্বাসনে পাঠানো হবে। রামাল্লায় পৌঁছানোর পর সাতজন মুক্তিপ্রাপ্ত বন্দীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ফিলিস্তিনি বন্দীদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘প্যালেস্টিনিয়ান প্রিজনার্স ক্লাব’ এএফপিকে জানায়, তারা ‘নির্যাতনের কারণে গুরুতর অসুস্থ’।

সংগঠনটির কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল-জাগারি বলেন, ‘আজ মুক্তি পাওয়া প্রতিটি বন্দিই চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে, তারা কয়েক মাস ধরে যে বর্বরতার শিকার হয়েছেন, তার জন্য।’

মুক্তিপ্রাপ্তদের মধ্যে ছিলেন জামাল আল-তাওয়িল (৬১), যিনি অধিকৃত পশ্চিম তীরের আল-বিরেহ গ্রামের সাবেক মেয়র ও হামাসের একজন নেতা। তিনি ১৯ বছর ধরে দফায় দফায় ইসরাইলি কারাগারে বন্দী ছিলেন। তার মেয়ে বুশরা আল-তাওয়িল গত জানুয়ারিতে বন্দী বিনিময়ের মাধ্যমে মুক্তি পান।

বন্দী বিনিময়ের ফলে ১৫ বছর পর প্রথমবারের মতো ছেলেকে দেখতে পেয়ে খদরা আল-দাঘমা নামের এক ফিলিস্তিনি মা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। ‘আমার মন আনন্দে ভরে গেছে,’ তিনি বলেন। ‘সে অনেক বদলে গেছে, আর আগের মতো নেই।’

আগামী তিন সপ্তাহের মধ্যে যুদ্ধবিরতির প্রথম পর্যায় শেষ হলে ৩৩ জন ইসরাইলি বন্দী ও ১,৯০০ ফিলিস্তিনি বন্দীকে মুক্তি দেওয়ার কথা রয়েছে। তবে ইসরাইল জানিয়েছে, ওই ৩৩ জনের মধ্যে ৮ জন ইতোমধ্যে মারা গেছেন।

শনিবার যখন শরাবি, বিন আমি ও লেভিকে মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ’তে রেড ক্রসের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তখন সেখানে সশস্ত্র যোদ্ধাদের পাহারায় অনেক মানুষ জড়ো হয়। অনেকেই সেই মুহূর্ত মোবাইল ফোনে ধারণ করেন। এসময় হামাস ও ফিলিস্তিনি পতাকা উড়তে দেখা যায়।

একটি মঞ্চে এক হামাস কর্মকর্তা ও রেড ক্রস প্রতিনিধি আনুষ্ঠানিক নথিপত্রে স্বাক্ষর করেন। এরপর তিন বন্দীকে সেখানে উপস্থিত করা হয়, যেখানে সশস্ত্র ব্যক্তিরা তাদের ঘিরে রাখে। তারা সার্টিফিকেট হাতে দাঁড়িয়ে কিছু প্রশ্নের উত্তর দেন ও হাত নাড়েন, এরপর তাদের রেডক্রসের গাড়িতে তোলা হয়।

প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুও তাদের শারীরিক অবস্থার সমালোচনা করেন। তিনি হামাসকে ‘দানব’ আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘আমরা আবারও দেখলাম হামাস কীভাবে আচরণ করেছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, হামাস বারবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন’ করেছে, তবে বিস্তারিত কিছু জানাননি।

এদিকে হামাসের মুখপাত্র হাজেম কাসেম বলেন, ‘সাংস্কৃতিক উপায়ে’ বন্দী মুক্তির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে।

তিনি ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে প্রতিশ্রুত মানবিক সহায়তা বাস্তবায়নে ‘গড়িমসি’ করার অভিযোগ করেন।

শনিবারের বন্দি বিনিময়টি ট্রাম্পের এ রকম প্রস্তাবের পর আসে, যেখানে তিনি গাজা থেকে ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের তাড়িয়ে দেওয়ার এবং যুক্তরাষ্ট্রকে অঞ্চলটির মালিকানা দেওয়ার কথা বলেন।

শুক্রবার হোয়াইট হাউসে সফররত জাপানি প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবার সাথে বৈঠকের আগে সংবাদদাতাদের ট্রাম্প বলেন, তার পরিকল্পনাটি একটি রিয়েল এস্টেট লেনদেন হিসেবে দেখা উচিত। তবে তিনি পরিকল্পনার জন্য কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা দেননি এবং বলেন, ‘’আমাদের এই ব্যাপার নিয়ে তাড়াহুড়া নেই।

গাজা সম্পর্কিত তার প্রস্তাব নিয়ে একটি প্রশ্নের জবাবে, ট্রাম্প বলেন, তার পরিকল্পনাটি “খুব ভালোভাবে গ্রহণ করা হয়েছে।” আর যেমনটি তিনি কল্পনা করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে ওই অঞ্চলে “সেনা মোতায়েন” করতে হবে না, কারণ ইসরায়েল সেখানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।

এই সপ্তাহের শুরুতে ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাথে হোয়াইট হাউসের একটি সংবাদ সম্মেলনে প্রথমবার গাজা দখল পরিকল্পনা ঘোষণা করেন।

পরবর্তীতে, তিনি তার ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে এই পরিকল্পনা নিয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা করেন, যেখানে তিনি প্রস্তাব দেন, হামাসের সাথে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ইসরায়েলের উচিত হবে গাজা ভূখন্ড যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করা।

বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনে সফরের সময় এক ভিডিও বিবৃতিতে নেতানিয়াহু এই পরিকল্পনাটির প্রশংসা করেন এবং বলেন, পরিকল্পনাটি শোনার মতো ছিল এবং “কয়েক বছরের মধ্যে প্রস্তাবিত প্রথম মৌলিক ধারণা”।

এই পরিকল্পনাটি যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র এবং বৈরিপক্ষ উভয়ই ব্যাপকভাবে সমালোচনা করে, যাদের অনেকেই ইসরায়েলের পাশে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ, যা “দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান” নামে পরিচিত।

জর্দানের আম্মানে শুক্রবার এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করে একটি সড়কে বড় রকমের প্রতিবাদ অনুষ্ঠিত হয়। মুসলিম ব্রাদারহুড এবং অন্যান্য বিরোধী দলগুলোর আয়োজিত এই সমাবেশে মিছিলকারীরা ট্রাম্পের বিরুদ্ধে পোস্টার এবং ব্যানার প্রদর্শন করেন এবং ফিলিস্তিনের পক্ষে স্লোগান দেন।

সূত্র:রয়টার্স, এপি

সোস্যাল মিডিয়াতে নিউজটি শেয়ার করুন

আরও পড়ুন
© All rights reserved © 2025. Bangalir Khobor
Developed by Tiger Infotech