বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ৬০০ মিলিয়ন মানুষ খাদ্যবাহিত রোগে আক্রান্ত হন এবং প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে।
এই সমস্যার বড় অংশই উন্নয়নশীল দেশগুলোতে, যেখানে খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিপণনের প্রতিটি ধাপে নিরাপত্তার ঘাটতি রয়েছে। আরও উদ্বেগজনক হলো, অনিরাপদ খাদ্য শুধু তাৎক্ষণিক অসুস্থতার কারণ নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়ায়।
বাংলাদেশে ক্যানসার ইতোমধ্যে একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে। গ্লোবোক্যানের সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর প্রায় ১.৫ থেকে ২ লাখ নতুন ক্যানসার রোগী শনাক্ত হন। ক্যানসারের কারণ বহুমাত্রিক হলেও খাদ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত ঝুঁকি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। রাসায়নিক দূষণ, ভেজাল, কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ, ভারী ধাতু এবং সংরক্ষণের অনুপযুক্ত পদ্ধতি আমাদের দৈনন্দিন খাবারকে ধীরে ধীরে বিষাক্ত করে তুলছে।
খাদ্যে ফরমালিন ব্যবহার নিয়ে বহু বছর ধরে আলোচনা চলছে। মাছ, ফল কিংবা সবজি দীর্ঘ সময় সতেজ রাখতে এই রাসায়নিক প্রয়োগ করা হয়, যা আন্তর্জাতিকভাবে খাদ্যে ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত নয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘদিন ফরমালিনযুক্ত খাবার গ্রহণ করলে শ্বাসনালী ও পরিপাকতন্ত্রের কোষে পরিবর্তন ঘটতে পারে, যা ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। একইভাবে অতিরিক্ত কীটনাশকযুক্ত সবজি ও ফল শরীরে জমে লিভার, কিডনি এবং হরমোনাল সিস্টেমে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।
আরেকটি বড় উদ্বেগের নাম অ্যাফ্লাটক্সিন—এক ধরনের বিষাক্ত ছত্রাক যা সাধারণত আর্দ্র পরিবেশে সংরক্ষিত চাল, ভুট্টা, বাদাম বা ডালে জন্মায়। আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থা (IARC) অ্যাফ্লাটক্সিনকে “গ্রুপ-১ কার্সিনোজেন” হিসেবে চিহ্নিত করেছে, অর্থাৎ এটি মানুষের মধ্যে ক্যানসার সৃষ্টির নিশ্চিত প্রমাণ রয়েছে।
বিশেষ করে লিভার ক্যানসারের সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক পাওয়া গেছে। বাংলাদেশে অনেক সময় যথাযথ শুকানো বা সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় এই ঝুঁকি বাড়ে।
খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অতিরিক্ত লবণযুক্ত, ধোঁয়ায় সংরক্ষিত বা পোড়া খাবার নিয়মিত খেলে পাকস্থলী ও অন্ত্রের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
প্রক্রিয়াজাত মাংস যেমন সসেজ বা সালামি নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্কবার্তা দিয়েছে, কারণ এগুলোর সঙ্গে কোলোরেক্টাল ক্যানসারের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। শহুরে জীবনে ফাস্ট ফুডের প্রতি ঝোঁক বাড়ায় এই ঝুঁকিও বাড়ছে।
সমস্যাটি শুধু স্বাস্থ্যগত নয়; এটি অর্থনৈতিকও। ক্যানসার চিকিৎসা ব্যয়বহুল এবং দীর্ঘমেয়াদি। একটি পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ক্যানসারে আক্রান্ত হলে পুরো পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে যায়। উন্নয়নশীল দেশে যেখানে স্বাস্থ্যবিমা কাঠামো সীমিত, সেখানে প্রতিরোধই সবচেয়ে কার্যকর কৌশল। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা গেলে ক্যানসারের একটি অংশ প্রতিরোধ করা সম্ভব, যা জাতীয় স্বাস্থ্যব্যয় কমাতেও সাহায্য করবে।
বাংলাদেশে ইতোমধ্যে এ ব্যাপারে ভ্রাম্যমাণ আদালত, বাজার তদারকি ইত্যাদি কর্মসূচি চালু আছে। তবে বাস্তবতা হলো, এই সমস্যা মোকাবিলায় আরও সমন্বিত এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রয়োজন। শুধু আইন প্রয়োগ নয়, প্রয়োজন ল্যাবভিত্তিক নিয়মিত পরীক্ষা, সরবরাহ চেইনের প্রতিটি ধাপে মান নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষকদের প্রশিক্ষণ।
প্রথমত, কৃষিক্ষেত্রে ‘গুড এগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিস’ চালু করা জরুরি, যাতে কীটনাশকের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হয়। দ্বিতীয়ত, খাদ্য সংরক্ষণে আধুনিক প্রযুক্তি যেমন কোল্ড চেইন ব্যবস্থার প্রসার ঘটাতে হবে। তৃতীয়ত, বাজারে আসা খাদ্যের নিয়মিত র্যান্ডম টেস্ট বাধ্যতামূলক করা উচিত। উন্নত দেশগুলোতে এই ব্যবস্থাই খাদ্য নিরাপত্তার ভিত্তি তৈরি করেছে।
সচেতনতার প্রশ্নটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভোক্তাদের জানতে হবে কীভাবে তাজা খাবার বেছে নিতে হয়, ফল ও সবজি ভালোভাবে ধুতে হয়, এবং দীর্ঘদিন সংরক্ষিত বা অস্বাভাবিকভাবে চকচকে খাবার এড়িয়ে চলতে হয়। একই সঙ্গে অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবারের বদলে প্রাকৃতিক খাদ্যের দিকে ঝুঁকতে হবে। জনস্বাস্থ্য শিক্ষাকে স্কুল পর্যায় থেকেই অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদেরও এখানে বড় ভূমিকা রয়েছে। ক্যানসার প্রতিরোধের আলোচনা যখন হয়, তখন সাধারণত ধূমপান বা জীবনযাত্রার কথা বলা হয়; কিন্তু খাদ্য নিরাপত্তাকে সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। গবেষণা বাড়াতে হবে, স্থানীয় তথ্য সংগ্রহ করতে হবে, এবং সেই অনুযায়ী নীতি নির্ধারণ করতে হবে।
খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নয়; এটি কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য এবং স্থানীয় প্রশাসনসহ পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রের সমন্বিত কাজ। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এটি একটি সামাজিক দায়বদ্ধতা। উৎপাদক থেকে বিক্রেতা, সবাইকে বুঝতে হবে যে সাময়িক লাভের জন্য খাদ্যে ভেজাল মেশানো মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্যকে ঝুঁকিতে ফেলা।
চ্যালেঞ্জ কোথায়?
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নজরদারির সীমাবদ্ধতা এবং আইনের অসম প্রয়োগ। অনেক সময় খাদ্য পরীক্ষার জন্য পর্যাপ্ত আধুনিক ল্যাব থাকে না, থাকলেও জনবল ও প্রযুক্তির ঘাটতি দেখা যায়। অনানুষ্ঠানিক বাজারব্যবস্থা, ছোট উৎপাদকদের অপর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, এবং দ্রুত লাভের মানসিকতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও এখানে উল্লেখযোগ্য; অতিরিক্ত আর্দ্রতা ও তাপমাত্রা ছত্রাক ও টক্সিন বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়ায়। পাশাপাশি ভোক্তাদের একাংশ এখনো কম দামের দিকে ঝুঁকে নিরাপত্তার বিষয়টি উপেক্ষা করেন, যা অসাধু ব্যবসায়ীদের সুযোগ করে দেয়।
উত্তরণের পথ কী?
প্রথমত, জেলা পর্যায়ে আধুনিক খাদ্য পরীক্ষাগার বাড়াতে হবে। “খামার থেকে খাবার টেবিল” পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় নজরদারি চালু করা জরুরি। কৃষকদের নিরাপদ চাষাবাদে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দিলে তারা ক্ষতিকর রাসায়নিক কম ব্যবহার করবেন। একই সঙ্গে কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্য উৎপাদকদের উৎসাহ ও প্রণোদনা দিলে ভালো একটি প্রতিযোগিতা তৈরি হবে। গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং চিকিৎসকদের সমন্বয়ে ব্যাপক সচেতনতা গড়ে তোলা সম্ভব।
বাংলাদেশ উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে, আর এই যাত্রায় সুস্থ মানুষই সবচেয়ে বড় শক্তি। তাই নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা শুধু স্বাস্থ্যনীতি নয়, এটি দেশের ভবিষ্যতের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।নিরাপদ খাদ্য কোনো বিলাসিতা নয়—এটি আমাদের মৌলিক অধিকার। আজ যদি আমরা এ বিষয়ে গুরুত্ব দিই, তাহলে আগামী প্রজন্মকে ক্যানসার সহ অন্যান্য অনেক স্বাস্থ্য ঝুঁকি থেকে অনেকটাই রক্ষা করা সম্ভব। একটি সুস্থ, সচেতন ও শক্তিশালী বাংলাদেশ গড়তে নিরাপদ খাদ্যের বিকল্প নেই।
ডা. আরমান রেজা চৌধুরী
ক্যানসার বিশেষজ্ঞ
এভারকেয়ার হাসপাতাল, ঢাকা।