।।বিকে আন্তর্জাতিক ডেস্ক।।
লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণের উপশহর হারেত হরাইকের একটি আবাসিক ভবনে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর বিমান হামলায় কমপক্ষে পাঁচজন নিহত হয়েছেন। যার মধ্যে হিজবুল্লাহর শীর্ষ সামরিক কমান্ডার হায়সম আলী তাবাতাবাইও নিহত হয়েছেন। আরও অন্তত ২৫ জন আহত হয়েছেন বলে লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
সোমবার ২৪ নভেম্বর এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু রবিবার ২৩ নভেম্বরের এই হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেছেন, এ হামলার লক্ষ্য ছিল হাইথাম আলী তাবাতাবাই। হাইথামকে হিজবুল্লাহর চিফ অব স্টাফ বলে দাবি করেছেন তিনি। নেতানিয়াহু বলেছেন, হিজবুল্লাহর জনবল বৃদ্ধি ও অস্ত্র সংগ্রহের প্রচেষ্টার নেতৃত্ব দিয়েছেন হাইথাম।
লেবাননের রাজধানী বৈরুতে বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। শহরটির দক্ষিণাঞ্চলীয় এলাকায় চালানো এই হামলার ঘটনায় সাম্প্রতিক উত্তেজনা আরও বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
লেবাননের টেলিভিশন চ্যানেল আল-জাদিদ বলেছে, জনবসতিপূর্ণ ওই এলাকায় ইসরায়েলের হামলায় ভবন ও পার্ক করা গাড়ির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। রাষ্ট্রীয় সংবাদসংস্থা এনএএ জানায়, হারেত হ্রেইক এলাকার আল-আরিদ স্ট্রিটের ওই ভবনটিতে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয় এবং পার্কিং এলাকা, গাড়ি ও আশপাশের ভবনগুলোতেও ব্যাপক ক্ষতি হয়।
বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপশহরের হাসপাতালগুলো রক্তের জরুরি প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে। লেবাননের সেনাবাহিনী বলেছে, তারা এলাকায় নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করেছে। হামলার পর ইসরায়েলি সব যুদ্ধবিমান দক্ষিণাঞ্চলীয় উপশহরের দাহিয়ে অঞ্চলের আকাশে টহল দিচ্ছে।
সংবাদমাধ্যমটি বলছে, রবিবার বৈরুতের দাহিয়েহ এলাকায় হিজবুল্লাহ নিয়ন্ত্রিত একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে হামলায় তাবাতাবাইসহ অন্তত পাঁচজন নিহত হন। সংগঠনের সশস্ত্র শাখার চিফ অব স্টাফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করা তাবাতাবাইয়ের মৃত্যুর বিষয়টি পরে হিজবুল্লাহর এক বিবৃতি থেকে নিশ্চিত করা হয়।
বিবৃতিতে তাকে “মহান কমান্ডার” হিসেবে উল্লেখ করা হলেও সংগঠনের ভেতরে তার সুনির্দিষ্ট পদ উল্লেখ করা হয়নি।
এর আগে, রবিবার সকালের দিকে নেতানিয়াহু বলেন, ইসরায়েল হিজবুল্লাহকে আবার সক্ষমতা ফিরে পেতে বাধা দেওয়ার জন্য যা করা দরকার, তার সবই করবে।
লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন ওই হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি ইসরায়েলি হামলা থামাতে এবং আন্তর্জাতিক প্রস্তাব বাস্তবায়নে ইসরায়েলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে হামলা বন্ধ, আঞ্চলিক উত্তেজনা রোধ এবং রক্তপাত ঠেকাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা তাবাতাবাইকে “নিষ্ক্রিয়” করেছে। এর আগে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর দপ্তর জানায়, হামলার লক্ষ্যই ছিলেন তাবাতাবাই। ইসরায়েলি গণমাধ্যম বলছে, গত বছরের যুদ্ধের পর থেকে এটি ছিল তাবাতাবাইকে হত্যার তৃতীয় প্রচেষ্টা।
হিজবুল্লাহর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মাহমুদ ক্বোমাতি এর আগে বলেছিলেন, এই হামলা “রেড লাইন অতিক্রম করেছে” এবং সংগঠনের নেতৃত্ব প্রতিক্রিয়া জানানো হবে কি না, তা বিবেচনা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, দক্ষিণ উপশহরে আজকের এই হামলা লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় বড় ধরনের উত্তেজনার দ্বার খুলে দিয়েছে।
বৈরুত থেকে আল জাজিরার জেইনা খোদর জানান, ইসরায়েল “যে দমন-পীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে, তা আরও বাড়তে পারে” বলে লেবাননে উদ্বেগ বাড়ছে।
তিনি বলেন, হিজবুল্লাহ এখন খুব কঠিন অবস্থায় আছে। তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়েছে। জবাব না দিলে আরও বড় আক্রমণ হতে পারে। আবার জবাব দিলে আরও ব্যাপক ইসরায়েলি হামলার ঝুঁকি আছে, যা তাদের সমর্থকদেরও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক আলি রিজক আল জাজিরাকে বলেন, এখন মূল প্রশ্ন হলো হিজবুল্লাহ কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে। তিনি বলেন, “আমার মতে, হিজবুল্লাহ নেতানিয়াহুকে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে যাওয়ার অজুহাত দিতে চাইবে না। এতে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিকভাবে লাভ হবে এবং লেবাননের ক্ষতি বাড়বে।”
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ২৭ নভেম্বর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর বৈরুতে কয়েকবার হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। দক্ষিণ ও পূর্ব লেবাননের অন্যান্য এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই হামলা করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। ইসরায়েল বলছে, হিজবুল্লাহর হুমকি দূর করার উদ্দেশ্যে এসব হামলা চালানো হচ্ছে। ইসরায়েল লেবানন সীমান্ত এলাকায় পাঁচটি প্রধান স্থানে এখনও সেনা মোতায়েন রেখেছে।
শুক্রবার লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলেছিল, ২০২৪ সালের ২৮ নভেম্বরের পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় লেবাননে ৩৩১ জন নিহত এবং ৯৪৫ জন আহত হয়েছেন।
সূত্র: এএফপি।