।।বিকে রিপোর্ট।।
ঐতিহাসিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের এক বছর পূর্ণ হওয়ার দিন আজ বহুল আকাক্সিক্ষত জুলাই ঘোষণাপত্র পাঠ করবেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস।
মঙ্গলবার ৫ আগস্ট বিকাল ৫টায় জাতীয় সংসদের দক্ষিণে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে ঘোষণাপত্রটি পাঠ করবেন তিনি।
এ উপলক্ষে অস্থায়ী মঞ্চ তৈরিসহ সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে সরকার। এই ঘোষণাপত্র পাঠের অনুষ্ঠান বাংলাদেশ টেলিভিশনের মাধ্যমে সরাসরি প্রচার করা হবে।
এ ছাড়া সারাদেশ থেকে সরকারি উদ্যোগে ছাত্র-জনতাকে ঢাকায় আনা হচ্ছে। জুলাই ঘোষণাপত্র উপলক্ষে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং স্পেশাল ড্রোন ড্রামার আয়োজন করা হয়েছে, যা সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। অনুষ্ঠান ঘিরে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে নিñিদ্র নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
গণ-অভ্যুত্থান দিবস যথাযথ মর্যাদায় পালনের লক্ষ্যে দেশের ৬৪ জেলায় জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে সকাল ৯টায় পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হবে। দিনটি উপলক্ষে আজ সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এদিন দেশের প্রতিটি ধর্মীয় উপাসনালয়ে মোনাজাত ও প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছে।
দিবসটি উপলক্ষে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের সব সার্কেল অফিস স্ব স্ব অধিক্ষেত্রে রাস্তার পাশে বা নিজস্ব জায়গায়, ট্রাফিক ইন্টারসেকশনে বনজ, ফলদ ও ঔষধি গাছ রোপণ করবে। এ ছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনসমূহে জুলাই নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র, ডকুমেন্টারি ও প্রামাণ্যচিত্র প্রচার করা হবে।
যা থাকছে ঘোষণাপত্রে : গত বছর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে গত এক বছর আলোচনায় ছিল ‘জুলাই সনদ’ ও ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’। একপর্যায়ে জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে জুলাই ঘোষণাপত্র পাঠের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
পরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তরফ থেকে জানানো হয় জুলাই ঘোষণাপত্র সরকারই ঘোষণা করবে। এর পর কয়েকটি দলের সঙ্গে আলোচনা করে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে এই ঘোষনাপত্র তৈরি করে সরকার। ফলে এতে কী থাকছে, তা এখনও গোপন রয়ে গেছে। তবে ঘোষণাপত্রে থাকতে পারে এমন বেশকিছু বিষয় ইতোমধ্যে নানা ফোরামে আলোচিত হয়েছে।
জুলাই ঘোষণাপত্রের একটি খসড়া প্রস্তুত করে গত মাসে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মতামত নেওয়া হয়। ঘোষণাপত্রে শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে বিএনপি, জামায়াতসহ বিরোধী দলগুলোর সংগ্রামকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কোন প্রেক্ষাপটে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে জুলাই অভ্যুত্থান হয়েছে, সেটিরও উল্লেখ থাকছে ২৬ থেকে ২৭ দফার এই ঘোষণাপত্রে।
জানা গেছে, এ ঘোষণাপত্র বাংলাদেশের সংবিধানে যুক্ত করা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এখনও মতবিরোধ চলছে। এ নিয়ে কিছুটা পরস্পরবিরোধী অবস্থানে রয়েছে বিএনপি ও এনসিপি। এই ঘোষণাপত্রের শুরুতে পাকিস্তানের স্বৈরশাসকদের বঞ্চনা, শোষণ নির্বিচার গণহত্যার বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটের বিষয়টি উল্লেখ থাকছে। পরে ১৯৭৫ সালের একদলীয় বাকশাল কায়েমের বিষয়টিরও উল্লেখ থাকছে ঘোষণাপত্রে। সেই সঙ্গে সিপাহি-জনতার বিপ্লবে বাকশালের অবসান কীভাবে হয়েছিল, সেটিও থাকছে জুলাই ঘোষণাপত্রে। পরের দফায় আশির দশকে সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার সংগ্রাম ও নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানকেও যুক্ত করা হয়েছে।
খসড়ার এক-এগারোর সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে সে সময় দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের ফল হিসেবেও আখ্যা দেওয়া হয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের এই ঘোষণাপত্রে যুক্ত থাকছে আওয়ামী লীগ শাসনামলের সীমাহীন দুর্নীতি, ব্যাংক লুট, অর্থ পাচারসহ বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতি এবং জাতীয় সংসদের তিনটি প্রহসনের নির্বাচনের বিষয়গুলো। শেখ হাসিনা সরকারের শাসনামলে বিরোধী মত, জনগণকে চরম নির্যাতন-নিপীড়ন, সরকারি চাকরিতে একচেটিয়া দলীয় নিয়োগ ও কোটাভিত্তিক বৈষম্যের কারণে ছাত্র, চাকরিপ্রত্যাশী ও নাগরিকদের মধ্যে চরম ক্ষোভের বিষয়গুলোও যুক্ত থাকছে এই ঘোষণাপত্রে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে জনতার অভ্যুত্থান, অন্তর্বর্তী সরকারের গঠনের প্রেক্ষাপট, আগামীতে বাংলাদেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের অঙ্গীকার, আওয়ামী লীগ আমলের সব গুম, খুন, দুর্নীতির বিচার ও জনগণের আকাক্সক্ষা পূরণে সংস্কার উদ্যোগের বিষয়গুলোও থাকছে জুলাই ঘোষণাপত্রে। এই ঘোষণাপত্রের সর্বশেষ দফায় বলা হয়েছে, জুলাই বিপ্লবের এই ঘোষণাপত্র ২০২৪ সালের পাঁচই আগস্ট থেকে কার্যকর বলে গণ্য হবে।