ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গাজীপুর-২ (গাজীপুর শহর ও টঙ্গী) আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও সিটির প্রথম মেয়র এম মান্নানের ছেলে এম মঞ্জুরুল করিম ওরফে রনি। পিতার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অর্জন, পারিবারিক ঐতিহ্য ও তরুণ নেতৃত্বের সমন্বয়ে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেছেন তিনি। এলাকাবাসী মনে করেন, অভিজ্ঞতার উত্তরাধিকার এবং নতুন প্রজন্মের উদ্যম—এই দুইয়ের মেলবন্ধনই তার বিজয়ের মূল শক্তি।
এম মঞ্জুরুল করিম রনি গাজীপুর মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। তার পিতা প্রয়াত অধ্যাপক এম এ মান্নান গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচিত মেয়র ও সাবেক দুইবারের প্রতিমন্ত্রী। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গাজীপুর-২ (গাজীপুর শহর ও টঙ্গী) আসন থেকে নির্বাচন করে এম মঞ্জুরুল করিম রনি পেয়েছেন ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬০৬ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ১১ দলীয় জোটের এনসিপির প্রার্থী আলী নাছের খান পেয়েছেন ১ লাখ ৪০ হাজার ৯৫০ ভোট।
গাজীপুর সদর থানা বিএনপির নেতা হাবিবুর রহমান বলেন, তার বিজয়ের পেছনে মূল চাবিকাঠি ছিল পিতার দীর্ঘ রাজনৈতিক অর্জন। মঞ্জুরুল নিজেও নতুন প্রজন্মের উদ্যমের সঙ্গে মিলিয়ে নির্বাচনী সাফল্য নিশ্চিত করেছেন।
বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এম মঞ্জুরুল এমন এক পরিবারে বেড়ে উঠেছেন, যেখানে রাজনীতি মানে জনসেবা। তার পিতা অধ্যাপক এম এ মান্নান দেশের রাজনীতিতে সুপরিচিত ছিলেন। ১৯৭৮ সালে তিনি জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল)-এ যোগ দেন, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে এম এ মান্নান দলের সাধারণ সম্পাদক, সভাপতি, কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন। বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ১৯৯১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী এবং পরে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৩ সালে গাজীপুর সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার পর প্রথম মেয়র নির্বাচিত হন। সে সময়ে তিনি নগর উন্নয়নে সড়ক উন্নয়ন, ড্রেনেজ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং নাগরিক সেবা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
জয়দেবপুর শহরের মুন্সীপাড়া এলাকার বাসিন্দা রবিউল হাসান বলেন, আমাদের এলাকায় অধ্যাপক মান্নান দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও সামাজিক কাজে যুক্ত ছিলেন। সেই সুবাদে আমরা সবসময় তার পরিবারের প্রতি আস্থা রাখি। এবার তার ছেলে মঞ্জুরুল করিম রনির জয়ও সেই বিশ্বাসের ফল।
স্থানীয় নেতা ও সমর্থক জয়ন্ত সরকার বলেন, নির্বাচনী প্রচারণায় রনি তরুণ ভোটারদের সম্পৃক্ত করা, নগর অবকাঠামো উন্নয়ন, যানজট নিরসন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মতো ইস্যুর ওপর গুরুত্ব দেন। এছাড়া বাবার রাজনৈতিক পরিচিতি ও অভিজ্ঞতাকেও কৌশলগতভাবে কাজে লাগান।
জয়দেবপুর শহরের ছায়াবিথী এলাকার বাসিন্দা কবির মিয়া বলেন, মঞ্জুরুল করিম রনি নিজের উদ্যোগ ও পরিকল্পনায়ও ভোটারদের আস্থা অর্জন করেছেন। প্রচারণায় নিয়ে এসেছিলেন নতুন মাত্রা। সম্পৃক্ত করেছেন এলাকার তরুণদের। এই বিজয় শুধু পিতার ওপর ভর করে নয়, এটি সুপরিকল্পিত প্রচারণার ফল।
শিমুলতলী এলাকার বাসিন্দা শামিমা বেগম বলেন, আমরা চাই একটি তরুণ ও দক্ষ নেতা। মঞ্জুরুল করিম সেই প্রার্থী, যিনি শুধু বাবার নাম নয়, নিজের কাজেও বিশ্বাসযোগ্য। তার জয় আমাদের আশা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
ফল ঘোষণার পর এলাকায় সমর্থকদের উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করা যায়। তার কর্মী ও সমর্থকরা মনে করছেন, এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং জনআস্থা দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা। তবে তারা আশাবাদী, পিতার অর্জন ও ছেলের নেতৃত্বের সমন্বয় গাজীপুর-২ আসনের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে।
জয়দেবপুর বাজারের ব্যবসায়ী তরিকুল ইসলাম বলেন, মঞ্জুরুল করিম রনির বাবা অধ্যাপক এম এ মান্নান মেয়র নির্বাচিত হয়ে রাজনৈতিক কারণে চেয়ারে বসার চেয়ে জেলেই বেশি সময় কাটিয়েছেন। তারপরও যতদিন তিনি চেয়ারে ছিলেন, এলাকার উন্নয়নে ভালো ভূমিকা রেখেছেন। রনির বিজয় শুধু একটি নির্বাচনের ফল নয়। এটি একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এবং নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বের সমন্বয়। তবে এখন তাকে জনআস্থা ধরে রাখতে হবে, প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন করতে হবে।
এম মঞ্জুরুল করিম রনি যুগান্তরকে বলেন, তার এই জয়ের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে তার পিতার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন ও এলাকায় ধারাবাহিকভাবে করা উন্নয়নমূলক কাজ। তিনি মনে করেন, সাধারণ মানুষ উন্নয়ন ও আস্থার রাজনীতিকেই মূল্যায়ন করেছেন।
তিনি আরও বলেন, আমি নির্বাচনের আগে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল এলাকাকে মাদক, ছিনতাই ও চাঁদাবাজিমুক্ত করা। মানুষের নিরাপত্তা ও শান্তি নিশ্চিত করাই হবে আমার প্রধান অগ্রাধিকার। আমি কথা দিয়েছি, সেই কথা রাখাই এখন আমার প্রথম দায়িত্ব।