।।বিকে আন্তর্জাতিক ডেস্ক।।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে আবারও কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, আগামী সপ্তাহের মধ্যে তেহরান আলোচনার টেবিলে না ফিরলে দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুগুলোতে হামলা চালানো হবে।
একই সময়ে টানা চতুর্থ দিনের মতো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত থাকায় মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, আগামী সপ্তাহে তাদের জন্য পরিস্থিতি খুব খারাপ হবে। তারা যদি আলোচনায় না আসে, তাহলে আমরা তাদের সব বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সব সেতু ধ্বংস করে দেব।
তিনি আরও জানান, জ্বালানি অবকাঠামোতেও শেষ পর্যন্ত হামলা চালানো হতে পারে।
ট্রাম্পের এই বক্তব্য নতুন নয়। চলতি বছরের এপ্রিলেও তিনি ইরানের বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলার হুমকি দিয়েছিলেন। সে সময় জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ভলকার টুর্ক সতর্ক করে বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক মানুষ ও তাদের প্রয়োজনীয় অবকাঠামোতে হামলা যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। ১৯৪৯ সালের জেনেভা কনভেনশনেও বেসামরিক জনগণের জন্য অপরিহার্য স্থাপনায় হামলা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেন, মঙ্গলবার রাতে মার্কিন আলোচকরা ইরানকে বার্তা দিয়েছেন, চুক্তি করো, নইলে কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।
এদিকে এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ইসলামাবাদ সমঝোতা চুক্তি থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে ইরান।
মঙ্গলবার ১৪ জুলাই দেশটির উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি দেশটির আধা সরকারি সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
এক সাক্ষাৎকারে তাসনিম নিউজকে ঘারিবাবাদি বলেছেন, গত এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে মার্কিন বাহিনীর হামলার জবাব দিতে এবং হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের ‘আসন্ন আগ্রাসন’ প্রতিহত করতে এই পদক্ষেপ নিয়েছে তেহরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রী সরকার।
হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের সার্বভৌম অধিকার ইরান যে কোনো মূল্যে রক্ষা করবে। এর সঙ্গে ইরানের জাতীয় নিরাপত্তার ব্যাপারটি সরাসরি জড়িত। আমরা আর কোনো ইস্যুতে কখনও যুক্তরাষ্ট্রকে সঙ্গে আলোচনার জন্য অনুরোধ করব না।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর হামলা চালাতে ব্যবহৃত ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করতে নতুন করে হামলা শুরু করেছে মার্কিন বাহিনী।
সেন্টকমের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের দাবি, ইরান ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। তার মতে, এ পর্যন্ত সাতটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনায় প্রায় এক ডজন নাবিক নিহত, নিখোঁজ বা আহত হয়েছেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, সোমবার রাতে ইরানের ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দেশটির দুটি তেলবাহী ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে একজন ভারতীয় নাবিক নিহত এবং আরও আটজন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে চারজনের অবস্থা গুরুতর।
পরে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) টেলিগ্রামে দেওয়া এক বিবৃতিতে হামলার দায় স্বীকার করে দাবি করে, দুটি ট্যাংকার সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে নেভিগেশন ব্যবস্থা বন্ধ রেখে মাইন পাতা একটি পথ দিয়ে অতিক্রমের চেষ্টা করেছিল।
বুধবার ভোরে কুয়েতের সেনাবাহিনী জানায়, তারা ইরানের ছোড়া ড্রোন প্রতিহত করছে। একই সময়ে বাহরাইনজুড়ে বিমান হামলার সতর্ক সংকেত বাজানো হয় এবং বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
ইরান এর আগে জানিয়েছিল, বাহরাইন ও জর্ডানে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুটি ট্যাংকারেও আঘাত হানার কথা স্বীকার করেছে তেহরান।
হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে দুই দেশের বিরোধ এখন নতুন মাত্রা পেয়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুললেও ওয়াশিংটনের দাবি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিরাপদ রাখতে তাদের উপস্থিতি প্রয়োজন।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের শুরু এবং টানা ৪০ দিন তা অব্যাহত থাকার পর ৭ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে তেহরান এবং ওয়াশিংটন। তার দু’মাসেরও বেশি সময় পর ১৭ জুন পাকিস্তানের মধ্যস্থতার ভিত্তিতে ইসলামাবাদ সমঝোতা চুক্তি (ইসলামাবাদ এমওইউ) স্বাক্ষর করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান।
১৪টি শর্ত সম্বলিত সংক্ষিপ্ত সেই চুক্তিটির একটি শর্ত ছিল— আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজগুলো লক্ষ্য করে হামলা বন্ধ করবে ইরান এবং তার পরিবর্তে দেশটির তেলের ওপর জারি করা রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা এবং বন্দরগুলো থেকে অবরোধ তুলে নেবে যুক্তরাষ্ট্র।
গত ৫ জুলাই চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে হরমুজে আমিরাতের দুই ট্যাংকার জাহাজে ড্রোন হামলা করে ইরানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর অভিজাত শাখা আইআরজিসি। সেই হামলার জবাব দিতে ৭ জুলাই থেকে ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনাল লক্ষ্য করে টানা বোমা বর্ষণ শুরু করে মার্কিন প্রতিরক্ষা বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড সেন্টকম।
এই নতুন দফার সংঘাতের মধ্যেই গত ১৩ জুলাই সোমবার ইরানের বন্দরগুলোতে পুনরায় অবরোধ জারির নির্দেশ দেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
সেই সঙ্গে এই দিন নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প ঘোষণা দেন, এখন থেকে ‘অভিভাবক’ হিসেবে হরমুজ প্রণালি এবং এই জলপথে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে নিরাপত্তা দেবে যুক্তরাষ্ট্র এবং এই বাবদ প্রণালিতে চলাচলকারী সব বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে ২০ শতাংশ হারে টোল প্রদান করতে হবে।
ট্রাম্প এই ঘোষণা দেওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ইসলামাবাদ এমওইউ থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দিলো ইরান।
এদিকে সেন্টকমের মুখপাত্র অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার এক বার্তায় বলেছেন, বন্দরগুলোতে মার্কিন অবরোধ পুনরায় জারির পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিবেশী উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা করছে ইরান।
সূত্র : এএফপি