ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথে নজিরবিহীন অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের আকাশসীমা বন্ধ ঘোষণা করছে। যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের বিমান চলাচলের ওপরও। বাতিল হচ্ছে একের পর এক ফ্লাইট। হাজার হাজার যাত্রীর গন্তব্যে পৌঁছানো নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। অন্যদিকে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সগুলো। বিশেষ করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স চলমান পরিস্থিতিকে তাদের ব্যবসার জন্য বড় ধাক্কা হিসাবে দেখছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে চলতি অর্থবছর শেষে বড় ধরনের লোকসানে পড়তে পারে এয়ারলাইন্সগুলো।
বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে ইরান, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার ও জর্ডান তাদের আকাশসীমা বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে ঢাকা থেকে এসব দেশের রুটে ধারাবাহিকভাবে ফ্লাইট বাতিল করা হচ্ছে। শুক্রবার ৩৩টিসহ সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে মোট ২৪৫টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পরিচালনা পর্ষদের সাবেক সদস্য এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম যুগান্তরকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে এয়ারলাইন্সগুলো মারাত্মক ব্যবসায়িক ক্ষতির মুখে পড়বে। পরে সেই ক্ষতি পোষাতে বিভিন্ন রুটের টিকিট ভাড়া বাড়ানো হতে পারে। যার সরাসরি প্রভাব পড়বে যাত্রীর ওপর। তিনি আরও বলেন, এখনই ক্ষতির সুনির্দিষ্ট হিসাব করা কঠিন হলেও যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বড় ধরনের আর্থিক প্রভাব পড়বে সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই।
সূত্রমতে, ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে শুক্রবার ৩৩টি ফ্লাইট বাতিল হয়। সর্বশেষ বাতিল হওয়া ফ্লাইটগুলোর মধ্যে রয়েছে কুয়েতের ৪টি, এয়ার অ্যারাবিয়ার ৬টি, কাতারের ৪টি, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ২টি, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের ৫টি, বাহরাইনের ২টি, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ২টি এবং এমিরেটসের ৪টি ফ্লাইট।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) জনসংযোগ কর্মকর্তা কাওছার মাহমুদ জানান, মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা শুরুর পর থেকে ধারাবাহিকভাবে ফ্লাইট বাতিলের সংখ্যা বাড়ছে। বাতিল হওয়া এসব ফ্লাইটের মধ্যে রাষ্ট্রীয় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও বেসরকারি ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সেরও অনেক ফ্লাইট রয়েছে। তিনি বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এ সংখ্যা আরও বাড়তে থাকবে এবং অনিশ্চয়তা কাটার সম্ভাবনা কম।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরুর পর থেকে ২ মার্চ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রুটে বিমানের মোট ২৪টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। পরবর্তীতে ৩ মার্চ থেকে আবুধাবি, শারজাহ, দুবাই, দোহা, কুয়েত ও দাম্মাম রুটে সব ফ্লাইট সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। এই ছয় রুটের মধ্যে ঢাকা-আবুধাবি ও ঢাকা-শারজাহ রুটে সপ্তাহে পাঁচটি করে ফ্লাইট পরিচালিত হয়। এর মধ্যে তিনটি সরাসরি ফ্লাইট। এসব ফ্লাইট পরিচালিত হয় বোয়িং ৭৩৭-৮০০ মডেলের উড়োজাহাজ দিয়ে। ঢাকা-দুবাই রুটে বিমানের সাপ্তাহিক ফ্লাইট সংখ্যা সাতটি, যা পরিচালিত হয় বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজ দিয়ে। অন্যদিকে ঢাকা-দোহা রুটে সপ্তাহে চারটি ফ্লাইট পরিচালনা করা হয় একই ধরনের ড্রিম লাইনার উড়োজাহাজে। ঢাকা-কুয়েত রুটে সপ্তাহে তিনটি ফ্লাইট পরিচালনা করে বিমান, যেখানে ব্যবহৃত হয় বোয়িং ৭৭৭-৩০০ মডেলের উড়োজাহাজ। এছাড়া ঢাকা-দাম্মাম রুটে বিমানের সাপ্তাহিক শিডিউলড ফ্লাইট সংখ্যা ছয়টি, যা পরিচালিত হয় ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজ দিয়ে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বিমানের বাণিজ্যিক কার্যক্রম মূলত মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। সরকারি এয়ারলাইন্স হিসাবে নানা সুযোগ-সুবিধা পেলেও গত ৫৪ বছরে রুট বৈচিত্র্য আনতে পারেনি সংস্থাটি। এখনো অভিবাসী শ্রমিকনির্ভর মধ্যপ্রাচ্যের বাজারের ওপরই নির্ভরশীল বিমান। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতি এই অতিনির্ভরতা সংস্থাটির জন্য বড় ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ৩৪ লাখ যাত্রী পরিবহণ করেছে এবং কার্গো পরিবহণ করেছে ৪৩ হাজার ৯১৮ টন। ওই অর্থবছরে সংস্থাটি ৯৩৭ কোটি টাকা অনিরীক্ষিত মুনাফা অর্জন করে। তবে বিমানের মুনাফার বড় একটি অংশই আসে মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমিক ও হজযাত্রী পরিবহণ থেকে। ফলে অঞ্চলটিতে যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে চলতি অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে নতুন আন্তর্জাতিক রুটে সম্প্রসারণ জরুরি। পাশাপাশি বর্তমানে অলস বসে থাকা উড়োজাহাজগুলো দিয়ে বিকল্প গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া উচিত। তার মতে, বর্তমান সংকট বাংলাদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর জন্য একটি বড় সতর্ক সংকেত, যা ভবিষ্যতে রুট বৈচিত্র্য আনার প্রয়োজনীয়তাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
সাধারণত, রমজান ও ঈদকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে হাজার হাজার প্রবাসী দেশে ফেরেন। এ সময় প্রায় সব ফ্লাইট পূর্ণ থাকে এবং এয়ারলাইন্সগুলোর ব্যবসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মৌসুম এটি। কিন্তু চলমান সংঘাতের কারণে সেই যাত্রী প্রবাহ প্রায় থমকে গেছে। ফলে রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের ঘাটতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) বোসরা ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, যেখানে এখন ভালো ব্যবসা হওয়ার কথা, সেখানে আমাদের একের পর এক ফ্লাইট বাতিল করতে হচ্ছে। দ্রুত এ অবস্থা না কাটলে বড় ধরনের আর্থিক বিপর্যয় দেখা দেবে।
একই পরিস্থিতি বেসরকারি ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সেরও। বর্তমানে অভ্যন্তরীণ সব রুটসহ আন্তর্জাতিক রুট কলকাতা, চেন্নাই, মালে, মাস্কাট, দোহা, দুবাই, শারজাহ, আবুধাবি, জেদ্দা, রিয়াদ, ব্যাংকক, কুয়ালালামপুর, সিঙ্গাপুর ও গুয়াংজু রুটে নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করে আসছে। বর্তমানে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের বহরে রয়েছে তিনটি এয়ারবাস এ৩৩০-৩০০। ৯টি বোয়িং ৭৩৭-৮০০ এবং এটিআর ৭২-৬০০ একটিসহ মোট ২৫টি এয়ারক্রাফট। এয়ারক্রাফটের সংখ্যার বিচারে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ এয়ারলাইন্স হিসাবে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে। মধ্যপ্রাচ্য সংকটের পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় অর্ধশত ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) কামরুল ইসলাম বলেন, রমজানে হাজার হাজার প্রবাসী দেশে আসেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির কারণে সেটি হচ্ছে না। দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে বড় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।