।।বিকে রিপোর্ট।।
আজ ২৫ নভেম্বর নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস। এই বিশেষ দিনটির তাৎপর্য হলো নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে সচেতনতা সৃষ্টি করা।
১৯৮১ সালে লাতিন আমেরিকায় নারীদের এক সম্মেলনে নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে এ দিনকে আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস পালনের ঘোষণা দেয়া হয়। জাতিসংঘ দিবসটি পালনের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয় ১৯৯৯ সালের ১৭ ডিসেম্বর।
নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক প্রতিবাদ দিবস উদ্যাপন কমিটি বাংলাদেশে ১৯৯৭ সাল থেকে এ দিবস ও পক্ষ পালন করছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের বিভিন্ন নারী অধিকার ও মানবাধিকার সংগঠনও নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।
জাতিসংঘের এবারের নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ ২০২৫-এর প্রতিপাদ্য হচ্ছে, ‘নারী ও কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে সাইবার সহিংসতা রোধে ঐক্যবদ্ধ হোন’।
দিনটি ঘিরে দেশে যখন নারীর নিরাপত্তা নিয়ে নানা আলোচনা হচ্ছে, তখন সামনে আসে ডিজিটাল সহিংসতার আরেক অন্ধকার বাস্তবতা—অনলাইনে নারীর ঝুঁকি ভয়াবহভাবে বাড়ছে। প্রযুক্তি যত সহজলভ্য হচ্ছে, ততই বেড়ে যাচ্ছে ডিজিটাল নির্যাতনের নতুন নতুন রূপ।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ সাইবার সহিংসতাসহ নারী ও কন্যার প্রতি সব ধরনের নির্যাতনকে ‘না’ বলুন এবং নারী ও কন্যার অগ্রসরমাণতা নিশ্চিত করুন”—এ প্রতিপাদ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ পালন করছে। পক্ষটি পালনকালে নারী ও কন্যার প্রতি সহিংসতার অবস্থা ও অবস্থান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আগের তুলনায় সহিংসতার মাত্রা যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনি সহিংসতায় নতুন নতুন ধরন যুক্ত হচ্ছে। ১৩ অক্টোবর ২০২৫ প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ অনুযায়ী প্রতি চারজনের মধ্যে তিনজন নারী জীবনে কোনো একবার নিকটতম সঙ্গী দ্বারা সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এ নির্যাতনের মধ্যে রয়েছে শারীরিক, মানসিক, যৌন ও অর্থনৈতিক সহিংসতা।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য বলছে, আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে মোট ৬৭৮ নারী ও কন্যাশিশু যৌন নিপীড়ন, ধর্ষণ, দলবদ্ধ ধর্ষণসহ বিভিন্ন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। শুধু অক্টোবরেই নির্যাতিত হয়েছেন ১০১ কন্যা ও ১৩০ নারী।
জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ জানায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা, ইভটিজিংসহ বিভিন্ন সহিংসতা নিয়ে এসেছে ২৬ হাজার ৩১৭টি কল। এর মধ্যে স্বামীর দ্বারা নির্যাতনের অভিযোগেই কল এসেছে ১৪ হাজার ৯২৮টি। গত বছর একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ১১ হাজার ৪১৮। পরিসংখ্যান বলছে, নারীরা ঘরেও নিরাপদ নন।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র জানায়, গত বছরের প্রথম ১০ মাসে পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা ছিল ৪২৭টি, এ বছর বেড়ে হয়েছে ৫০৩টি। স্বামীর হাতে হত্যার ঘটনাও বেড়েছে। ২০২৪ সালে ছিল ১৫৫টি, আর ২০২৫ সালে দাঁড়িয়েছে ১৯৮টিতে।
পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন (পিসিএসডব্লিউ) জানায়, তাদের ফেসবুক পেজে প্রতিদিন ৪০–৫০টি অভিযোগ আসে, হটলাইনে আসে ৫০–৬০টি কল। অধিকাংশ অভিযোগই ব্যক্তিগত ছবি দিয়ে হুমকি, ভুয়া অ্যাকাউন্ট থেকে অপমান, বা গোপনীয় তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার আশঙ্কা সংক্রান্ত।
কিন্তু আশঙ্কার বিষয় হলো—অভিযোগ এলেও বেশির ভাগ নারীই মামলা করতে চান না। তারা শুধুই চান কনটেন্ট যেন সরিয়ে নেওয়া হয়, অপরাধী ধরা হোক—এমন আগ্রহ নেই অনেকেরই। সামাজিক লজ্জা, পরিবারে জানাজানি হওয়ার ভয়, মানসিক চাপ—সব মিলিয়েই তারা আইনি পদক্ষেপ থেকে সরে আসেন।
ডিজিটাল নির্যাতন নিয়ে কাজ করা প্ল্যাটফর্ম সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেন (সিএসডব্লিউসি) জানায়, তাদের কাছে আসা অধিকাংশ অভিযোগই আসে শেষ পর্যায়ে—যখন ভুক্তভোগী অনেক তথ্য প্রমাণই ডিলিট করে ফেলেন। সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকে ১৪–১৫ বছরের কিশোরীরা। সম্পর্কের সময় শেয়ার করা ছবি ব্যবহার করে তাদের ব্ল্যাকমেইল করা হয়, শারীরিক সম্পর্কের চাপ দেওয়া হয়। বিপাকে পড়ে তারা কাউকে কিছু জানাতে ভয় পায়, ফলে আরও বড় ঝুঁকিতে পড়ে।
শিক্ষিত কিংবা উচ্চবিত্ত নারীরাও এই সহিংসতা লুকিয়ে রাখতে চান। অনেকে মনে করেন মামলা করলে ‘সম্মানহানি’ হতে পারে—ফলে ভুক্তভোগীরা নীরব থাকেন। অনেকে পরিবার, স্বামী বা অভিভাবকদের জানাতেও চান না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিজিটাল যুগে নিরাপত্তাহীনতার নতুন চেহারা তৈরি হয়েছে। ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে অপমান, ছবি এডিট করে ছড়ানো, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পরে পুরোনো ছবি ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইল—এসব অপরাধের প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। পুলিশ কর্মকর্তারা মনে করছেন, পরিবারই প্রথম নিরাপত্তার জায়গা। শিশু–কিশোরীদের অনলাইনে কী করছে, কী দেখছে—সেগুলো জানার চর্চা গড়ে তুলতে হবে। কেউ যদি অনলাইনে কোনো অনিরাপদ পরিস্থিতিতে পড়ে, তখনই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাহায্য নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তাদের।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস শুধু স্মরণ নয়—এটি সতর্কতারও দিন। কারণ নারীর ওপর সহিংসতার ধরন এখন দ্বিমাত্রিক—বাস্তব জীবনে যেমন আছে, তেমনি ডিজিটাল জগতেও। আজকের পৃথিবীতে নারীর নিরাপত্তা মানে শুধু রাস্তাঘাট নয়; নিরাপত্তা তার মোবাইল স্ক্রিনেও।
আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ উদযাপন প্রসঙ্গে শারমীন এস মুরশিদ বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘মেয়েরা প্রমাণ করেছে দেশের সংকটে তারা কতটা বলিষ্ঠ এবং দুঃসাহসী।
আমরা নারী নির্যাতন দূর করতে সারা দেশের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের যোগাযোগ স্থাপন করব। পাশাপাশি এ ধরনের কর্মসূচি চলমান রাখতে হবে। দেশের যেকোনো জায়গায় নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জানা এবং দ্রুত ব্যবস্থা নিতে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় কুইক রেসপন্স স্ট্র্যাটেজি অনুসরণ করছে বলেও জানান তিনি।