।।বিকে রিপোর্ট।।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংশ্লিষ্ট দেশে বসেই ভোটাধিকার প্রয়োগের ব্যবস্থা নির্ধারণে অংশীজনদের মতামত নিতে আগামী সপ্তাহে রাজনৈতিক দলসহ সব অংশীজনের সঙ্গে সংলাপে বসতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
বুধবার ২৩ এপ্রিল এ লক্ষ্যে বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ও মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (এমআইএসটি) দাখিল করা তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন নিয়ে বৈঠকে বসতে যাচ্ছে কমিশন।
জানা গেছে, প্রবাসীদের ভোট দেওয়ার জন্য সম্ভাব্য তিনটি পদ্ধতি— পোস্টাল ব্যালট, অনলাইন ভোটিং ও প্রক্সি ভোটিং নিয়ে বিশদ পর্যালোচনা করছে ইসি। গত ৮ এপ্রিল কারিগরি বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়ার পর এবার মাঠ পর্যায়ের অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এরই মধ্যে ইসি সচিবালয় অংশীজনদের তালিকা প্রস্তুত করেছে। এতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, নির্বাচন সংস্কার কমিশনের সদস্য, গণমাধ্যমকর্মী এবং নির্বাচন সংশ্লিষ্ট প্রায় ৪০০ ব্যক্তিকে আমন্ত্রণ জানানোর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ, এম, এম, নাসির উদ্দীন নেতৃত্বাধীন পুরো কমিশন এই মতবিনিময় সভায় উপস্থিত থাকবেন।
নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানিয়েছেন, চূড়ান্ত পদ্ধতি নির্ধারণে একটি ‘অ্যাডভাইজরি টিম’ গঠন করা হয়েছে। এই টিম তিনটি পদ্ধতির সুবিধা, অসুবিধা ও দুর্বলতা পর্যালোচনা করে একটি সুপারিশমালা তৈরি করবে। এরপরই অংশীজনদের মতামত নেওয়া হবে।
এদিকে, ভোট পদ্ধতির সম্ভাব্যতা যাচাই, উন্নয়ন এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইসি সচিবালয় এই অ্যাডভাইজরি টিম গঠন করেছে। সচিবালয়ের সচিব আখতার আহমেদ জানান, বুয়েটের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের অধ্যাপক ড. মনিরুল ইসলামকে প্রধান করে গঠিত ১২ সদস্যের বিশেষজ্ঞ দলের ২০ এপ্রিলের মধ্যেই তাদের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা ছিল।
প্রতিবেদনে পোস্টাল ব্যালট, অনলাইন ভোটিং ও প্রক্সি ভোটিংয়ের মাধ্যমে প্রবাসীদের ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে কী ধরনের সমস্যা হতে পারে এবং বিদ্যমান সীমাবদ্ধতাগুলো কী, তা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। একাধিক বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন, কোনো একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিকে এখনই উপযুক্ত বলে মতামত দেওয়া হয়নি।
বুয়েটের অধ্যাপক ড. মনিরুল ইসলাম বলেন, আমরা প্রাথমিক প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। শিগগিরই আরেকটি বিস্তারিত প্রতিবেদন দেওয়া হবে। তিনটি প্রতিষ্ঠান আলাদাভাবে তাদের মতামত দিয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, তাদের প্রতিবেদনে তিনটি পদ্ধতির সুবিধা-অসুবিধা এবং সীমাবদ্ধতাগুলো স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব কে এম আলী নেওয়াজ সোমবার জানান, এমআইএসটিসহ তিনটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন হাতে পেয়েছে কমিশন। এসব প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ইসির অতিরিক্ত সচিব কেএম আলী নেওয়াজ এ বিষয়ে বাংলানিউজকে বলেন, আমাদের গঠিত তিনটি কমিটি তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। এগুলোর ওপর এখন অংশীজনের মতামত নেওয়া হবে। তারপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে কমিশন।
নির্বাচন কমিশন প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়, জনশক্তি ব্যুরো, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রটিং এজেন্সি-বায়রাসহ বিভিন্ন সংস্থার কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে দেখেছে, ৪০টি দেশে বাংলাদেশি প্রবাসীদের আধিক্য রয়েছে। এসব দেশকেই মাথায় রেখে কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। দেশগুলো হলো- সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ওমান, কাতার, বাহরাইন, লেবানন, জর্ডান, লিবিয়া, সুদান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাজ্য, ইতালি, হংকং, মিশর, ব্রুনাই, মরিশাস, ইরাক, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, গ্রিস, স্পেন, জার্মানি, দক্ষিণ আফ্রিকা, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ড, বেলজিয়াম, সুইজারল্যান্ড, ব্রাজিল, চীন, ইন্দোনেশিয়া, মালদ্বীপ, নিউজিল্যান্ড, রাশিয়া, তুরস্ক ও সাইপ্রাস। এসব দেশে এক কোটি ৪০ লাখ ৪৬ হাজার ৫৩৪ জন প্রবাসী রয়েছেন। এদের মধ্যে সবচেয়ে রয়েছে বেশি প্রবাসী রয়েছেন সৌদি আরবে ৪০ লাখ ৪৯ হাজার ৫৮৮ জন।
তবে সব দেশের প্রবাসীদের এখনই ভোট দেওয়ার ব্যবস্থায় আনতে চায় না কমিশন। তাদের যুক্তি, পরীক্ষামূলকভাবে তিনটি দেশে তিনটি পদ্ধতিতে বা মিশ্র পদ্ধতি ভোট নেওয়া হবে। এরপর বড় আকারে ভোটের ব্যবস্থা করবে সংস্থাটি।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, আমরা যে পদ্ধতিই অনুসরণ করি না কেন, তা বাংলাদেশের প্রবাসীদের বিস্তৃতসহ অন্যান্য বিষয় বিবেচনা সাপেক্ষে করতে হবে। যে পদ্ধতিতেই করি না কেন, প্রবাসীকে প্রথমে অনলাইনে নিবন্ধন করতে হবে। বাংলাদেশের জন্য কোনো একটা পদ্ধতি নয়, বরং মিশ্র পদ্ধতি করতে হবে। কেননা, একেক এদেশের পরিস্থিতি একেক রকম। সব পদ্ধতির সফলতা ও দুর্বলতা আছে। সব পদ্ধতির জন্য মক টেস্টিং প্রয়োজন হবে। সম্ভবত সব পদ্ধতির জন্যই পরীক্ষামূলকভাবে সীমিত পরিসরে করতে হবে। এটা অনেক দেশ করছে।
ইসির এনআইডি উইংয়ের পরিচালক (নিবন্ধন ও প্রবাসী শাখা) মো. আব্দুল মমিন সরকার জানিয়েছেন, বুধবারের কমিশন সভায় প্রতিবেদনগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হতে পারে। এরপরই অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময়সূচি চূড়ান্ত করা হবে। ধারণা করা হচ্ছে, ২৮ ও ২৯ এপ্রিল এই সংলাপ অনুষ্ঠিত হতে পারে।
তিনি আরও জানান, মঙ্গলবারের কমিশন বৈঠকে অনুমোদন পেলে দ্রুতই সংশ্লিষ্টদের আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হবে। আমন্ত্রিতদের মধ্যে নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত প্রায় অর্ধশত রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, নির্বাচন ব্যবস্থা ও স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের প্রধান, গণমাধ্যম প্রতিনিধি, পররাষ্ট্র ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধি ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা থাকবেন।