।।বিকে আন্তর্জাতিক ডেস্ক।।
ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু-কাশ্মিরে পর্যটকদের ওপর বন্দুকধারীদের হামলায় ২৬ বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন।
মঙ্গলবার ২২ এপ্রিল বিকেলে কাশ্মীরের পেহেলগামে এ হামলা হয়। যেখানে হামলা হয়েছে সেটি একটি বিস্তৃত তৃণভূমি। ওই স্থানটিতে শুধুমাত্র ঘোড়া অথবা পায়ে হেঁটে যাওয়া যায়। মঙ্গলবার সকালে সেখানে পর্যটকদের একটি দল গিয়েছিল। ওই সময় তাদের ওপর হামলা হয়।
ভারতীয় কর্তৃপক্ষ সূত্রে বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ বলেছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেসামরিক লোকজনকে লক্ষ্য করে যতগুলো হামলা হয়েছে, সেগুলোর তুলনায় এটা অনেক বড় হামলা। হামলায় আরও অনেকে আহত হয়েছেন, যাঁদের কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
ভারতের সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে দেশটির বার্তা সংস্থা পিটিআই জানিয়েছে, হামলায় ২৬ জন নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে দুজন বিদেশি নাগরিক। একজন সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং আরেকজন নেপালের নাগরিক। নিহতদের মধ্যে ভারতের নৌবাহিনীর একজন কর্মকর্তা রয়েছেন বলে দেশটির সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
বার্তাসংস্থা পিটিআই জানিয়েছে, হামলাস্থল ছিল পাহালগামের বৈসারান তৃণভূমিতে। সেখানে একটি রিসোর্টের কাছে হামলার পর অনেকের মরদেহ পড়ে থাকতে দেখা গেছে। ভারী অস্ত্রেসস্ত্রে সজ্জিত অস্ত্রধারীরা পাহাড়ের ওপরের তৃণভূমির গাছপালার আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে। তারা ৪০ জনের একটি পর্যটক দলকে ঘিরে ফেলে। এরপর এলোপাতাড়ি গুলি শুরু করে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, অস্ত্রধারীরা যখন গুলি চালানো শুরু করে, তখন স্থানীয়রা, যারা পর্যটকদের কাছে মালামাল বিক্রি করেন, তারা নিরাপদস্থানে সরে যান। এতে শুধুমাত্র পর্যটকরা গোলাগুলির মাঝে পড়েন। তখন তাদের ওপর নির্বিচার গুলি ছোড়া হয়।
ভারতের বিভিন্ন সংবামাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, ভারতীয় সেনারা ঘটনাস্থলের দিকে দৌড়ে যাচ্ছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, মাটিতে অনেকের দেহ পড়ে আছে এবং লোকজন কান্না করছে ও সাহায্য চাইছে। অবশ্য বিবিসি এসব ভিডিওর সত্যতা যাচাই করতে পারেনি।
পুলিশ জানিয়েছে, গুলিবিদ্ধ অনেক পর্যটককে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পুরো এলাকা সেনাসদস্যরা ঘিরে রেখেছেন এবং চৌকিগুলোতে গাড়ি থামিয়ে তল্লাশি করা হচ্ছে। হামলাকারীদের খুঁজে বের করতে আরেকটি অভিযানের প্রস্তুতি চলছে। হামলার পর ঘটনাস্থল পেহেলগাম এলাকায় সেনাবাহিনী ও পুলিশ সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে বলে ওই অঞ্চলের লেফটেন্যান্ট গভর্নর মনোজ সিনহা জানিয়েছেন।
উল্লেখ্য, হিমালয়ের কোলে অবস্থিত মনোরম শহর পেহেলগামকে ‘ভারতের সুইজারল্যান্ড’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। জনপ্রিয় এই পর্যটন নগরীতে গতকালের এই হামলা ২০১৯ সালে পুলওয়ামা হামলার পর কাশ্মীরে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা।
জনপ্রিয় ওই জায়গাটিতে যেহেতু শুধু পায়ে হেঁটে বা ঘোড়ায় করে যাওয়া যায়। তাই আহতদের উদ্ধারে ঘটনাস্থলে হেলিকপ্টার পাঠাতে অনুরোধ জানায় স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।
এ ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন এবং তাকে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। এরপর অমিত শাহ ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের রাজধানী শ্রীনগরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। সেখানে তিনি একটি জরুরি বৈঠকে বসবেন।
হামলার খবর পেয়ে নরেন্দ্র মোদি সৌদি আরব সফর সংক্ষিপ্ত করে মঙ্গলবার রাতেই দেশে ফিরছেন বলে পিটিআই জানিয়েছে।
হামলায় জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার ঘোষণা দিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) এক বিবৃতিতে বলেন, ‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য আমাদের সংকল্প অটুট রয়েছে এবং এটা আরও শক্তিশালী হবে।
ভারতের হিন্দুস্তান টাইমস এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, দিল্লি বিমানবন্দরে নেমেই কাশ্মীরের পরিস্থিতি নিয়ে জরুরি বৈঠকে বসেন মোদি। সেই বৈঠকে ছিলেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল, কেন্দ্রীয় বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এবং অন্যান্য আধিকারিকেরা।
এর আগে গতকাল মঙ্গলবার রাতে সৌদির রাজার নৈশভোজ অনুষ্ঠানে যোগ না দিয়েই নয়াদিল্লির বিমান ধরেন মোদি। মঙ্গলবার মধ্যরাতে ভারতীয় বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। সমাজমাধ্যমে তিনি লেখেন, সৌদি আরব সফর শেষ করে ভারতের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছেন প্রধানমন্ত্রী।
এদিকে হামলার ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। গতকাল নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, কাশ্মীরের খবরে গভীরভাবে মর্মাহত হয়েছি। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্র বলিষ্ঠভাবে ভারতের পাশে রয়েছে।
প্রসংগত, কাশ্মীরে ভারতের শাসনের বিরুদ্ধে ১৯৯০–এর দশক থেকে সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতায় বহু সাধারণ মানুষ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের প্রাণহানি হয়েছে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতার পর হিমালয়ের এ অঞ্চল বিভক্ত হয়। পারমাণবিক ক্ষমতাধর দুই প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তান উভয়েই পুরো কাশ্মীরকে নিজেদের বলে দাবি করে। এ নিয়ে দেশ দুটি বিগত কয়েক দশকে দুটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ ও একটি সীমিত সংঘাতে জড়িয়েছে।
বর্তমানে প্রায় ৫ লাখ ভারতীয় সেনাসদস্য স্থায়ীভাবে কাশ্মীরে মোতায়েন রয়েছেন। ২০১৯ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কাশ্মীরের আংশিক স্বায়ত্তশাসন প্রত্যাহার করেন।
কাশ্মীরে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর সর্বশেষ বড় ধরনের হামলা হয় ২০২৪ সালের জুনে। সে সময় হিন্দু তীর্থযাত্রীদের বহনকারী একটি বাসে বন্দুকধারীরা গুলি চালালে ৯ জন নিহত ও ৩৩ জন আহত হন।
এর আগে ২০১৯ সালে কাশ্মীরের পুলওয়ামায় এক আত্মঘাতী বোমা হামলায় অন্তত ৪৬ জন ভারতীয় সেনা নিহত হন। ভারত এই হামলার জেরে পাকিস্তানের ভেতরে বিমান হামলা চালায়।
সূত্র: বিবিসি, রয়টার্স, এনডিটিভি, পিটিআই,