।।বিকে ডেস্ক।।
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করেছে সরকার ও বিরোধী দল; চরম বিতর্ক হয়েছে জাতীয় সংসদে।
মঙ্গলবার ৯ জুন সংসদে জামায়াতে ইসলামী ব্যাংকটিকে পুনর্দখলের চেষ্টার অভিযোগ তুললে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, ব্যাংকটিকে ‘অস্থিতিশীল করে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা চলছে’।
ইসলামী ব্যাংক নিয়ে বিরোধী দলের তরফে তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি উঠলেও তা আমলে নেয়নি সংসদ।
উল্লেখ্য দিন কয়েক ধরে শরিয়াহভিত্তিক এ ব্যাংক থেকে গ্রাহকদের বড় অঙ্কের আমানত তুলে নেওয়ার খবরের প্রেক্ষাপটে সংসদে বির্তকের শেষে সমাপনীতে অর্থমন্ত্রী বলেন, চেয়ারম্যানের কারণে গ্রাহক টাকা তুলে নেয়, এর কোনো নজির নেই।
এদিন সরকারি ও বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যদের মধ্যে গত দুই বছরে কয়েক দফায় পর্ষদ, চেয়ারম্যান ও এমডি বদলকে কেন্দ্র করে আলোচনায় থাকা এ ব্যাংক নিয়ে বিতর্ক শুরু হয় বিরোধীদলীয় নেতা জামায়াতের ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের আনা ৬৮ বিধির নোটিসের মাধ্যমে।
এতে তিনি ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার ‘প্রকৃত মালিকদের’ কাছে ফিরিয়ে দেওয়া এবং ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনায় ‘অনভিপ্রেত হস্তক্ষেপ’ বন্ধের দাবি তোলেন।
কার্যপ্রণালী বিধির ৬৮ অনুযায়ী জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনার জন্য সংসদে নোটিস দেওয়া যায়। এটি গ্রহণ হলে স্পিকার আলোচনার সময় ঠিক করে দেন। এদিন এ নোটিস গ্রহণের পর শুরু হয় ইসলামী ব্যাংক নিয়ে আলোচনা।
কোরবানি ঈদের আগে ২৪ মে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান জোবায়দুর রহমান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক খান পদত্যাগ করেন। সেদিনই নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমকে বেছে নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ঈদের পর এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে ব্যাংকটির কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন একদল ব্যক্তি।
‘গ্রাহক ফোরাম’ নামেরে ব্যানারে তারা কয়েকদিন বিক্ষোভ করে। আন্দোলনকারীদের হটিয়ে দিতে একদিন পুলিশ বলপ্রয়োগও করে। তখন জামায়াতের তরফে এর নিন্দা এবং ব্যাংকে হস্তক্ষেপের প্রতিবাদ করা হয়।
এরপর গত কয়েকদিনে ব্যাংকটি থেকে গ্রাহকরা তিন হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়েছে বলে খবর আসে। এমন প্রেক্ষাপটে মঙ্গলবার সংবাদমাধ্যমে আসে ইসলামী ব্যাংক তারল্য সংকট মেটাতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ১০ হাজার কোটি টাকা চেয়েছে।
এসব খবরের মধ্যে এদিন সংসদে নোটিস দেন বিরোধীদলীয় নেতা। এতে বলা হয়, ইসলামী ব্যাংক দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি ব্যাংক এবং দেশের মোট রেমিট্যান্সের একটি বড় অংশ এ ব্যাংকের মাধ্যমে আসে। আওয়ামী লীগ সরকার ‘নজিরবিহীন উপায়ে’ ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ‘ব্যাপক অনিয়ম ও লুটপাটের’ সুযোগ করে দেয়।
নোটিসে অভিযোগ করা হয়, চব্বিশের আন্দোলনে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যাংকটি ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল; কিন্তু সম্প্রতি পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন এনে আবারও ব্যাংকটিকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চলছে।
জামায়াতের পক্ষে বক্তব্য
নোটিসের ওপর বক্তব্যে সংরক্ষিত নারী আসনে জামায়াতের এমপি নূরন্নেসা সিদ্দিকা বলেন, ইসলামী ব্যাংক ধ্বংস করে দেশের অর্থব্যবস্থাকে ধ্বংস করার নীলনকশা করা হয়েছিল।
সংরক্ষিত নারী আসনে জামায়াতের আরেক এমপি মারদিয়া মমতাজ বলেন, নতুন চেয়ারম্যান দেওয়ার পর গ্রাহকদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।
“সাত দিনে ৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে এবং ব্যাংকটি তারল্য সংকটে পড়েছে।”
ঢাকা-১২ আসনে জামায়াতের এমপি সাইফুল আলম ব্যাংক খাতের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, আর্থিক খাত নানা ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
ইসলামী ব্যাংক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ব্যাংকটি অতীতে বড় ধাক্কা খেয়েছে এবং এখনো নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে।
বিরোধী দলীয় উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, “আজকে দুই পক্ষের বক্তব্যে যথেষ্ট গ্যাপ ডিফারেন্স পাওয়া যাচ্ছে। নানা ধরনের অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ এবং হুমকির কথাও আমরা শুনেছি।”
ইসলামী ব্যাংকের পুরো বিষয়টি সংসদীয়ভাবে তদন্তের প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, ব্যাংকটির প্রতিষ্ঠাকাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত ঘটনাপ্রবাহ, মালিকানা পরিবর্তন, ঋণ বিতরণ, ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে একটি সংসদীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা যেতে পারে।
“এই কমিটি সবকিছু পর্যালোচনা করে সংসদে রিপোর্ট দেবে। এরপর প্রয়োজন হলে সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক বা সংসদ একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।”
তিনি বলেন, একজন চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে এত বড় সংকট তৈরি হওয়ার প্রশ্নে সংসদের বাইরে নানা আলোচনা রয়েছে, যা তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
শফিকুরের অভিযোগ
বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পেছনে প্রায়ত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভূমিকা ছিল এবং দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাংকটি দক্ষতা ও সততার সঙ্গে পরিচালিত হয়েছে।
তার অভিযোগ, এস আলম গ্রুপের মাধ্যমে ব্যাংকটি দখল করা হয়েছিল এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান নিয়োগের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “যে ব্যক্তিকে বসানো হয়েছে, তার অতীত নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন আছে।”
তার দাবি, গ্রাহকদের আস্থা নষ্ট হলে শুধু ইসলামী ব্যাংক নয়, পুরো ব্যাংকিং খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
“ইসলামী ব্যাংক যদি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, বাংলাদেশের অর্থনীতি মাটির সঙ্গে মিশে যাবে।”
কী বললেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
এ বিতর্কে অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে ধর্মীয় আবেগ তৈরির চেষ্টা হচ্ছে।
“ইসলামী ব্যাংক ইসলাম নয়। মির্জা ফখরুল ইসলামও ইসলাম নয়, জামায়াতে ইসলামীও ইসলাম নয়। সুতরাং সবকিছুতে ইসলামের উপর হাত দেওয়া হয়েছে বলে প্রচার করা ঠিক নয়।”
তার দাবি, ইসলামী ব্যাংক নিয়ে চলমান আন্দোলনের পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। যারা পর্দার আড়াল থেকে গ্রাহকদের নাম ব্যবহার করছে, তারা এখন সামনে চলে এসেছে।
তিনি ইসলামী ব্যাংকের আরডিএস প্রকল্প, ঋণ বিতরণ, নিয়োগ, পদোন্নতি এবং করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিলের ব্যবহার নিয়ে তদন্তের দাবি জানান।
সালাহউদ্দিন বলেন, “এস আলমের অর্থপাচার যেমন তদন্ত হবে, তেমনি ৫ অগাস্টের পর ইসলামী ব্যাংকে যা হয়েছে, তারও তদন্ত হবে।”
অর্থমন্ত্রীর জবাব
সমাপনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু বলেন, ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে, তার ‘বাস্তব ভিত্তি নেই’।
তিনি বলেন, “একজন চেয়ারম্যানের মনোনয়নের কারণে কোনো ব্যাংকের গ্রাহক টাকা তুলে নিয়ে যাবে, এরকম নজির পৃথিবীর কোথাও নেই। গ্রাহক দেখে তার টাকা নিরাপদ কি না, সে টাকা ফেরত পাবে কি না। চেয়ারম্যান কে, সেটা তার বিবেচনার বিষয় না।”
তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংক থেকে টাকা বের হওয়ার সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী জড়িত নয় বলে বিরোধীদলীয় নেতা যে চ্যালেঞ্জ দিয়েছেন, একই দাবি সালমান এফ রহমান বা এস আলমও করতে পারেন।
“কারণ তারা তো নিজের নামে কেউ টাকা নেয়নি।”
তার ভাষ্য, বিগত নির্বাচনে বিভিন্ন আসনে ‘অবিশ্বাস্য রকমের টাকা’ খরচ হতে দেখা গেছে। এমন প্রার্থীরাও বিপুল অর্থ ব্যয় করেছেন, যাদের দৃশ্যমান আয়ের উৎস নিয়ে প্রশ্ন আছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, এ ধরনের ‘আনআর্নড ইনকাম’ রাজনীতিতে ঢুকে পড়লে তা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য ক্ষতিকর।
তার দাবি, ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে আন্দোলন, ব্যাংকের ভেতরে-বাইরে বিক্ষোভ এবং আমানত প্রত্যাহারের মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে। যারা টাকা তুলে নিচ্ছে, তারা ইসলামী ব্যাংককে বিপদে ফেলতে চায়। এর পেছনে কিছু শক্তির হাত আছে।
বিরোধী দলের নোটিসে ব্যাংকের মুনাফা বৃদ্ধির যে তথ্য তুলে ধরা হয়েছে, সেটি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
আমির খসরু বলেন, ইসলামী ব্যাংক বিপুল অঙ্কের ‘প্রভিশন ডেফারেল’ সুবিধা নিয়েছে। ২০২৪ সালের শেষে প্রায় ৬৯ হাজার কোটি টাকা এবং ২০২৫ সালের শেষে প্রায় ৮৪ হাজার কোটি টাকার প্রভিশন স্থগিত রাখার সুবিধা নেওয়া হয়েছিল।
“এসব হিসাব বিবেচনায় নিলে ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে ব্যাংকটি প্রায় ২৬৮ কোটি টাকা লোকসান করেছে। এটা প্রফিট না, এটা উইন্ডো ড্রেসিং।”
তিনি বলেন, ২০২৫ সালের শেষে ইসলামী ব্যাংকের শ্রেণিকৃত ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯৪ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণ পোর্টফোলিওর প্রায় ৫১ শতাংশ।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ইসলামী ব্যাংকের প্রকৃত মালিকদের কাছে মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়ার যে দাবি তোলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমানে সেই প্রক্রিয়ার মধ্যেই কাজ করছে।
“বাংলাদেশ ব্যাংক আইনের অধীনে যেসব পরিবর্তন আনার ক্ষমতা রাখে, সেগুলোই করছে। যেখানে তারা মনে করছে গ্রাহক, আমানতকারী ও শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, সেখানে হস্তক্ষেপ করছে।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে নিয়ে সমালোচনারও জবাব দেন তিনি।
“অনেক দিন পর এমন একজন গভর্নর এসেছে, যিনি সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন। তাকে ঋণগ্রস্ত বলে সমালোচনা করা হচ্ছে। এই সংসদে ঋণগ্রস্ত নন, এমন কেউ আছেন? ব্যাংকই তো ঋণ দেওয়ার জন্য।”
তিনি বলেন, আর্থিক শৃঙ্খলা ছাড়া অর্থনীতির উন্নয়ন সম্ভব নয় এবং বিএনপি সরকার এ বিষয়ে কোনো আপস করবে না।
এ বিতর্কের ইতি টেনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, বিষয়টির ওপর আলোচনা ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। বিরোধী দলীয় উপনেতার বক্তব্যটি ‘পয়েন্ট অব অর্ডারের’ আওতায় পড়ে না এবং এ বিষয়ে নতুন করে আলোচনা চালানোর সুযোগ নেই।
সূত্র: বিডি নিউজ