।।বিকে আন্তর্জাতিক ডেস্ক।।
যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম অঙ্গরাজ্য নিউইয়র্কের রাজধানী শহর নিউইয়র্ক সিটির ডেমোক্রেটিক মেয়র প্রাইমারিতে সাবেক গভর্নর অ্যান্ড্রু কুওমোকে পরাজিত করে জোহরান মামদানি জয়লাভ করে সবাইকে অবাক করে দিয়েছেন।
সিটি মেয়র পদের ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাথমিক নির্বাচনে বিপুল ব্যবধানে এগিয়ে ইতিহাস গড়ার পথে রয়েছেন জোহরান মামদানি। জোহরান মামদানি দেশটির ভারতীয় বংশোদ্ভূত মুসলিম প্রার্থী।
৩৩ বছর বয়সী মামদানি তার প্রচারে নিজেকে একজন আপোসহীন প্রগতিশীল হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। তিনি এমন এক সময়ে জিতলেন, যখন অনেকেই ভাবছিলেন যে তার মতো একজন গণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক সুইং ভোটারদের কাছে গ্রহণীয় নাও হতে পারেন। ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধের বিষয়ে তার কঠোর অবস্থানও আলোচনায় ছিল।
নির্বাচিত হলে মামদানি হবেন নিউইয়র্ক সিটির প্রথম মুসলিম ও ভারতীয় বংশোদ্ভূত মেয়র। পাশাপাশি, তিনিই হবেন শহরটির ইতিহাসে সবচেয়ে প্রগতিশীল মেয়রপ্রার্থী, যিনি সরাসরি জনগণের দাবি ও দারিদ্র্য সমস্যা নিয়ে লড়াই করছেন।
এই জয় শুধু মামদানির ব্যক্তিগত সাফল্য নয়। লিস স্মিথের মতো অভিজ্ঞ ডেমোক্রেটিক অপারেটররা মনে করেন, ভোটাররা এখন পুরোনো আর অনুপ্রেরণাহীন প্রার্থীদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
স্মিথের মতে, অ্যান্ড্রু কুওমো জো বাইডেন ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের খারাপ দিকগুলো একাই বহন করছিলেন– একদিকে তিনি ট্রাম্পের মতো অসম্মানজনকভাবে পদত্যাগ করেছিলেন, অন্যদিকে বাইডেনের মতো বুড়ো ও নতুন ধারণাহীন ছিলেন।
অভিনব প্রচার ও সাহসী অবস্থান
প্রচারণায় মামদানি বিভিন্ন ভাষায় ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেন—পুরো একটি ভিডিও ছিল উর্দুতে, যেখানে দেখা যায় বলিউডের ক্লিপও। অন্য ভিডিওতে তিনি কথা বলেন স্প্যানিশ ভাষায়। এসবই তাঁর বহুসাংস্কৃতিক ব্যাকগ্রাউন্ড ও মানুষের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের সক্ষমতা তুলে ধরেছে।
তাঁর নির্বাচনী ইশতেহারে রয়েছে- নগরবাসীর জন্য বিনামূল্যে বাস চলাচল, সর্বজনীন শিশু পরিচর্যা, ভাড়া বাড়ি স্থগিতকরণ, ধনীদের ওপর নতুন কর আরোপ করে সরকারি গ্রোসারি চালু ইত্যাদি।
মামদানি তার প্রচারে অর্থনীতির ওপর জোর দিয়েছিলেন। তার ওয়েবসাইটে বলা আছে, তিনি কর্মজীবী নিউইয়র্কবাসীদের জীবনযাত্রার খরচ কমানোর জন্য লড়ছেন। বিনামূল্যে সিটি বাস, ভাড়া নিয়ন্ত্রণ, সাশ্রয়ী আবাসন, শহর-মালিকানাধীন মুদির দোকান এবং বিনামূল্যে শিশু যত্নের মতো প্রস্তাবগুলো ছিল তার মূল প্রতিশ্রুতি। এই সবকিছুর খরচ মেটানোর কথা ছিল ধনী এবং কর্পোরেশনগুলোর ওপর কর বাড়িয়ে।
অনেক ডেমোক্র্যাট মনে করেন, মামদানির এই অর্থনৈতিক বার্তাটি তার জয়ের অন্যতম কারণ। হাউস ডেমোক্রেটিক লিডার হাকিম জেফ্রিজও মামদানির অর্থনৈতিক বার্তার প্রশংসা করেছেন। মামদানি সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত আর্থিক সমস্যাগুলোর ওপর জোর দিয়েছিলেন, যা ভোটারদের কাছে সরাসরি আবেদন তৈরি করেছিল।
রাজনৈতিক মূল্যায়ন
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ট্রিপ ইয়াং বলেন, নিউইয়র্কের আধুনিক ইতিহাসে এটি অন্যতম বড় রাজনৈতিক বিস্ময়। এই শহরের ভোটাররা সাহসী, স্পষ্টভাষী নেতাদের চান—যেমন জোহরান মামদানি।
কংগ্রেসওম্যান আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ ও সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স, যারা নিজেরাও ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট, তারা মামদানির প্রচারণায় সরাসরি সমর্থন জানিয়েছেন।
নিউইয়র্কে ‘র্যাংকড চয়েস’ পদ্ধতিতে নির্বাচন হওয়ায় চূড়ান্ত ফল আসতে কিছু সময় লাগবে, তবে কুমোর পরাজয় স্বীকার ইতোমধ্যে মামদানিকে বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিয়েছে। ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে জয় মানেই প্রায় নিশ্চিত মেয়র হওয়া—এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে নিউইয়র্ক সিটির ইতিহাসে প্রথম মুসলিম মেয়র হিসেবে জোহরান মামদানির নাম লেখানোর সম্ভাবনা এখন খুবই জোরালো।
মামদানি তার বিজয় ভাষণে বলেন, তার এই জয় শুধু নিউইয়র্কের জন্য নয়, সারা দেশের জন্য এক বার্তা। তিনি চান তার শহর ডোনাল্ড ট্রাম্পের ফ্যাসিবাদকে রুখতে এবং কর্মজীবী মানুষের জন্য লড়তে একটি মডেল হোক।
মায়া রুপার্টের মতো ডেমোক্রেটিক কৌশল নির্ধারকরা মনে করেন, মামদানির এই জয় বামপন্থীদের দেখাচ্ছে যে কীভাবে আপোসহীনভাবে প্রচারণা চালিয়ে জয়ী হওয়া যায়।
তিনি দেখিয়েছেন, সামাজিক ও জাতিগত ন্যায়বিচারের মতো বিষয়গুলো অজনপ্রিয় নয় বরং এগুলোকে সঠিকভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া গেলে জেতা সম্ভব।
তবে দলের সবাই মামদানির এই জয়ে খুশি নন। নিউইয়র্কের দুই কংগ্রেস সদস্য লরা গিলিন ও টম সুওজি মামদানিকে খুব বেশি চরমপন্থী বলে সমালোচনা করেছেন।
৩৩ বছর বয়সী জোহরান মামদানির জন্ম উগান্ডায়। তার বাবা মাহমুদ মামদানি ভারতীয় বংশোদ্ভূত একজন লেখক, তাত্ত্বিক, অধ্যাপক এবং উগান্ডার নাগরিক। তার মা মীরা নায়ার একজন সুপরিচিত ভারতীয় চলচ্চিত্র পরিচালক।