।।বিকে আন্তর্জাতিক ডেস্ক।।
স্পেনের দক্ষিণাঞ্চলে দ্রুতগতির দুটি ট্রেনের সংঘর্ষে অন্তত ২১ জন নিহত হয়েছেন। এ দুর্ঘটনায় আহত অবস্থায় ৭৫ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৩০ জনের অবস্থা গুরুতর। নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।
সোমবার ১৯ জানুয়ারি সিনহুয়া, বিবিসি, রয়টার্সসহ একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, গতকাল রবিবার ১৮ জানুয়ারী (স্থানীয় সময়) সন্ধ্যা ৭টা ৪৫ মিনিটে (স্থানীয় সময়) কর্দোবার কাছে মালাগা থেকে মাদ্রিদগামী একটি ট্রেনের পেছনের অংশ লাইনচ্যুত হয়ে পাশের লাইনে আছড়ে পড়ে। লাইনচ্যুত হওয়ার পর সেটির সঙ্গে বিপরীত দিক থেকে আসা মাদ্রিদ-হুয়েলভাগামী আরেকটি ট্রেনের সংঘর্ষ হয়। ভয়াবহ এই দুর্ঘটনায় দুই ট্রেনের অন্তত ২১ যাত্রী নিহত হয়।
এই ঘটনায় দেশজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী এই ঘটনাকে ‘গভীর বেদনার এক রাত’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
পুলিশের একজন মুখপাত্র এএফপি-কে জানান, দুর্ঘটনায় ২১ জন প্রাণ হারিয়েছেন। আন্দালুসিয়ার জরুরি সেবা বিভাগের প্রধান কর্মকর্তা আন্তোনিও সানজ এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, দুর্ঘটনায় অন্তত ৭৩ জন আহত হয়েছেন। তিনি আরও বলেন, মৃতের সংখ্যা আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
স্পেনের পরিবহন মন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তে সাংবাদিকদের জানান, আহতদের মধ্যে ৩০ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাদের দ্রুত হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তিনি আরও জানান, রেললাইনের যে অংশে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে তা ছিল সোজা এবং সম্পূর্ণ নতুনভাবে সংস্কার করা। এছাড়া যে ট্রেনটি প্রথম লাইনচ্যুত হয়েছে সেটিও ছিল একদম নতুন, যার ফলে এই দুর্ঘটনাটিকে ‘অত্যন্ত অদ্ভুত’ বলে বর্ণনা করেছেন তিনি।
বেসরকারি রেল কোম্পানি ইরিও জানিয়েছে, মালাগা থেকে যাত্রা করা যে ট্রেনটি প্রথমে লাইনচ্যুত হয়, তাতে প্রায় ৩০০ যাত্রী ছিলেন। অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় রেল সংস্থা রেনফে পরিচালিত অন্য ট্রেনটিতে প্রায় ১০০ যাত্রী ছিলেন।
সরকারি টেলিভিশন এস্পানিওলার খবরে বলা হয়েছে, নিহতদের মধ্যে মাদ্রিদ থেকে হুয়েলভাগামী ট্রেনটির চালকও আছেন। আহতদের মধ্যে ৩০ জনকে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্পেনের পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তে।
মাদ্রিদের আতোচা স্টেশনে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, দুর্ঘটনার কারণ এখনো জানা যায়নি। অস্কার পুয়েন্তে বলেন, সোজা রেলপথে এমন দুর্ঘটনা ‘অত্যন্ত অস্বাভাবিক।’ ওই রেলপথটি গত মে মাসে সংস্কার করা হয়েছিল বলেও জানান তিনি।
আন্দালুসিয়া অঞ্চলের জরুরি সেবা বিভাগ জানায়, দুর্ঘটনাস্থলে পাঁচটি আইসিইউ, চারটি জরুরি ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিট এবং বহু অ্যাম্বুলেন্স মোতায়েন করা হয়। আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর হাসপাতালে পাঠানো হয়।
আন্দালুসিয়ার আঞ্চলিক সরকারের প্রেসিডেন্ট হুয়ানমা মোরেনো সামাজিক মাধ্যমে জানান, ‘হতাহত সবার প্রতি আমাদের সংহতি রয়েছে।’ এডিআইএফের কর্মীরাও উদ্ধার ও চিকিৎসা কার্যক্রমে জরুরি সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছেন।
কর্ডোবার ফায়ার সার্ভিস প্রধান ফ্রান্সিসকো কারমোনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আরটিভিই-কে বলেন, ‘বগিগুলো দুমড়েমুচড়ে মানুষের শরীরের সাথে আটকে গেছে। এমনকি একজনকে জীবিত উদ্ধারের জন্য আমাদের এক মৃত ব্যক্তির দেহ সরিয়ে ফেলতে হয়েছে। এটি অত্যন্ত কঠিন ও জটিল কাজ।
হুয়েলভাগামী দ্বিতীয় ট্রেনের যাত্রী মন্তসে জানান, একটি প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিয়ে ট্রেনটি থেমে যায় এবং সবকিছু অন্ধকার হয়ে যায়। তিনি ট্রেনের শেষ বগিতে ছিলেন। তিনি বর্ণনা করেন, মালপত্র যাত্রীদের ওপর পড়তে থাকে এবং তার পেছনে থাকা এক অ্যাটেনডেন্টের মাথায় আঘাত লেগে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। তিনি বলেন, ‘এ সময় শিশুরা কাঁদছিল। ভাগ্যক্রমে আমি শেষ বগিতে ছিলাম। মনে হচ্ছে আমি দ্বিতীয়বার জীবন পেয়েছি।’
প্রথম ট্রেনের যাত্রী লুকাস মেরিয়াকো জানান, ‘ঘটনাটি দেখতে একদম হরর মুভির মতো ছিল। আমরা পেছন থেকে প্রচণ্ড ধাক্কা অনুভব করলাম এবং মনে হলো পুরো ট্রেনটি ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে। কাঁচের আঘাতে অনেকে আহত হয়েছে।’
রেল অপারেটর আদিফ ঘোষণা করেছে, মাদ্রিদের সাথে আন্দালুসিয়ার শহর কর্ডোবা, সেভিল, মালগা এবং হুয়েলভার হাইস্পিড ট্রেন চলাচল আজ সোমবার সারাদিন বন্ধ থাকবে। ভুক্তভোগীদের স্বজনদের সহায়তার জন্য বিভিন্ন স্টেশনে বিশেষ বুথ স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ঘটনাস্থলে ৪০ জন সেনা সদস্য এবং ১৫টি সামরিক যান পাঠিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এক্সে লিখেছেন, আদামুজের এই মর্মান্তিক ট্রেন দুর্ঘটনার কারণে আজ আমাদের দেশের জন্য গভীর বেদনার এক রাত। কোনো শব্দই এই বিশাল শোক লাঘব করতে পারবে না, তবে আমি চাই তারা জানুক, এই কঠিন সময়ে পুরো দেশ তাদের পাশে আছে।
স্পেনের রাজপ্রাসাদ থেকে জানানো হয়েছে যে, রাজা ষষ্ঠ ফিলিপ এবং রানি লেতিসিয়া অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে এই খবর পর্যবেক্ষণ করছেন। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এবং ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান উরসুলা ভন ডার লিয়েনও শোক প্রকাশ করেছেন।
স্পেন ইউরোপের বৃহত্তম হাইস্পিড রেল নেটওয়ার্কের অধিকারী। দেশটিতে ৩,০০০ কিলোমিটারেরও বেশি ডেডিকেটেড ট্র্যাক প্রধান শহরগুলোকে সংযুক্ত করেছে। এর আগে ২০১৩ সালে সান্তিয়াগো ডি কম্পোস্টেলা শহরের কাছে একটি ট্রেন দুর্ঘটনায় ৮০ জন নিহত হয়েছিল, যা ছিল ১৯৪৪ সালের পর স্পেনের সবচেয়ে বড় রেল দুর্ঘটনা।