।।বিকে রিপোর্ট।।
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে সম্প্রতি মারা যাওয়া নুরুল হক ওরফে নুরাল পাগলা নামে এক ব্যক্তির দরবারে হামলা চালিয়েছে তৌহিদি জনতা নামে একদল বিক্ষুব্ধ লোক। তারা ‘শরিয়ত পরিপন্থি’ পদ্ধতিতে দাফন করা হয়েছে- এমন অভিযোগ এনে নুরাল পাগলার মরদেহ কবর থেকে তুলে পুড়িয়ে দেয়। এ ঘটনায় অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।
শুক্রবার ৫ সেপ্টেম্বর জুমার নামাজের পর এ ঘটনা ঘটে।
জুমার নামাজের পর ইমান-আকিদা রক্ষা কমিটির উদ্যোগে ‘কালিমা, আজান, দুরুদ বিকৃতিকারী ও নিজেকে ইমাম মাহাদী দাবি করা ভন্ড নুরাল পাগলা’র আস্তানা উচ্ছেদ এবং কাবা শরীফের আকৃতিতে ১২ ফুট উঁচুতে কবর স্থাপনের প্রতিবাদে গোয়ালন্দে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। বিক্ষোভ সমাবেশের পরে উত্তেজিত জনতা নুরাল পাগলার আস্তানায় ভাঙচুর করতে যায়।
এ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে যাওয়া পুলিশের দুটি পিকআপ ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। পুলিশ, র্যাব ও সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, জুমার নামাজের পর পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী, বিভিন্ন স্থান থেকে তৌহিদি জনতা এসে শহীদ মহিউদ্দিন আনসার ক্লাবে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেন। তারা নুরুল হকের বাড়ি ও দরবারের ফটক ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। পরে তারা দরবার শরিফ ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে।
পুলিশ আগে থেকেই সেখানে থাকলেও বিপুল মানুষের কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তারা সক্ষম হয়নি। পরে সেনাবাহিনী ও র্যাব এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তখন তৌহিদি জনতা পিছু হটে নুরুল হকের বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে বিক্ষোভ করে। এ সময় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্যরা এসে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালায়।
এর কিছু পরে বাড়িতে গিয়ে দ্বিতীয় দফায় হামলা চালায় তৌহিদি জনতা। তখন তারা বাড়ির সামনে থাকা নুরুল হকের কবর থেকে মরদেহ তুলে নিয়ে চলে যায়। পরে তারা মরদেহটি ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের পদ্মার মোড়ে নিয়ে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়।
এ সময় তৌহিদি জনতার একজন মো. আল আমিন বলেন, ‘নুরাল পাগল একটা সময় নিজেকে ইমাম মাহাদি দাবি করেছেন। পাশাপাশি তিনি খোদাও দাবি করেছেন। তার কর্মকাণ্ড ছিলে শরিয়তবিরোধী। এসব ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা মেনে নিতে পরে নাই। যে কারণে জনতা আজ নুরাল পাগলের দরবার ভেঙে দিয়েছে। বাড়িঘর ভাঙচুর করে আগুন দিয়ে দিয়েছে। সেই সঙ্গে তার লাশ কবর থেকে তুলে পুড়িয়ে ফেলেছে।’
সম্প্রতি মারা যাওয়া নুরুল হকের কবর মাটি থেকে কিছুটা উপরে দাফন করে সেখানে কাবা শরিফের আদল দেয়া হয়। এ নিয়ে তৌহিদি জনতার মধ্যে গত কয়েকদিন ধরেই উত্তেজনা চলছিল। স্থানীয় প্রশাসন দুপক্ষকে সঙ্গে নিয়ে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করছিলেন।
কামরুল ইসলাম নামের আরেক ব্যক্তি বলেন, ‘লাশ না পুড়ালে তার ভক্ত ও পরিবারের লোকজন আবারও ভণ্ডামি শুরু করবে। যে কারণে কবর থেকে লাশ তুলে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে।
হাসমত আলী বলেন, ‘তার কবর দেয়া হয়েছে ১২ ফুট উঁচুতে যা শরিয়ত পরিপন্থী। তিনি কালেমা বিকৃত করতেন, আজান বিকৃত করতেন। আজ আমরা তৌহিদি জনতা তার আস্তানা গুড়িয়ে দিয়েছি। আমাদের কাজ শেষ।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গোয়ালন্দ পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের জুড়ান মোল্লা পাড়া এলাকায় নিজ বাড়িতে দরবার শরিফ গড়ে তোলেন নুরাল পাগলা। আশির দশকের শেষ দিকে তিনি নিজেকে ইমাম মাহদি দাবি করলে জনরোষ তৈরি হয়। পরে ১৯৯৩ সালের ২৩ মার্চ মুচলেকা দিয়ে তিনি এলাকা ছাড়েন। কয়েকদিন পর তিনি আবার দরবারে ফিরে কার্যক্রম শুরু করেন।
গত ২৩ আগস্ট ভোরে বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় তার মৃত্যু হয়। ওইদিন রাতে এলাকাবাসীর অংশগ্রহণে প্রথম জানাজা ও ভক্তদের অংশগ্রহণে দ্বিতীয় জানাজা শেষে রাতে সাড়ে ১০টার দিকে মাটি থেকে ১২ ফুট উঁচুতে বিশেষ কায়দায় দাফন করা হয়। যে স্থাপনার ওপর দাফন করা হয় সেখানে পবিত্র কাবার আদলে রং করা হয়। এ বিষয়টি জানতে পেরে ক্ষুব্ধ হন স্থানীয় আলেম সমাজ ও ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা।
তারা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগ এনে ‘ইমান-আকিদা রক্ষা কমিটি’ গঠন করেন। এই কমিটি গোয়ালন্দ উপজেলা মডেল মসজিদসহ রাজবাড়ী প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে। সংবাদ সম্মেলন করে স্থানীয় প্রশাসনসহ জেলা প্রশাসনের কাছে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের বিষয়টির শান্তিপূর্ণ সমাধান চান।
গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মারুফ বলেন, গোয়ালন্দ হাসপাতালে নুরাল পাগলের মাজার-সংক্রান্ত মারামারিতে ২২ জন এসেছিলেন। এর মধ্যে ১৯ জনকে ফরিদপুরে রেফার্ড করা হয়েছে। তিনজন ভর্তি ছিলেন, কিন্তু পরে তারা নিরাপত্তার জন্য সেচ্ছায় ফরিদপুর মেডিকেলে চলে গেছেন।
রাজবাড়ীর পুলিশ সুপার মো. কামরুল ইসলাম বলেন, উত্তেজিত জনতা নুরাল পাগলার আস্তানায় গিয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে। জুমার নামাজের পর তৌহিদি জনতা জড়ো হন। তাদের একটা অংশ দেশীয় অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে পুলিশের ওপর হামলা চালায়। সে সময় পুলিশের গাড়ি ও ইউএনওর গাড়ি ভাঙ্চুর করে। পরে নুরুল হকের বাড়িতে হামলা চালিয়ে অগ্নিসংযোগ করে।এ ঘটনায় অনেকে আহত হয়েছেন। তবে কারও মৃত্যুর খবর এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক রয়েছে।