।।বিকে রিপোর্ট।।
আজ ১০ মহররম। পবিত্র আশুরা।
কারবালার শোকাবহ ঘটনাবহুল এ দিনটি মুসলমানদের কাছে ধর্মীয়ভাবে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ত্যাগ ও শোকের প্রতীকের পাশাপাশি বিশেষ পবিত্র দিবস হিসেবে দিনটি পালন করা হয় মুসলিম বিশ্বে।
রবিবার ৬ জুলাই বাংলাদেশেও আজ যথাযোগ্য মর্যাদায় পবিত্র আশুরা পালিত হচ্ছে। এ উপলক্ষে আজ সরকারি ছুটি।
হিজরি ৬১ সনের ১০ মহররম এই দিনে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসেইন (রা.) এবং তার পরিবার ও অনুসারীরা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে যুদ্ধ করতে গিয়ে ফোরাত নদীর তীরে কারবালা প্রান্তরে ইয়াজিদ বাহিনীর হাতে শহীদ হন।
১০ মহররম আমাদের মুসলিম সমাজ সংস্কৃতি ও ইতিহাসে একটি হৃদয়বিদারক শোকাবহ ঘটনার স্মারক। এই ঘটনায় নবীজির কলিজার টুকরো নাতি ইমাম হোসাইন (রহ.) তার নানার অনুসারী মুসলমানদের হাতে নির্মম নিষ্ঠুরভাবে শাহাদত বরণ করেন।
এমন হৃদয়বিদারক ঘটনা কীভাবে ঘটল তা জানার জন্য আমাদের যেতে হবে পেছনে। নবীজি (সা.) নবুয়াত লাভ করেন ৪০ বছর বয়সে। ১৩ বছর মক্কায় ইসলাম প্রচারের পর মদীনায় হিজরত করেন ৫৩ বছর বয়সে। হিজরতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হয় হিজরি সন গণনার সূচনা। হিজরি ১০ম সালে নবীজি দুনিয়ার জীবন শেষ করে বিদায় নেন।
তারপর ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)। আড়াই বছর পর খলিফা হন হযরত ওমর (রহ.)। তিনি ১০ বছর রাষ্ট্র পরিচালনা করে শাহাদত বরণ করলে খলিফা হন হযরত উসমান (রা.)। তিনি রাষ্ট্র পরিচালনা করেন ১২ বছর। ততদিনে রাষ্ট্রে অনৈক্য, বিশৃঙ্খলা ও রক্তপাতের ঘটনা ঘটতে থাকে। হযরত উসমান শাহাদত বরণ করলে ইসলামী জাহান পরিচালনা করার দায়িত্ব নেন হযরত আলী। তিনিও খারেজি সম্প্রদায়ের গুপ্তঘাতকের হাতে নামাজরত অবস্থায় আক্রমণের শিকার হয়ে শহিদ হন।
হিজরি ৪০ বছরে খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগের সমাপ্তি ঘটে। এরপর আসে রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা। হযরত আলীর শাহাদতের পর মুসলমানরা তার প্রথম পুত্র হযরত ইমাম হাসানকে খলিফা হিসেবে মনোনীত ও তার হাতে বায়আত গ্রহণ করে। কিন্তু তার শাসনকাল ছয় মাসের বেশি স্থায়ী হয়নি। হযরত আলীর বিরোধ ছিল সিরিয়ার গভর্নর আমীর মুয়াবিয়া (রা.)-এর সঙ্গে। আমীর মুয়াবিয়ার বিশাল ব্যক্তিত্ব, রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তির মোকাবিলায় ইমাম হাসান দেখলেন যে, শুধু মুসলমানদের রক্তক্ষয় হবে, তিনি জিততে পারবেন না। অতপর. আমীর মুয়াবিয়া (রা.)-এর অনুকূলে তিনি খেলাফতের দাবি ত্যাগ করেন।
৬০ হিজরি পর্যন্ত মুসলিম জাহানের খলিফার আসনে সমাসীন হন হযরত আমীর মুয়াবিয়া। তিনি ছিলেন আরবের বিখ্যাত উমাইয়া বংশের লোক। তিনি অতীতের যুদ্ধবিগ্রহ হানাহানি রক্তপাতের অভিজ্ঞতা থেকে চিন্তা করলেন, উমাইয়া বংশের কোনো লোক না হলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে না। কারণ, এরইমধ্যে উমাইয়া বংশের লোকেরা সরকারী পদ পদবি দখল করে ফেলেছে। তাই তিনি মুগিরা ইবনে শোবার পরামর্শে পুত্র এজিদকে যুবরাজ হিসেবে ঘোষণা করেন। মৃত্যুকালে ছেলেকে উপদেশ দেন যে, তুমি খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করার পর চারজন ব্যক্তিকে দেখবে যে, তোমার বিরোধীতার অনড়। এর মধ্যে দুজন খুবই ভয়ঙ্কর। একজন হোসাইন ইবনে আলী আরেকজন আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর। তুমি তাদের সাথে ঝামেলা এড়িয়ে যাবে।
কিন্তু ৬০ হিজরিতে আমীর মুয়াবিয় (রা) এর ইন্তিকালের সাথে সাথে এজিদ মদীনায় নিযুক্ত গভর্নরকে নির্দেশ দেয়, যেভাবেই হোক উল্লেখিত দুইজনের কাছ থেকে বাইয়াত বা রাষ্ট্রপ্রধানের প্রতি আনুগত্যের শপথ নিতে হবে। নানা ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে তারা আঁচ করতে পারলেন যে, তাদের হয় এজিদের হাতে বায়আত গ্রহণ করতে হবে, নতুবা তাদের হত্যা করা হবে।
কিন্তু হোসাইন ইবনে আলী রাসূলের নাতি হয়ে তো কোনো ফাসেক ফাজেরের হাতে বায়আত করতে পারেন না। তাহলে কিয়ামত পর্যন্ত মুসলমানদের সামনে দৃষ্টান্তে পরিণত হবে যে, শাসক ইসলামের বিরুদ্ধাচরণকারী হলেও তার প্রতি আনুগত্য করতে হবে বা যেকোনো শাসককে মেনে নিলে ঈমান ও আমলে কোনো অসুবিধা হবে না। এজিদ ছিল লম্পট ও মদ্যপ। ইতিহাস তাকে এজিদে পলীদ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। পলীদ মানে নাপাক। যাইহোক, রাতের অন্ধকারে তারা দুজনই পৃথকভাবে পরিবার পরিজনসহ মদীনা ছেড়ে মক্কায় চলে আসেন। কারণ মক্কা ছিল নিরাপদ এবং খানায়ে কাবা ছিল নিরাপত্তার গ্যারান্টি। এ ছিল রজব মাসের ঘটনা।
মক্কায় থাকাকালীন কুফার গণ্যমান্য লোকেরা ইমাম হোসাইনের কাছে একের পর এক চিঠি লিখতে থাকে। চিঠির অভিন্ন বক্তব্য ছিল দামেস্কের মসনদে এজিদ ক্ষমতাসীন হয়েছে আমরা দুশ্চরিত্র এজিদের আনুগত্য করতে করব না। আপনি আসেন, আপনিই আমাদের শাসক হবেন, আপনার নেতৃত্বে যে কোনো ত্যাগ স্বীকার করতে আমরা প্রস্তুত। প্রায় এক বস্তা চিঠি জমা হওয়ার পর ইমাম হোসাইন সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি কুফায় চলে যাবেন।
কারণ, মক্কায় থাকলে তাকে হত্যা করার জন্য আক্রমণ চালানো হবে, তাতে আল্লাহর ঘরের সম্মানহানি হবে, হেরেমে রক্তপাত ঘটবে। মক্কার গণ্যমান্য সবাই অনুরোধ করল, আপনি রাসূলের নাতি, আমাদের নয়নের মণি, আপনি আমাদের মাঝেই থাকেন। তিনি জানিয়ে দিলেন, আমার সিদ্ধান্ত, আমি কুফার লোকদের মাঝে চলে যাব। তবে দেখব আল্লাহর দ্বীনের স্বার্থে খেলাফতের মর্যাদা রক্ষার খাতিরে কে কে আমার সাথে যেতে আগ্রহী।
দীর্ঘ কয়েক মাস মক্কায় অবস্থানের পর তিনি কুফা যাত্রার দিনক্ষণ ঠিক করলেন। আমরা হজের সময় ৮ জিলহজ মীনায় যাই, ৯ তারিখ আরাফায় মূল হজ আর ১০ তারিখ কোরবানি। ইমাম হোসাইন কুফায় রওনা হলেন ৮ জিলহজ। কারণ, তিনি এর আগে একাধিকবার হজ করেছেন। এ হজ তার জন্য নফল। দ্বিতীয়ত হয়ত চিন্তা করেছেন হজের সময় গুপ্তঘাতক দিয়ে তাকে হত্যা করা হবে। রওনা হওয়ার আগে কুফাবাসীর পত্রের উপর তিনি নির্ভর করলেন না; বরং চাচাত ভাই মুসলিম ইবনে আকিলকে পাঠালেন সরেজমিনে গিয়ে রিপোর্ট করার জন্য।
মুসলিম ইবনে আকিল কুফায় পৌঁছলে ১৮ হাজার মানুষ তার মাধ্যমে ইমাম হোসাইনের হাতে বাইয়াত গ্রহণ করে। তিনি তা পত্রযোগে ইমাম হোসাইনকে জানিয়ে কুফার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার অনুরোধ জানান।
এই সংবাদের ভিত্তিতে ইমাম হোসাইন (রা.) তাঁর পরিবারের ১৯ জন সদস্যসহ প্রায় ৫০ জন সঙ্গী নিয়ে কুফার উদ্দেশে রওনা হন।
এই খবর ইয়াজিদের কাছে পৌঁছালে কুফার গভর্নর নোমান ইবনে বশির (রা.)-কে পদচ্যুত করে ওবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদকে কুফার গভর্নরের দায়িত্ব প্রদান করেন এবং তাকে এই মর্মে নির্দেশ দেন, ইমাম হোসাইন (রা.) যেন কোনোভাবেই কুফায় প্রবেশ করতে না পারে। ওবায়দুল্লাহ বিন জিয়াদ কুফায় পৌঁছে সেখানকার জনগণকে কঠোর হস্তে দমন করে এবং মুসলিম বিন আকিলকে হত্যা করে। এরপর ইমাম হোসাইন (রা.)-কে প্রতিরোধ করতে চার হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী প্রেরণ করে।
ইবনে জিয়াদের বাহিনী কারবালার প্রান্তরে অবরোধ করলে হোসাইন (রা.) বললেন, আমি তো যুদ্ধ করতে আসিনি। তোমরা আমাকে ডেকেছ বলে আমি এসেছি। এখন তোমরা কুফাবাসীরাই তোমাদের বাইয়াত পরিত্যাগ করছ। তা হলে আমাদেরকে যেতে দাও, আমরা মদিনায় ফিরে যাই অথবা সীমান্তে কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করি অথবা সরাসরি ইয়াজিদের কাছে গিয়ে তার সঙ্গে বোঝাপড়া করি।
কিন্তু ইবনে জিয়াদ নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করে তার হাতে আনুগত্যের শপথ নিতে আদেশ দেয়। ইমাম হোসাইন (রা.) ঘৃণা ভরে তার এ আদেশ প্রত্যাখ্যান করেন।
অতঃপর আশুরার দিন সকাল থেকে ইবনে জিয়াদের বাহিনী হোসাইন (রা.)-এর ওপর আক্রমণ চালাতে থাকে এবং ফোরাত নদী থেকে পানি সংগ্রহের সব পথ বন্ধ করে দেয়।
হজরত হোসাইন (রা.)-এর শিবিরে শুরু হয় পানির জন্য হাহাকার। হোসাইন (রা.) সাথীদের নিয়ে বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করতে থাকেন। এই যুদ্ধে একমাত্র ছেলে হজরত জায়নুল আবেদিন (রহ.) ছাড়া পরিবারের শিশু, কিশোর ও মহিলাসহ সব পুরুষ সাথীরা সবাই একে একে শাহাদাতের অমিয়সুধা পান করেন।
মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত ইমাম হোসাইন একাই বীর বিক্রমে লড়াই চালিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত অত্যন্ত নির্মম ও নির্দয়ভাবে ইমাম হোসাইনকে শহীদ করা হয়। সিনান বা শিমার নামক এক পাপিষ্ঠ তার মস্তক দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে।
শাহাদাতের পর ইমাম হোসাইন (রা.)-এর ছিন্ন মস্তক বর্শা ফলকে বিদ্ধ করে এবং তাঁর পরিবারের জীবিত সদস্যদেরকে দামেশকে ইয়াজিদের কাছে প্রেরণ করা হয়। ইমামের কর্তিত মস্তক দেখে ইয়াজিদ ভীত ও শঙ্কিত হয়ে পরে এবং বাহ্যিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করে বলে, আমি তো ইমাম হোসাইনকে শুধু কুফায় প্রবেশে বাধা দিতে নির্দেশ দিয়েছিলাম, তাঁকে হত্যা করার নির্দেশ দেইনি। এরপর তাঁর পরিবার-পরিজনকে স্বসম্মানে মদিনায় প্রেরণ করা হয়। (সূত্র : আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া)
ইয়াজিদের বাহিনী কারবালা প্রান্তরে জয়লাভ করলেও তারা মূলত পরাজিত হয়। ইতিহাস সাক্ষীÑ ইমাম হোসাইন ও তাঁর সাথীদের হত্যায় জড়িত প্রতিটি ব্যক্তি কয়েক বছরের মধ্যেই মুখতার সাকাফির বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে নিহত হয়। মাত্র চার বছরের মধ্যে ইয়াজিদ মৃত্যুবরণ করে এবং তার পুত্রেরও কয়েকদিনের মধ্যে মৃত্যু হয়। এরপর আর কোনোদিন তার বংশের কেউ শাসন ক্ষমতা লাভ করেনি।
ইমাম হোসাইনের শাহাদাতের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে, দুনিয়ার জয়-পরাজয়, সফলতা-ব্যর্থতা, ক্ষমতা বা শক্তি দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। বরং প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও সত্য এবং ন্যায়ের পথে অবিচল থাকার মধ্যেই রয়েছে চূড়ান্ত সফলতা।
ইমাম হোসাইন আজো বেঁচে আছেন আদর্শিক প্রেরণা হিসেবে। তাঁর ত্যাগ ও শাহাদাতের কারণে যুগের পর যুগ মানব হৃদয়ে শ্রদ্ধা ও ভক্তির সঙ্গে তিনি অমর হয়ে থাকবেন।
এ ঘটনা স্মরণ করে বিশ্ব মুসলিম যথাযোগ্য মর্যাদায় দিনটি পালন করে থাকে। শান্তি ও সম্প্রীতির ধর্ম ইসলামের মহান আদর্শকে সমুন্নত রাখতে তাদের এই আত্মত্যাগ মানবতার ইতিহাসে সমুজ্জ্বল হয়ে রয়েছে।
কারবালার এই শোকাবহ ঘটনা ও পবিত্র আশুরার শাশ্বত বাণী সবাইকে অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে এবং সত্য ও সুন্দরের পথে চলতে প্রেরণা যোগায়।
দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক বিশেষ প্রবন্ধ, নিবন্ধ প্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ বিভিন্ন বেসরকারি রেডিও-টিভি চ্যানেলও এই দিনের তাৎপর্য নিয়ে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা সম্প্রচার করছে।