।।বিকে আন্তর্জাতিক ডেস্ক।।
সুইজারল্যান্ডের ডাভোসে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে ‘বোর্ড অব পিস’ নামে একটি নতুন আন্তর্জাতিক উদ্যোগ চালু করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
বৃহস্পতিবার ২২ জানুয়ারি ডোনাল্ড ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বোর্ড অব পিস’ উদ্বোধন করেছেন। তিনি এটি একটি দীর্ঘ প্রতীক্ষিত, অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ দিন হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
এ নিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা বিশ্বে শান্তি আনব। এক বছর আগে পৃথিবী বাস্তবিকভাবে আগুনে দগ্ধ ছিল, অনেকেই তা জানতেন না। তবে এখন অনেক ভালো কাজ হচ্ছে এবং বিশ্বের আশেপাশের হুমকি আস্তে আস্তে কমছে।’
বোর্ডের প্রাথমিক ধারণা এসেছে ট্রাম্পের গাজার ২০-পয়েন্টের যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনা থেকে, যা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ অনুমোদন করেছে। মূলত এটি গাজার পুনর্নির্মাণ ও শান্তি স্থাপনের জন্য গঠিত হলেও, পরে এর লক্ষ্য বিশ্বব্যাপী সংঘাত মোকাবিলা পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছে।
বোর্ডের প্রাথমিক সদস্য দেশগুলোর নেতাদের সঙ্গে ট্রাম্পের উপস্থিতিতে এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ছিলেন আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট জাভিয়ের মিলে ও হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান। ট্রাম্প তার প্রশাসনের কাজের প্রশংসা করে বলেন, ‘আমরা আটটি যুদ্ধে স্থিতিশীলতা এনেছি এবং রাশিয়ার ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ করার দিকে অনেক অগ্রগতি হয়েছে।’
বিশ্বের প্রায় ৩৫টি দেশ ‘বোর্ড অব পিসে’ যোগ দেওয়ার জন্য ইতিমধ্যেই সম্মত হয়েছে, এর আগে ৬০টি দেশ যুক্তরাষ্ট্রের আমন্ত্রণ পেয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন, মিশর, পাকিস্তান, তুরস্ক, কাজাকস্তান, উজবেকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, হাঙ্গরি, মরক্কো, কোসোভো, আর্জেন্টিনা, প্যারাগুয়ে, ইসরায়েল, আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান, বেলারুশ ও ইউরোপের কিছু দেশ ইতিমধ্যেই বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
ট্রাম্প জানিয়েছেন, বোর্ডের স্থায়ী সদস্যদের প্রত্যেককে এক বিলিয়ন ডলার করে তহবিলে দিতে হবে। রয়টার্স জানায়, বোর্ডের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশ্বের প্রধান শক্তি, ইসরাইল কিংবা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া এখনো কেউ বোর্ডে যোগ দেয়নি। রাশিয়া জানিয়েছে, তারা প্রস্তাবটি বিবেচনা করছে। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেন, ফিলিস্তিনিদের সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্রে জব্দ করা রুশ সম্পদ থেকে এক বিলিয়ন ডলার দিতে তারা প্রস্তুত।
তবে ফ্রান্স এই বোর্ডে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ব্রিটেন জানিয়েছে, আপাতত তারা এতে যোগ দিচ্ছে না। চীন এখনো কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি। জাতিসংঘের এক মুখপাত্র বলেছেন, নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব অনুযায়ী গাজা শান্তি পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই বোর্ডের সঙ্গে জাতিসংঘের সম্পৃক্ততা থাকবে।
বোর্ডের সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন মার্কো রুবিও, ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার, গাজা বিষয়ক আলোচক স্টিভ উইটকফ এবং সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার। জ্যারেড কুশনার জানিয়েছেন, যুদ্ধবিরতির পরবর্তী ধাপে গাজার পুনর্গঠন ও হামাসের নিরস্ত্রীকরণ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান পশ্চিমা মিত্র ও বড় বৈশ্বিক শক্তিগুলো এখনো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। তবে এই উদ্যোগের ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এই বোর্ড জাতিসংঘের কূটনৈতিক কর্তৃত্বকে দুর্বল করে দিতে পারে।
ট্রাম্পের মতে, বোর্ডের লক্ষ্য শুধুমাত্র গাজার স্থায়ী শান্তি নয়, এটি বিশ্বব্যাপী সংঘাত মোকাবিলার একটি প্ল্যাটফর্ম হতে পারে। মার্কো রুবিও বোর্ডকে ‘কর্মপ্রবণ নেতাদের একটি দল’ হিসেবে অভিহিত করেছেন, যেখানে প্রথমে গাজার শান্তি নিশ্চিত হবে, পরে অন্য অঞ্চলেও এটি সম্প্রসারিত হবে।
অন্যদিকে ট্রাম্পের বোর্ড নিয়ে উদ্বেগ ও সমালোচনা জানিয়েছেন রাজনীতিক বিশেষজ্ঞরা। তারা উদ্বেগের মূল কারণগুলো উল্লেখ করেছেন- ট্রাম্পের অসীমকালীন চেয়ারম্যান পদ; বোর্ডের প্রসারিত লক্ষ্য, যা শুধুমাত্র গাজার পুনর্নির্মাণে; জাতিসংঘের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব, বিশেষত ট্রাম্পের মন্তব্য বোর্ডটি হয়তো জাতিসংঘের বিকল্প হতে পারে; পরিষদ সদস্যদের তিন বছরের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হবে। স্থায়ী আসনের জন্য এক বিলিয়ন ডলার প্রদান করতে হবে; দুর্নীতির সম্ভাবনা।
ট্রাম্প বোর্ডের উদ্বোধনের দিনে তার ইরান-নিয়ন্ত্রিত কূটনীতি এবং গাজার যুদ্ধবিরতি অর্জনের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনার ওপর নেওয়া সামরিক পদক্ষেপকে ট্রাম্প উল্লেখ করে বলেছেন, ‘এই পদক্ষেপ ছাড়া গাজার শান্তি সম্ভব হতো না।
এদিকে যুদ্ধিবিরতি নিয়ে ইসরাইল ও হামাস একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ করছে। ইসরাইলের দাবি, হামাস এখনও এক জিম্মির মরদেহ ফেরত দেয়নি। অন্যদিকে হামাসের অভিযোগ, ইসরাইল গাজায় ত্রাণ প্রবেশে বাধা দিচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্পের বোর্ড অব পিসে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন। ফিলিস্তিনি দলগুলোর পক্ষ থেকেও ট্রাম্পের পরিকল্পনার প্রতি সমর্থন জানানো হয়েছে এবং গাজা শাসনের জন্য একটি অন্তর্বর্তী কমিটিকে সমর্থন দেওয়া হয়েছে।
তবে যুদ্ধবিরতির পরবর্তী ধাপে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ, গাজার নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ এবং ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের মতো কঠিন ইস্যুগুলো এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।