।।বিকে রিপোর্ট।।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) কার্যনির্বাহী সদস্য সর্বমিত্র চাকমা পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন।
সোমবার ২৬ জানুয়ারী দুপুরে নিজের ফেসবুক পেইজে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে এ ঘোষণা দেন তিনি।
উল্লেখ্য, গতকাল রবিবার ২৫ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে একদল শিশুকে কান ধরে ওঠবস করানোর ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওতে দেখা গেছে, মাঠে ২৫–৩০ জনের মতো শিশু, কিশোর, তরুণ সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে কান ধরে ওঠবস করছে।
কেউ যেন ‘ফাঁকি দিতে না পারে’ সে জন্য লাঠি হাতে এক তরুণ কড়া নজরদারি রাখছেন। মাঝে মাঝে কারও কারও সামনে দাঁড়িয়ে বকাঝকা করছেন। ওই তরুণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) স দস্য সর্বমিত্র চাকমা। ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান।
ভাইরাল এই ভিডিওর ঘটনায় ব্যাপক সমালোচনা ও ক্ষোভের মুখে সর্বমিত্র চাকমা ডাকসু থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ঘটনাটি গত মাসের উল্লেখ করে তাঁর কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চাইলেও নিজের কাজের পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন একাধিকবার। ওই ভিডিওতে সর্বমিত্র চাকমার সঙ্গে ডাকসুর ক্রীড়া সম্পাদক আরমান হোসেনও উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সর্বমিত্র চাকমাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠিয়ে ২৪ ঘন্টার মধ্যে জবাব চেয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক সাইফুদ্দীন আহমদের সই করা চিঠিতে বলা হয়েছে, একজন ছাত্র ও ডাকসু সদস্যের এ ধরনের আচরণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি তথা মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়েছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা পরিপন্থী।
ডাকসু সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর সর্বমিত্র চাকমার এমন বির্তকিত আচরণ এই প্রথম নয়। শিশুদের কান ধরে ওঠবস করানোর আগে গত বছরের নভেম্বর মাসে প্রকাশিত আরেকটি ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে একজন প্রবীণ ব্যক্তিকে লাঠি হাতে শাসাচ্ছেন ও ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যেতে বলছেন সর্বমিত্র চাকমা।
ওই সময় সমালোচনার মুখে ফেসবুকে সর্বমিত্র চাকমা এই বলে যুক্তি দেন যে, ‘যে বৃদ্ধ লোকটিকে দেখছেন, আমি শুরুর দিন থেকে এই লোককে সেই মেট্রোস্টেশন থেকে তুলছি প্রতি রাতে। লোকটা ক্যাম্পাস ছেড়ে যায়-ই না, ওনার সাথে আরেকজন আরও বৃদ্ধ, উনিও মাদকাসক্ত। এই লোকের কাছে এর আগে একবার গাঁজা পাওয়া গেছিল। এই লোকগুলোকে তোলাটা অত্যন্ত কঠিন, তুললে আগায় ৪ কদম। তাই লাঠিসোঁটা ছাড়া বা ভয়-ভীতি প্রদর্শন না করে তাদের তোলা যায়–ই না।’
এবার খেলার মাঠে শিশুদের শাস্তি দেওয়ার পক্ষেও তিনি একাধিকবার পোস্ট দিয়ে সাফাই গেয়েছেন। খেলার মাঠে বহিরাগত শিশুরা এসে চুরি করে এমন একটি সিসিটিভি ফুটেজ দিয়েছেন। সেই সঙ্গে অভিযোগ করেছেন, বহিরাগত বখাটেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করে।
ফেসবুক পোস্টে গত বছরের ১৪ অক্টোবর কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে অনুশীলন করতে যাওয়া রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষার্থীর সাইকেল হারানোর ঘটনা তুলে ধরেন তিনি। সর্বমিত্র চাকমা আরও লেখেন, ‘এমন অনেক ঘটনা আছে অহরহ। প্রশাসনের কাছে আবেদন করলে দেয়াল সংস্কারের ফাইল ফিরে আসে, বলা হয় বাজেট নেই। এদিকে প্রতিদিন আমাদের শিক্ষার্থীরা মোবাইল হারায়, মানিব্যাগ হারায়, সাইকেল হারায়। বারবার মানা করার পরও আসে, স্টাফদের ওপর ঢিল ছুড়ে পালায় দেয়াল টপকিয়ে। এদিকে দেয়ালের বেহাল দশা। প্রশাসনের অসহযোগিতায় শিক্ষার্থীদের জন্য এর চাইতে আর কী করার আছে?’
সবশেষ আজ সোমবার পদত্যাগের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে সর্বমিত্র চাকমা লিখেছেন, আমার ভাবনা চিন্তায় স্রেফ (শুধু) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা। আমি বিভিন্ন জায়গায় হাত দিয়েছি, একা। চেষ্টা করেছি (সমস্যা) সমাধানের, নিজের দায়িত্বের বাইরে গিয়েও। কিন্তু, যত যা–ই হোক, আইন তো আইনই।
এ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আইনের ঊর্ধ্বেও যেতে হয়েছে পরিস্থিতি মোকাবিলায়-নিরাপত্তা বিধানে, যা আমার ব্যক্তিগত জীবন, মানসিক অবস্থা বিষিয়ে তুলেছে। আমার আর কন্টিনিউ (অব্যাহত) করার সক্ষমতা নেই। আমি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কারও প্রতি অভিমানবশত বা প্ররোচিত হয়ে এ সিদ্ধান্ত নিইনি। কাজ করা যেখানে কঠিন, অসম্ভব, সেখানে পদ ধরে রাখার কোনো মানে নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সাইফুদ্দীন আহমেদ বলেন, খেলার মাঠে চুরিসহ কিছু ঘটনা নিয়ে মৌখিক অভিযোগ এসেছে। সাধ্যের মধ্যে তা সমাধানের চেষ্টা করা হয়। এটাকে কারণ দেখিয়ে শিশুদের হেনস্তা করার কোনো যৌক্তিকতা থাকতে পারে না।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অবস্থান জানতে চাইলে প্রক্টর সাইফুদ্দীন আহমেদ বলেন, ২৪ ঘন্টার মধ্যে সর্বমিত্র চাকমাকে আত্মপক্ষ সমর্থন করে জবাব দিতে বলা হয়েছে।
তাঁর জবাব শোনার পর কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেবে।
তিনি বলেন, শিশুদের এভাবে কান ধরে ওঠবস করানো অনৈতিক ও অমানবিক কাজ হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এ ধরনের কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক–স্টাফদের সন্তানেরাও খেলতে যায়। কোনো আচরণ পছন্দ না হলে তাদের চলে যেতে বলতে পারতেন তিনি, কিন্তু এভাবে অপদস্থ করতে পারেন না।
এক প্রশ্নের জবাবে প্রক্টর সাইফুদ্দীন আহমেদ বলেন, খেলার মাঠে চুরিসহ কিছু ঘটনা নিয়ে মৌখিক অভিযোগ এসেছে। সাধ্যের মধ্যে তা সমাধানের চেষ্টা করা হয়। এটাকে কারণ দেখিয়ে শিশুদের হেনস্তা করার কোনো যৌক্তিকতা থাকতে পারে না।