।।বিকে ডেস্ক।।
দীর্ঘ ছয় দশকের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়েপদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে সরকার। প্রাথমিক পর্যায়ে এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪ হাজার ৩৪৭ কোটি টাকা।
বুধবার ১৩ মে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ‘পদ্মা ব্যারাজ (প্রথম পর্যায়) নির্মাণ’ প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি-একনেক সভায় এই অনুমোদন দেয়া হয়।
জানা গেছে, নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে। এর আগে প্রায় ২৫ বছর আগে তৎকালীন বিএনপি সরকারও পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল।
প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার পদ্মা নদীর ওপর ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ মূল ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে। এতে থাকবে ৭৮টি স্পিলওয়ে, ১৮টি আন্ডার স্লুইস এবং দুটি ফিশ পাস।
এই ব্যারেজের মাধ্যমে প্রায় ২৯০ কোটি ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি সংরক্ষিত পানি বণ্টনের জন্য তিনটি অফটেক অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পের আওতায় ১১৩ মেগাওয়াট ক্ষমতার জলবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি জানিয়েছেন, এই ব্যারেজ নির্মিত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী হয়ে ওঠবে, বাড়বে কৃষিউৎপাদন। এর সুফল পাবে ২৬ জেলার প্রায় ৭ কোটি মানুষ।
পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীতে পানির ঘাটতি মোকাবিলা, নদীব্যবস্থার পুনরুজ্জীবন এবং দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সামগ্রিক পানি ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন নিশ্চিত করা। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, রাজবাড়ীর পাংশায় নির্মিতব্য ব্যারাজে প্রায় ২৯০ কোটি ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা হবে, যা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালী করবে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ফারাক্কা বাঁধের কারণে শুষ্ক মৌসুমে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে যে পানিসংকট তৈরি হয়, তা মোকাবিলায় দীর্ঘ গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর এই প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। সংরক্ষিত পানি ব্যবহার করে পাঁচটি নদীর পানিপ্রবাহ পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। নদীগুলো হলো হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী।
বহুমুখি এই প্রকল্পের আওতায় জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুমে ইছামতি-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতি নদী ব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রিত পানি প্রবাহ নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে গোদাগাড়ী পাম্প হাউস, গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল, পাবনা ও রাজশাহীসহ বিভিন্ন জেলার প্রায় ২৮ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত হবে।
পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের মাধ্যমে ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া ব্যারাজের ওপর সড়ক, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন এবং গ্যাস পাইপলাইন স্থাপনের মাধ্যমে এটিকে বহুমুখী করিডর হিসেবে ব্যবহার করা হবে। প্রকল্প প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, এর ফলে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ২৩ লাখ ৯০ হাজার টন ধান এবং ২ লাখ ৩৪ হাজার টন মাছ উৎপাদন সম্ভব হবে।
এই প্রকল্প বাস্তবায়নকালে প্রায় ১২ কোটি ২৫ লাখ কর্মদিবসের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, যেখানে প্রায় ৪৭ হাজার ৯৫০ জন শ্রমিক কাজের সুযোগ পাবেন। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৯ লাখ ২৭ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া ৩ হাজার ৪৫০ একর জমিতে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার পরিবারের জন্য সাতটি উপগ্রহ শহর ও আধুনিক গ্রামীণ টাউনশিপ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পটি থেকে বছরে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া যেতে পারে এবং দেশের মোট দেশজ উৎপাদন বৃদ্ধিতে প্রায় শূন্য দশমিক ৪৫ শতাংশ অবদান রাখতে পারে। একই সঙ্গে সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট অঞ্চলে লবণাক্ততার আগ্রাসন কমিয়ে সুন্দরবন ও উপকূলীয় অঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য পুনরুদ্ধারে সহায়তা করবে।

মূলত ভারতের ফারাক্কা ব্যারেজ নির্মাণ করে উজানে পানি প্রবাহের পরিপ্রেক্ষিতেই পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণের কথা ভাবা হয়। ফারাক্কার কারণে বাংলাদেশে পদ্মার প্রবাহ মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। এতে করে দেশের কৃষি, মৎস্য, বনায়ন, নৌচলাচল, পানির প্রাপ্যতা এবং বাস্তুতন্ত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। স্বাদু পানির প্রবাহ হ্রাসের কারণে ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন এবং এর জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে সুন্দরবনের আশেপাশের নদী এবং খালগুলোতে লবণাক্ততার উচ্চ ঘনত্বের কারণে গুরুতর হমকির সম্মুখীন হয়েছে। পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতী ও চন্দনা-বারাশিয়া নদী ব্যবস্থায় ব্যাপক পলি জমে নদীগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।
শুষ্ক মৌসুমে অধিকাংশ পানি সরাসরি বঙ্গোপসাগরে চলে যাওয়ায় অভ্যন্তরীণ নদীগুলো পানিশূন্য হয়ে পড়াসহ বিভিন্ন ঘটনা ঘটছে। এদিকে বাংলাদেশের স্বপ্নপূরণের যাত্রায় এগিয়ে নিয়ে যাওয়া প্রকল্প বাস্তবায়নের নতুন আলোর মিলছে। দীর্ঘ ছয় দশকের বেশি সময় ধরে বহুল আলোচিত পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
পানি বন্টনে ভারত সমতা বজায় না রাখায় গঙ্গার পানির ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠায় বাঁধ নির্মাণই বাংলাদেশের জন্য একমাত্র পথ। সরকারের উচিত অগ্রাধিকার দিয়ে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা। শুকনো মৌসুমে গঙ্গার পানি ব্যবহারে এই বাঁধের কোনো বিকল্প নেই। ভারত শুরু থেকেই বাঁধ নির্মাণ করে শুকনো মৌসুমে গঙ্গার পানির সুষ্ঠু ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনার কথা বলে আসছে। চুক্তির এই মেয়াদ শেষে ভারত নিশ্চয়ই আবার গঙ্গার পানির সুষ্ঠু ব্যবহারের প্রশ্ন তুলবে। তখন বাংলাদেশের কোনো যৌক্তিক অবস্থান নেয়ার থাকবে না। গঙ্গা-নির্ভর এলাকা প্রায় ৫১ লাখ ৮৮ হাজার হেক্টর, ২৬টি জেলাজুড়ে বিস্তৃত এলাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে প্রায় ১৯ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত হবে। এ অঞ্চলে কৃষি উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। বাংলাদেশে গড়াইসহ পদ্মার উভয় তীরের শাখা নদীগুলোতে শুকনো মৌসুমে পানির প্রবাহ বাড়াতে হলে বাঁধ নির্মাণ অপরিহার্য।
প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বিগত সরকারের সময়ে বিভিন্ন কারণে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা ও দ্বিধা তৈরি হয়। প্রকল্পটির মাধ্যমে, শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ বৃদ্ধি পেলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ ও কিছু ক্ষেত্রে পুনরুদ্ধার হবে। নদীতে নাব্য হ্রাস ও পলি জমার সমস্যা কমানো যেতে পারে। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রায় সাত-অটাটি নদীতে পানির সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। তাই জরুরিভাবে প্রকল্প অনুমোদন প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এটি শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়; বরং দেশের পানি নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা এবং পরিবেশবান্ধব টেকসই উন্নয়নের অন্যতম কেন্দ্রীয় সমাধান হতে পারে।