Breaking News:


শিরোনাম :
শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল করা হবে কোথায়ও বলা হয়নি : শিক্ষামন্ত্রী মালদ্বীপে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ, নিহত ৫ বাংলাদেশি মিরপুরে শিলাবৃষ্টি, বন্ধ বাংলাদেশ-পাকিস্তান ম্যাচ ইরাকে মার্কিন রিফুয়েলিং বিমান বিধ্বস্ত, ৪ সেনার মৃত্যু ঈদে ফিরতি ট্রেনযাত্রার টিকিট বিক্রি শুরু আজ ব্যক্তিগত গাড়ির বদলে গণপরিবহন ব্যবহারের নির্দেশ ব্যাংকারদের ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলে ইরানের ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, আহত ৫৮ জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার কবরে স্পিকার-ডেপুটি স্পিকারের শ্রদ্ধা রাশিয়ার তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিল যুক্তরাষ্ট্র উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর নেওয়া হচ্ছে মির্জা আব্বাসকে

সরকার নির্ধারিত মূল্যে চামড়া কিনতে অনাগ্রহ – লোকসানের অজুহাত আড়তদারদের : চামড়ার বাজারে ধস

  • ০৯:২৩ এএম, রবিবার, ৮ জুন, ২০২৫
ছবি: সংগৃহিত

।।বিকে রিপোর্ট।।
ঈদুল আজহার কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে এবারও উঠেছে নানা অভিযোগ। সরকারের নির্ধারিত মূল্যে চামড়া কিনতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেছেন আড়তদাররা। বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম কাঁচা চামড়ার বাজার হওয়ার গৌরব বাংলাদেশের, অথচ কোরবানির মৌসুমে সেই চামড়া পানির দামে বিক্রি হওয়ার বেদনাবিধুর বাস্তবতা বছরের পর বছর ধরে অব্যাহত। ন্যায্য দাম না পাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কোরবানিদাতা, মৌসুমি ব্যবসায়ী এবং ক্ষুদ্র চামড়া সংগ্রাহকরা।

জানা গেছে, গরুর কাঁচা চামড়া কেনাবেচা হচ্ছে ৭০০ থেকে ৯০০ টাকায়, ছোট গরুর চামড়া কেউ কিনতে চায় না। এরপরেও কিনলে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকার বেশি দাম হাকাচ্ছেন না কেউ। এতে করে এ বছরও চামড়ার ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয়েছেন মাদ্রাসা ও এতিমখানার দরিদ্র শিক্ষার্থীরা। এ চিত্র যেন রাজধানীসহ দেশজুড়েই।

উল্লেখ্য, ঈদের আগে মূল্য বাড়িয়ে কোরবানির পশুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দিয়েছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।

এ বছর ঢাকায় গরুর প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৬০ থেকে ৬৫ টাকা, যা গত বছর ছিল ৫৫ থেকে ৬০ টাকা। অপরদিকে ঢাকার বাইরে গরুর প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয় ৫৫ থেকে ৬০ টাকা, যা গত বছর ছিল ৫০ থেকে ৫৫ টাকা।

কিন্তু বিগত বছরগুলোর মতো এবারও কোরবানির কাঁচা চামড়ার মূল্য নিয়ে আড়তদাররা স্বেচ্ছাচারিতা শুরু করেছেন। লোকসানের অজুহাতে তারা চামড়ার দাম কমিয়ে দিচ্ছেন, ফলে চামড়া বিক্রেতা ও ফড়িয়াদের সঙ্গে চলছে টানাপড়েন ও দরকষাকষি।

এদিকে সরকার নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি হচ্ছে না বলে দাবি করে পশু কোরবানি দেওয়া ব্যক্তিরা জানান, গরুর চামড়ার জন্য মৌসুমি ব্যবসায়ীরা অনেক কম দাম দিচ্ছেন।

এছাড়া দাম নিয়ে শুরু হয়েছে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ। আড়ত মালিকদের সংগঠন জানান, লোকসান এড়াতে সরকার নির্ধারিত দামে চামড়া কিনবেন না তারা। সাভারের চামড়ার আড়তগুলোতে আড়তদাররা দাম হাঁকাচ্ছেন প্রতি পিস গরুর চামড়া মানভেদে ৬০০-৭০০ টাকা। এছাড়া ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে ছাগলের চামড়াও।

অপরদিকে পাইকারি ব্যবসায়ীদের মতে, মৌসুমি ব্যবসায়ীরা না বুঝে বেশি দামে চামড়া কিনে নিয়ে আসেন। বাজার ভাল নয়। তাই ৭০০ থেকে ৯০০ টাকায় চামড়া কিনছেন তারা।

বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব টিপু সুলতান গণমাধ্যমকে জানান, প্রতি বর্গফুটে দাম কিছুটা বাড়ানো হলেও বাস্তব খরচ বিবেচনা করলে ব্যবসায়ীদের লাভের সম্ভাবনা অত্যন্ত সীমিত। যেমন, একটি চামড়া ৭০০ টাকায় কিনে লবণ ও শ্রমিক বাবদ খরচ হয় ৩০০ টাকা, হাতবদলে বাড়ে আরও ১০০ টাকা। এতে করে দাম দাঁড়ায় ১ হাজার ১৫০ টাকা। এই চামড়া ট্যানারির কাছে কী দামে বিক্রি হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা টিকবে কিনা, সেটি এখন একটি বড় প্রশ্ন।

সাভারে দুপুর ১২টার পর থেকে চামড়াবাহী ইজিবাইক ও অটোরিকশায় ভিড় জমে যায় শিল্পনগরীর আড়ত এলাকায়। সেখানে গরুর চামড়ার দাম প্রতি পিস মানভেদে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা হাঁকা হচ্ছে, আর ছাগলের চামড়া বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৫০ টাকায়।

সাভার কাঁচা চামড়া আড়ত মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. এমদাদুল হক (সোহরাব) বলেন, সরকার নির্ধারিত দামে চামড়া কেনা সম্ভব নয়। চামড়ার সঙ্গে লবণ, শ্রমিক ও পরিবহণ খরচ যোগ হলে লোকসান হবেই।

উল্লেখ্য, চলতি বছর হেমায়েতপুরের আড়তগুলোতে চার লাখ পিস চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করার লক্ষ্য রয়েছে।


সংকট নিরসনে দীর্ঘ বিরতির পর সরকার তিন মাসের জন্য শিথিল করেছে কাঁচা ও ওয়েট ব্লু  চামড়া রপ্তানির শর্ত, যা বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ও চাহিদা বাড়ানোর আশা জাগাচ্ছে। তবে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, বিনিয়োগে দ্বিধা, টানা বর্ষণ, ব্যাংক ঋণে জটিলতা ও সরকারের নির্ধারিত উচ্চমূল্য— সব মিলিয়ে এ বছরও অনেক চামড়া অবিক্রিত থেকে যাওয়ার শঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে সরকারের কাঁচা ও ওয়েট ব্লু  চামড়া রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের সিদ্ধান্তে যখন আড়তদারদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে, তখন ট্যানারি মালিকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে স্পষ্ট অসন্তোষ। তাদের দাবি, কাঁচা চামড়ার রপ্তানির অনুমতি অল্পমেয়াদে বাজারে দাম বাড়ালেও দীর্ঘমেয়াদে দেশের ট্যানারি শিল্প হুমকির মুখে পড়বে।

বাংলাদেশ ফিনিশড চামড়া শিল্প সমিতির এক নেতার ভাষায়, ক্রাস্ট ও ফিনিশড চামড়া উৎপাদনে আমরা দেশে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছি। এর মাধ্যমে লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এখন যদি রপ্তানির নামে কাঁচা চামড়া বিদেশে চলে যায়, তাহলে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা কীভাবে পূরণ হবে? ওয়েট ব্লু চামড়া রপ্তানির সুযোগ কতটা যৌক্তিক— তা নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি।

বাংলাদেশ থেকে ওয়েট ব্লু চামড়ার রপ্তানি একসময় নিয়মিতই হতো— বিশেষ করে ১৯৯০ সালের আগ পর্যন্ত। এরপর দীর্ঘ সময় এ রপ্তানি বন্ধ থাকলেও ২০২১ সালে কেস টু কেস ভিত্তিতে সীমিতভাবে মাত্র এক কোটি বর্গফুট ওয়েট ব্লু  চামড়া রপ্তানির অনুমতি দিয়েছিল সরকার। তবে চলতি বছর প্রথমবারের মতো এই নিষেধাজ্ঞা সবার জন্য সাময়িকভাবে শিথিল করে দেওয়া হয়েছে, যার আওতায় কাঁচা ও ওয়েট ব্লু— দুই ধরনের চামড়াই রপ্তানি করা যাবে।

বাংলাদেশ মূলত চীন, হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি, জাপান ও স্পেনের মতো দেশে ফিনিশড চামড়া রপ্তানি করে থাকে। এবার সেইসব দেশের প্রতিই কাঁচা ও ওয়েট ব্লু  চামড়া রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ইতোমধ্যে চীন ও ভিয়েতনামের সঙ্গে সরকারিভাবে যোগাযোগ করা হয়েছে। তারা বাংলাদেশ থেকে পশুর চামড়া আমদানিতে আগ্রহও প্রকাশ করেছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, কোরবানির পশুর চামড়া সংক্রান্ত বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের অপতৎপরতা রোধে বর্তমান সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। বিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অভ্যন্তরীণ বাজারে কাঁচা চামড়ার মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা কার্যকর হলে ব্যবসায়ীদের কোনো ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা থাকবে না। প্রতিবছর কোরবানির মৌসুমে সিন্ডিকেটের কারণে চামড়ার বাজারে ব্যবসায়ীরা ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হন।

এই সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে এবং বাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে, সরকার তিন মাসের জন্য কাঁচা চামড়া সরাসরি রপ্তানির সুযোগ প্রদান করেছে। এর ফলে মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়বে এবং ব্যবসায়ীদের সঠিক মূল্য আদায়ের পথ সুগম হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সরকারি এ পদক্ষেপে চামড়া খাতের উন্নয়ন এবং ব্যবসায়ীদের কল্যাণ নিশ্চিতকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পাশাপাশি দেশের বাণিজ্যে স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে।

এছাড়া নির্ধারিত মূল্যের বাইরে চামড়া কেনাবেচা করলে কিংবা জাতীয় এই সম্পদ নষ্টের সঙ্গে জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সরকার সাফ জানিয়ে দিয়েছে। এ লক্ষ্যে দেশের সকল জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) আগেভাগেই প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হবে, যাতে স্থানীয় পর্যায়ে বাজার তদারকি ও আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা যায়।

চামড়া যেন তড়িঘড়ি করে অল্প দামে বিক্রি করতে বাধ্য না হয়, সে জন্য চামড়া সংরক্ষণের ব্যবস্থা জোরদার করা হচ্ছে। বিশেষ করে লবণের সরবরাহ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বেসরকারি খাতের পাশাপাশি সরকারি উদ্যোগেও সারা দেশে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ টন লবণ সরবরাহ করা হবে, যার মধ্যে ৩০ হাজার টন লবণ বিনামূল্যে বিতরণ করা হবে চামড়া সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে।

সরকার মনে করছে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে কোরবানির মৌসুমে কাঁচা চামড়ার বাজারে স্বচ্ছতা, স্থিতিশীলতা এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

এ বিষয়ে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, আমরা এবার কাঁচা চামড়া বাজারে স্থিতিশীলতা আনতে কয়েকটি সমন্বিত উদ্যোগ নিয়েছি। সরকারিভাবে বিনামূল্যে লবণ বিতরণ করা হচ্ছে, চামড়া সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং লবণ লাগাতে যে শ্রম ব্যয় হয়, সেটিও মূল্য নির্ধারণে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। সবদিক চিন্তা করেই এবার চামড়ার যে মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত।

তিনি আরও জানান, দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি কাঁচা চামড়া চীনের ও ভিয়েতনামের মতো বাজারে রপ্তানির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এতে বাজারে চাহিদা ও মূল্য— উভয়ই স্থিতিশীল থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সোস্যাল মিডিয়াতে নিউজটি শেয়ার করুন

আরও পড়ুন
© All rights reserved © 2025. Bangalir Khobor
Developed by Tiger Infotech