।।বিকে স্পোর্টস।।
বিশ্বকাপের শেষ কোয়ার্টার-ফাইনালে ক্যানসাস সিটিতে সুইজারল্যান্ডকে ৩-১ গোলে হারাল আর্জেন্টিনা।
ব্যবধানটা শেষ পর্যন্ত দুই গোলের হলেও লড়াই ছিল হাড্ডাহাড্ডি। ম্যাচের বেশির ভাগ সময় একদমই ম্রিয়মান ছিল লিওনেল মেসির দল। একজন কম নিয়েও তাদের ঘাম ছুটিয়ে দেয় সুইসরা। একটুর জন্য ম্যাচটি নিতে পারেনি তারা টাইব্রেকারে।
১০ জনের দল নিয়েও অনেকটা সময় চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞায় আর্জেন্টিনাকে আটকে রাখল সুইজারল্যান্ড।
কিন্তু অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধে হুলিয়ান আলভেরেসের জাদুকরি একটি মুহূর্ত গড়ে দিল ব্যবধান। তার চোখধাঁধানো গোলে স্বস্তি ফেরার পর শেষ সময়ে দলকে উল্লাসে ভাসাল লাউতারো মার্তিনেসের গোলে। শঙ্কা পথ মাড়িয়ে সেমি-ফাইনালের ঠিকানায় পৌঁছে গেল বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা।
ক্যানস্যাস সিটি স্টেডিয়ামে ম্যাচের শুরুটা ছিল নিস্তরঙ্গ। প্রথম কয়েক মিনিটে তেমন কিছু হয়নি। নবম মিনিটে ও দশম মিনিটে পরপর দুটি কর্নার পায় আর্জেন্টিনা। মেসির নেওয়া প্রথম কর্নারটি সুইজারল্যান্ডের একজনের মাথায় হালকা ছুঁয়ে বাইরে চলে যায়। অন্য প্রান্ত থেকে আবার মেসির নিখুঁত কর্নারে অনেকটা লাফিয়ে দারুণ হেডে বল জালে জড়ান মাক আলিস্তের।
ম্যাচের দশম মিনিটেই আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দেন আলিক্সেস মাক আলিস্তের। দ্বিতীয়ার্ধে দারুণ ফুটবলের প্রদর্শনীতে দান এনদোয়ের গোলে সমতায় ফেরে সুইসরা। কিন্তু ইচ্ছা করে ডাইভ দেওয়ায় ৭২তম মিনিটে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন দারুণ খেলতে থাকা বাগাইল এমবোলো। খেলার মোড় ঘুরে যায় সেখানেই।
সুইসরা এরপর মনোযোগ দেয় রক্ষণে। নির্ধারিত সময় ও যোগ করা সময় মিলিয়ে পরের ২৮ মিনিট তারা পার করে দেয় নিরাপদে।
৩২তম মিনিটে খানিকটা সম্ভাবনা জাগায় ৭২ বছর পর কোয়ার্টার-ফাইনালে ওঠা দলটি। বাম পাশ থেকে দারুণ একটি থ্রু বল বাড়ান দান এনদোয়ে। লিসান্দ্রো মার্তিনেসকে এগিয়ে বল নিয়ে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেন বাগাইল এমবোলো। বিপদ বুঝে দ্রুত এগিয়ে এসে দারুণ চ্যালেঞ্জে দলকে উদ্ধার করেন গোলকিপার এমি মার্তিনেস।
৪৩তম মিনিটে বাম প্রান্তে বক্সের সামান্য বাইরে বিপজ্জনক জায়গায় ফ্রি কিক পায় সুইজারল্যান্ড। কিন্তু বেশ বাইরে উড়িয়ে মেরে সুযোগটি হারান রেমো ফ্রয়লা।
প্রথমার্ধে ৫৮ শতাংস সময় বল ছিল সুইসদের নিয়ন্ত্রণে।
আর্জেন্টিনার খেলায় সৃষ্টিশীলত ও ধার চোখে পড়েনি তেমন। অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধেও ছিল ম্যাচে সমতা। কিন্তু ১১২তম মিনিটে সুইস দেয়ালে ফাটল ধরান আলভারেস। ১২১তম মিনিটে পাল্টা আক্রমণে ব্যবধান বাড়ান মার্তিনেস।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে খেলা কিছুটা উন্মুক্ত হয়ে ওঠে। আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ দেখা যায়। ৪৯তম মিনিটে ফাবিয়ান রিয়েদেরের ফ্রি কিক সরাসরি হাতে জমান এমি মার্তিনেস। পরের মিনিটে মেসির দারুণ পাস থেকে নাউয়েল মলিনার দূরপাল্লার কোনাকুনি শট বাইরে দিয়ে চলে যায়।
এরপর মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিয়ে টানা একটির পর একটি আক্রমণ করতে থাকে সুইসরা। থ্রু বল ধরে এমবোলো বক্সে ঢুকে পাস দেন এনদোয়েকে। তার শট দারুণভাবে ব্লক করে দেন লিসান্দ্রো মার্তিনেস। গোল হলেও অবশ্য লাভ হতো না, অফসাইডের সঙ্কেত দেন রেফারি। ৬০তম মিনিটে এমবোলোর হেড ডানদিকে ঝাঁপিয়ে আটকে দেন এমি মার্তিনেস। খুব বেশি জোর ছিল না সেই হেডে।
৬৫তম মিনিটে এমবোলোর হেড বাঁদিকে ঝাপিয়ে রক্ষা করেন এমি মার্তিনেস। পরের মিনিটেই বক্সের বেশ বাইরে থেকে গ্রানিত জাকার জোরাল শট আবার ডাইভ দিয়ে ঠেকান আর্জেন্টাইন গোলকিপার।
এর দুই মিনিট পরই সমতায় ফেরে তারা। রিকার্দো রদ্রিগেসের সঙ্গে দারুণভাবে ওয়ান-টু খেলে চমৎকার ফিনিশিংয়ে এমি মার্তিনেসের প্রসারিত পায়ের নিচ দিয়ে বল জালে পাঠান এনদোয়ে।
একটু পরই সেই নাটকীয় লাল কার্ড। ফাউলের জন্য শুরুতে পারেদেসকে হলুদ কার্ড দেখান রেফারি। তবে পরে ভিএআর রেফারির হস্তক্ষেপের পর মাঠের পাশের স্ক্রিনে রিপ্লে দেখে রেফারি সিদ্ধান্তে পৌঁছান, ইচ্ছে করেই ডাইভ দিয়েছেন এমবোলো। দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখানো হয় ২৯ বছর বয়সী ফরোয়ার্ডকে। শুরুতে তীব্র প্রতিবাদ জানান তিনি, পরে মাঠ ছাড়েন কান্নায় ভেঙে পড়ে।
নির্ধারিত সময় শেষের একটু আগে দুই দলই তিনটি করে পরিবর্তন আনে। বদলি নামা নিকো হন্সালেস ৮৯তম মিনিটে দারুণভাবে সীমানা থেকে বল রাখেন গোলমুখে, কিন্তু মাক আলিস্তেরের হেড একটু বাইরে দিয়ে চলে যায়। যোগ করা সময়ে বক্সের বাইরে থেকে মেসির শট চলে যায় বাইরে দিয়ে।
যোগ করা সময়ের ৯ মিনিটের শেষ দিকে লিসান্দ্রো মার্তিনেসের অ্যাক্রোবেটিক শট ফুল লেংথ ডাইভ দিয়ে ঠেকিয়ে দেন সুইস গোলকিপার গ্রেগর কোবে।
অতিরিক্ত সময়ে থিয়াগো আলমাদা নামার পর আর্জেন্টিনার আক্রমণে ধার বাড়ে একটু। ৯৩তম মিনিটে আলভারেসের সঙ্গে ওয়ান-টু খেলে ভেতরে ঢুকে শট নেন তিনি। সরাসরি বল যায় সুইস গোলকিপারের কাছে। একটু পর আলমাদারই জোরাল শট সাইড নেটে লাগে।
অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধে বক্সের বাইরে বল পেয়ে বাদিঁক থেকে কাট ব্যাক করে একটু জায়গা বানিয়ে দুর্দান্ত বাঁকানো শটে গোল করেন আলভারেস। শরীর শূন্যে ভাসিয়েও নাগাল পাননি গোলকিপার কোবে।
এরপর ১০ জনের দল নিয়েও আক্রমণে ওঠা ছাড়া উপায় ছিল না সুইসদের। কিছুটা সম্ভাবনা তারা জাগায় বটে। তবে ১০ জনের দল নিয়ে গোল করার শক্তি ও ধার তাদের ছিল না। উল্টো পাল্টা আক্রমণে উঠে শট নেন আলমাদা। সুইস গোলকিপার তা ফেরালেও ফিরতি বলে বল জালে পাঠান মার্তিনেস।
গ্যালারির ৯০ শতাংশের বেশি দর্শক সমর্থন ছিল আর্জেন্টিনারই। ম্যাচ শেষে দর্শকদের সঙ্গেই নেচেগেয়ে উদযাপন করলেন ফুটবলাররা।
সেমি-ফাইনালে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড। অন্য সেমি-ফাইনালে লড়বে ফ্রান্স ও স্পেন। বিশ্বকাপের সূচি প্রকাশের সময় এই চার দলই ছিল শীর্ষ চারে। ১৯৯২ সালে র্যাঙ্কিং আনুষ্ঠানিকভঅবে চালুর পর এই প্রথম র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ চার দল জায়গা করে নিল বিশ্বকাপের শেষ চারে।