।।বিকে ডেস্ক।।
পবিত্র হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন আজ। আরাফার ময়দানে উপস্থিতি বা উকুফে আরাফাহ হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রধান ফরজ কাজ, যা ছাড়া হজ সম্পূর্ণ হয় না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “আল-হাজ্জু আরাফাহ” অর্থাৎ আরাফাতের ময়দানে অবস্থানই হলো মূল হজ।
মঙ্গলবার ২৬ মে জিলহজ মাসের ৯ তারিখ ভোর থেকেই আরাফাতের ময়দানে সমবেত হতে শুরু করেছেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা লাখো হজযাত্রী। সকলেই আরাফাতের প্রান্তরে ইবাদত, দোয়া ও আল্লাহর স্মরণে মগ্ন হন। ইসলামী ঐতিহ্যে ‘হজের মূল স্তম্ভ’ হিসেবে পরিচিত এই অবস্থানকে ঘিরে পুরো এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে গভীর আধ্যাত্মিক পরিবেশ।
তাদের সকলের কণ্ঠে একই সাথে ধ্বনিত হচ্ছে- “লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নিমাতা লাকা ওয়াল মুল্ক, লা শারিকা লাক” ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠেছে বিদায় হজের স্মৃতি বিজড়িত এই ময়দান। যার অর্থ, ‘আমি হাজির, হে আল্লাহ আমি হাজির, তোমার কোনো শরিক নেই; সব প্রশংসা, নিয়ামত ও রাজত্ব একমাত্র তোমারই।
উল্লেখ্র গতকাল মিনায় যাত্রার মাধ্যমেই শুরু হয়েছে হজের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম। মক্কা থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরের তাঁবুর নগরী মিনা ভরে ওঠে সাদা ইহরামে আবৃত আল্লাহর মেহমানদের পদচারণায়। সেখানে ইবাদত ও প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে রাত কাটিয়ে মঙ্গলবার ফজরের পর হাজিরা রওনা হয়েছেন আরাফাতের ময়দানের উদ্দেশে।
৯ জিলহজ দুপুর থেকে শুরু করে ওই দিন সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা আবশ্যক। নামাজ ও খুতবা শ্রবণ: দুপুরের পর মসজিদে নামিরা থেকে হজের মূল খুতবা প্রদান করা হয়। এরপর জোহর ও আসরের নামাজ একসঙ্গে কসর করে আদায় করা হয়.ময়দান ত্যাগ করে মুজদালিফার উদ্দেশ্যে রওনা হন।
ঐতিহাসিক এই আরাফাতের ময়দান মুসলিমদের কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। প্রায় ১৪০০ বছর আগে এখানেই মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন। আজও সেই ময়দানজুড়ে দিনভর দোয়া, জিকির, তিলাওয়াত ও আত্মসমর্পণের আবহ বিরাজ করবে।
হাদিসে আরাফাতের দিনের মর্যাদা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্ণনা রয়েছে, এ দিনে আল্লাহ অসংখ্য মানুষকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দান করেন এবং হাজিদের জন্য রহমতের দরজা উন্মুক্ত করে দেন।
আরাফাহ ও আরাফাত—এই দুটি শব্দই আরবিতে প্রচলিত। দৈর্ঘ্যে দুই মাইল, প্রস্থেও দুই মাইল এই বিরাট সমতল ময়দানের নাম আরাফাত। ময়দানের তিন দিক পাহাড়বেষ্টিত। এই আরাফাতে আছে জাবালে রহমত বা রহমতের পাহাড়। জাবাল মানে পাহাড়। এই পাহাড়ে একটি উঁচু পিলার আছে। একে কেউ কেউ দোয়ার পাহাড়ও বলেন। পিলারের কাছে যাওয়ার জন্য পাহাড়ের গায়ে সিঁড়ি করা আছে।
আরাফাত ময়দান মিনা থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে। এ ময়দানের প্রান্তে থাকা মসজিদটির নাম মসজিদে নামিরাহ। এ মসজিদে মিনার আছে ছয়টি। প্রতিটি মিনারের উচ্চতা ৬০ মিটার। মসজিদটিতে ৬৪টি গম্বুজ এবং ১০টি প্রধান দরজা রয়েছে।
এ মসজিদের জামাতে অংশগ্রহণকারী হাজিরা জোহর ওয়াক্তে এক আজানে দুই ইকামতের সঙ্গে একই সময় পরপর জোহর ও আসরের নামাজ আদায় করবেন। নামাজের আগে ইমাম হজের খুতবা দেবেন। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মুসলিমদের জন্য হজের খুতবা বাংলাসহ ৫০টির বেশি ভাষায় সরাসরি অনুবাদ করে সম্প্রচার করা হবে। এ বছর হজের খুতবা দেবেন মসজিদে নববীর ইমাম ও খতিব শায়খ আলী বিন আবদুর রহমান আল-হুজাইফি। ময়দানের পশ্চিম প্রান্তে মসজিদ আল-নামিরাহয় খুতবা পাঠ এবং নামাজ আদায়ে ইমামতির দায়িত্ব পালন করবেন তিনি।
খুতবা ও নামাজের মধ্য দিয়ে হাজিরা কাটাবেন দিনের গুরুত্বপূর্ণ সময়। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফাতে অবস্থান করে তারা আল্লাহর কাছে ক্ষমা, রহমত ও কল্যাণ প্রার্থনা করবেন। নিজেদের পাশাপাশি পরিবার, আত্মীয়স্বজন, দেশ ও মুসলিম উম্মাহর শান্তি ও কল্যাণ কামনাও করবেন তারা।
সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে গেলে আল্লাহর কাছে দোয়া করবেন হাজিরা। কিবলার দিকে মুখ করে দুই হাত উঁচু করে আল্লাহর গুণবাচক নাম, দরুদে ইবরাহিম, তালবিয়া, তাকরির, জিকির, ইস্তিগফার ও দোয়া করবেন তারা।
তারা সূর্যাস্ত পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করে আরাফাতের ময়দান থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে মুজদালিফায় গিয়ে মাগরিব ও এশার নামাজ আদায় করবেন। রাতে সেখানে খোলা মাঠে অবস্থান করবেন এবং শয়তানের প্রতিকৃতিতে নিক্ষেপের জন্য প্রয়োজনীয় (৪৯-৭০টি) পাথর সংগ্রহ করবেন।
বলা হয়, হজরত ইব্রাহিম (আ.) নিজ সন্তান ইসমাইলকে (আ.) কোরবানি করার জন্য মিনায় নিয়ে যাচ্ছিলেন। জামারায় পৌঁছালে শয়তান তাকে ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা করে। তখন শয়তানকে লক্ষ্য করে তিনি পাথর নিক্ষেপ করেন।
তিন শয়তানকে তাকবিরসহ পাথর নিক্ষেপ করা হজের অপরিহার্য অংশ। শয়তানের প্রতি ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে এই পাথর নিক্ষেপ করা হয়। শয়তানকে পাথর নিক্ষেপের সময় যাতে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে, সে জন্য সৌদি হজ কর্তৃপক্ষ হাজিদের ভাগ ভাগ করে জামারাতে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে।
জামারা কেন্দ্রীয়ভাবে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত, এখানে তাপমাত্রা থাকে ২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের জন্য জামারার ভেতরে একাধিক ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা আছে। রয়েছে পর্যাপ্ত টয়লেট, খাবারের দোকান ও সেলুন। জরুরি প্রয়োজনে হেলিকপ্টার অবতরণের জন্য রয়েছে হেলিপ্যাডও।
পাথর নিক্ষেপের সুবিধার্থে মিনার পূর্ব দিক থেকে আসা হাজিরা আসবেন নিচতলা ও দোতলায়, মক্কা থেকে আসা হাজিরা তৃতীয় তলায়, উত্তর দিক ও মোয়াইসিম থেকে আসা হাজিরা চতুর্থ তলায় এবং আজিজিয়া থেকে আসা হাজিরা পঞ্চম তলায় উঠে পাথর নিক্ষেপ করবেন।
১২টি করে ঢোকার ও বের হওয়ার পথ আছে এখানে। এখন হাজিদের পাথর মারার নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া আছে। মোয়ালেম নম্বর অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে পাথর মারতে হয়।
বুধবার মুজদালিফায় ফজরের নামাজ আদায় করে হাজিরা কেউ ট্রেনে, কেউ গাড়িতে, কেউ হেঁটে মিনায় যাবেন এবং নিজ নিজ তাঁবুতে ফিরবেন।
জামারায় শয়তানের প্রতিকৃতিতে পাথর নিক্ষেপের পর হাজিদের পশু কোরবানির প্রস্তুতি নিতে হয়। বুধবার তারা মিনায় বড় শয়তানকে সাতটি পাথর মারার পর পশু কোরবানি দেবেন। অধিকাংশ হাজি ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংকে ৭২০ রিয়াল জমা দিয়ে কোরবানি দেবেন। কেউ কেউ নিজে বা বিশ্বস্ত লোক দিয়ে মুস্তাহালাকায় (পশুর হাট ও জবাই করার স্থান) গিয়ে কোরবানি দেবেন।
তারপর তারা মাথার চুল ছেঁটে গোসল করবেন। সেলাইবিহীন দুই টুকরা কাপড় বদল করবেন। এরপর স্বাভাবিক পোশাক পরে (১০ থেকে ১৩ জিলহজের মধ্যে যে কোনো সময়) মিনা থেকে মসজিদুল হারামে গিয়ে কাবা শরিফ সাতবার তাওয়াফ করবেন।
কাবার সামনের দুই পাহাড় সাফা ও মারওয়ায় ‘সাঈ’ (সাতবার দৌড়াবেন) করবেন হাজিরা। সেখান থেকে তারা আবার মিনায় যাবেন। ১১ থেকে ১৩ জিলহজ মিনায় যত দিন থাকবেন, তত দিন তিনটি (বড়, মধ্যম, ছোট) শয়তানকে ২১টি পাথর মারবেন। আবার মসজিদুল হারামে গিয়ে কাবা শরিফ বিদায়ী তাওয়াফ করার পর নিজ নিজ দেশে ফিরবেন। যারা হজের আগে মদিনায় যাননি, তারা মদিনায় যাবেন।