।।বিকে রিপোর্ট।।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সম্পর্ক রয়েছে উল্লেখ করে কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার বলেন, এটাকে ভয়ঙ্কর অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন তিনি।
শুক্রবার ২৩ জানুয়ারী দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে ‘দেশব্যাপী গ্যাস, বিদ্যুৎ ও বিশুদ্ধ পানির সংকট: সমাজের করণীয়’ শীর্ষক সভায় এক প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন তিনি।
ফরহাদ মজহার বলেন, জামায়াতে ইসলামের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত যোগাযোগ বাংলাদেশের জন্য একটি গভীর উদ্বেগের বার্তা বহন করে। এই সম্পর্কের ইঙ্গিত ভবিষ্যৎ রাজনীতির ক্ষেত্রে অশনিসংকেত হিসেবেই বিবেচিত হওয়া উচিত।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টে গতকাল বৃহস্পতিবার প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ‘বন্ধুত্ব’ চাইছে যুক্তরাষ্ট্র। জামায়াত যদি বাংলাদেশে শরিয়াহ আইন চালু করতে চায়, তাহলে সেটা করতে পারবে না। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ওপর শতভাগ শুল্ক আরোপ করবে যুক্তরাষ্ট্র। এ বিষয়ে ফরহাদ মজহারের মন্তব্য জানতে চেয়ে প্রশ্ন করেন এক সাংবাদিক।
জবাবে ফরহাদ মজহার বলেন, আমি মনে করি যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের প্রতিটি দলই কোনো না কোনোভাবে যুক্ত। কেউ সরাসরি, কেউ ইনডাইরেক্টলি (পরোক্ষভাবে)। আমি প্রথমত মনে করি, ৫ আগস্টের গণ–অভ্যুত্থানের পর সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লবটাকে আন্তর্জাতিকভাবে বলা হয়, এটা রেজিম চেঞ্জ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে।
এ কথা তিনি শুরু থেকে বললেও সাংবাদিকেরা গুরুত্ব দেননি বলে উল্লেখ করেন ফরহাদ মজহার।
এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, এমনকি গণ–অধিকার পরিষদ ও গণ–অভ্যুত্থানের আগেও আমি বলেছি যে বাংলাদেশে শেখ হাসিনাকে সরানো এটা কোনো ইস্যু নয়। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রই সরিয়ে দেবে। আমাদের কাজ হচ্ছে নতুন বাংলাদেশ রাষ্ট্র কী করে আমরা গঠন করব।
কারণ, যুক্তরাষ্ট্র একটা ভূরাজনৈতিক শক্তি এবং পৃথিবীতে আন্তর্জাতিক আইন বলে কিছু নাই। দেখেছেন ট্রাম্পের যে আচরণ। এই রূঢ় বাস্তবতা, এই বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্যে আমার চিন্তা, আমি ১৭ কোটি মানুষকে নিয়ে বেঁচে থাকব কী করে? আমার প্রশ্ন খুব সহজ। আমি ১৭ কোটি মানুষকে নিয়ে ডাল–ভাত দিয়ে বেঁচে থাকতে চাই। কারও সঙ্গে যুদ্ধে জড়াতে চাই না।
প্রশ্নের জবাবে ফরহাদ মজহার আরও বলেন, আপনারা অনেকে ভারতবিরোধিতার কথা বলেন, ভারতের আধিপত্য আমি স্বীকার করি। কিন্তু আপনারা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কথা বলেন না কেন? কী জন্য বলেন না?
জামায়াত তো বলে নাই, গাজাতে (ফিলিস্তিনের) এই যে স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) যাচ্ছে, আমার সেখানে আপত্তি আছে। তবে বোঝা গেল জামায়াতের সঙ্গে অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রের একটা নীতি, একটা সম্পর্ক রয়েছে। ফলে আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্র এই বক্তব্যটা দিচ্ছে। এটা আমি ভয়ঙ্কর অশনিসংকেত হিসেবে দেখি।
সভায় বক্তব্যে সেনাবাহিনী ও জনগণের মধ্যে বিভাজন তৈরি না করার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতি আহ্বান জানান ফরহাদ মজহার।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের গণ–অভ্যুত্থান হয়েছে ছাত্র-জনতা ও সৈনিকদের মৈত্রীর ভিত্তিতে। সৈনিকেরা কৃষক ও শ্রমিক পরিবারের সন্তান। তাদের জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা বিপজ্জনক।’
রাষ্ট্র সংস্কার ও নির্বাচন নিয়ে ফরহাদ মজহার বলেন, গণ–অভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্য ছিল জনগণের জীবনধারণ নিশ্চিত করার মতো একটি রাষ্ট্র গঠন কিন্তু সেই লক্ষ্য উপেক্ষিত হয়েছে।
গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংকট প্রসঙ্গে ফরহাদ মজহার বলেন, এসব সংকট প্রাকৃতিক নয়, বরং কাঠামোগত ও রাজনৈতিক। বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়লেও জনগণ বিদ্যুৎ পাচ্ছে না, এটি লুটপাটমূলক ব্যবস্থার প্রমাণ। তিনি বলেন, উৎপাদন না করেও বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদকেরা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে টাকা নিচ্ছে। আইন পরিবর্তন না করে এই সংকট দূর হবে না।
বিশুদ্ধ পানির সংকট রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনা, নদী দখল ও বাণিজ্যিক লুণ্ঠনের ফল বলে মন্তব্য করেন ফরহাদ মজহার। তিনি বলেন, ‘জনগণের জীবনধারণের মৌলিক শর্ত— খাদ্য, পানি, জ্বালানি ও জমির ওপর জনগণের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাই প্রকৃত রাজনীতি। নির্বাচন এখন লুটপাটের ভাগ–বাঁটোয়ারার রাজনীতিতে পরিণত হয়েছে। জনগণের রাজনীতি মানে বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করা।’
গণ-অভ্যুত্থান সুরক্ষা মঞ্চ নামের একটি সংগঠন এই সভার আয়োজন করে। সভায় আলোচকদের মধ্যে আহমেদ ফেরদৌস, ভাববৈঠকীর সংগঠক মোহাম্মদ রোমেল উপস্থিত ছিলেন।