।।বিকে ডেস্ক।।
দেশের নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতে (এনবিএফআই) শৃঙ্খলা ফেরাতে বড় সিদ্ধান্তের পথে হাঁটছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর অংশ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে সংকটে থাকা ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ বা অবসানের লক্ষ্যে আনুষ্ঠানিক শুনানি শুরু করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
গত বুধ ও বৃহস্পতিবার পৃথকভাবে ৬টির শুনানি গ্রহণ করা হয়। বাকি ৩টির শুনানি আগামীকাল রবিবার অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
প্রাথমিক মূল্যায়নে কার্যত এসব প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। শুনানি শেষে শিগগিরই প্রশাসক নিয়োগসহ প্রয়োজনীয় রেজোল্যুশন প্রক্রিয়া শুরু হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, কোনো প্রতিষ্ঠান বন্ধ করার আগে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার শেষ ধাপ হলো শুনানি।
জানা গেছে, এসব প্রতিষ্ঠান অকার্যকর ঘোষণার পরই ব্যক্তি আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেবে সরকার। তাদের টাকা ফেরত দিতে সরকার মৌখিকভাবে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার অনুমোদন দিয়েছে। এই টাকা দ্রুত ছাড়ের অনুরোধ করে শিগগিরই কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরকারের কাছে ডিও লেটার পাঠানো হবে। এদিকে প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীদের অর্থ অবসায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্নকালে সম্পদ বিক্রির মাধ্যমে পরিশোধ করা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
অবসায়নের প্রক্রিয়ায় থাকা ৯টি এনবিএফআই হলো- ফাস ফাইন্যান্স, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি), প্রিমিয়ার লিজিং, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, জিএসপি ফাইন্যান্স, প্রাইম ফাইন্যান্স, আভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং।
এর মধ্যে প্রথম চারটি আর্থিক খাতের বহুল আলোচিত প্রশান্ত কুমার (পিকে) হালদারের অনিয়মের কারণে রুগ্ন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। আর আভিভা ফাইন্যান্স ছিল বহুল আলোচিত এস আলমের প্রতিষ্ঠান।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এসব প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির ঘটনা ঘটে। এ কারণে এসব প্রতিষ্ঠান এখন গ্রাহকের টাকা ফেরত দিতে পারছে না। দীর্ঘদিন ধরেই এসব প্রতিষ্ঠান ধুঁকছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, গত বুধবার থেকে এই ৯টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পৃথকভাবে শুনানি শুরু করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রথম দিনে আভিভা ফাইন্যান্স, বিআইএফসি, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, ফাস ফাইন্যান্স ও জিএসপি ফাইন্যান্স অংশ নেয়। আর দ্বিতীয় দিনে শুধু প্রিমিয়ার লিজিংয়ের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। আর পিপলস লিজিং, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং ও প্রাইম ফাইন্যান্সের শুনানি আগামীকাল রবিবার অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। শুনানিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নিচ্ছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, শুনানিতে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা, খেলাপি ঋণের চিত্র, তারল্য পরিস্থিতি, মূলধন ঘাটতি, পরিচালনা পর্ষদের ভূমিকা এবং ভবিষ্যৎ পুনরুদ্ধারের বাস্তবসম্মত সম্ভাবনা যাচাই করা হয়। বিশেষ করে নতুন মূলধন জোগান ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব নয় বলে জানানো হয়। কোনো প্রতিষ্ঠানই দ্রুততম সময়ের মধ্যে মূলধন জোগান দিতে পারবে কিনা সেই পরিকল্পনাও জানতে চাওয়া হয়। অন্যদিকে শুনানিতে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সময় চেয়ে পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা উপস্থাপন করে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কেবল সময় চাওয়ার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হবে না। বাস্তবসম্মত ও বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানকে আর সুযোগ দেওয়া হবে না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, এই প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশই দীর্ঘদিন ধরে কার্যত অচল অবস্থায় রয়েছে। সময় দেওয়ার পরও আর্থিক অবস্থার কোনো উন্নতি ঘটাতে পারেনি। তাই আমরা আর কাগুজে প্রতিশ্রুতির ওপর নির্ভর করতে চাই না। আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় এগুলোকে অকার্যকর ঘোষণা করে প্রশাসক নিয়োগের সিদ্ধান্তের দিকে আমরা যাচ্ছি।
তিনি আরও বলেন, শুনানি শেষে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠাগুলোর মূল্যায়ন প্রতিবেদন চূড়ান্ত করা হবে। এর পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বোর্ডের অনুমোদন নিয়ে প্রশাসক নিয়োগসহ ধাপে ধাপে অবসানের প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, এসব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের হার অস্বাভাবিকভাবে বেশি। এর মধ্যে ৬টি প্রতিষ্ঠানে মোট ঋণের ৯০ থেকে ৯৯ শতাংশই খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। আর ৩টি খেলাপি ঋণ ৭০ থেকে ৯০ শতাংশের মধ্যে। এ ছাড়া প্রত্যেকটি মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে। আমানতের বিপরীতে নগদ অর্থ ও তরল সম্পদের ঘাটতি চরম আকার ধারণ করেছে। ফলে নিয়মিত আমানত ফেরত দেওয়া ও নতুন ঋণ কার্যক্রম পরিচালনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
গত ৩০ নভেম্বর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় সংকটাপন্ন এই ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অবসায়ন বা বন্ধের চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ। আমানতকারীর টাকা ফেরত দিতে না পারা, উচ্চ খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতি- এই তিন সূচকের ভিত্তিতে গত আগস্ট মাসে এসব প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করা হয়। এর আগে এই ৯টিসহ মোট ২০টি প্রতিষ্ঠানকে কেন বন্ধ করা হবে না এই মর্মে গত বছর মে মাসে কারণ দর্শানোর নোটিস দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে ১১টি প্রতিষ্ঠানের পুনরুদ্ধার বা ঘুরে দাঁড়ানোর কর্মপরিকল্পনা সন্তোষজনক হওয়ায় সেগুলো আপাতত বন্ধ না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর জানান, অবসায়নের পথে থাকা ৯টি রুগ্ন এনবিএফআইয়ের ব্যক্তিপর্যায়ের আমানতকারীরা আগামী ফেব্রুয়ারিতে রমজান শুরুর আগেই মূল টাকা ফেরত পাবেন। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ মূল্যায়নের কাজও শুরু করা হবে। মূল্যায়নের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ ইতিবাচক না নেতিবাচক। এর ভিত্তিতেই শেয়ারহোল্ডাররা কিছু পাবেন কিনা সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সংকলিত।