।।বিকে রিপোর্ট।।
টানা তৃতীয় দিনের মতো সড়ক অবরোধ চলছে খাগড়াছড়িতে। একই সাথে খাগড়াছড়িতে ১৪৪ ধারা অব্যাহত রয়েছে। তবে ঢাকা ও চট্টগ্রামের সড়কে ‘জুম্ম-ছাত্র জনতার’ ডাকা অবরোধ শিথিল করা হয়েছে বলে জানিয়েছে তারা।
সোমবার ২৯ সেপ্টেম্বর সকালে এক ফেইসবুক পোস্টের মাধ্যমে এই ঘোষণা দেয় ‘জুম্ম-ছাত্র জনতার’ মিডিয়া সেল।
অবরোধের ২য় দিনে গতকাল রবিবার গুইমারা উপজেলায় দুর্বৃত্তের গুলিতে তিনজন পাহাড়ি নিহত এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ পাহাড়ি-বাঙালি উভয়পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হন। নিহতদের লাশ গতকাল বিকেলে খাগড়াছড়ি জেলা সদর হাসপাতালে আনা হয়। মরদেহগুলোর পরিচয় নিশ্চিতের চেষ্টা চলছে এবং আজ সোমবার ময়নাতদন্ত হতে পারে। এখন পুরো জেলায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
উল্লেখ্য, ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে এক স্কুলছাত্রী ধর্ষণের ঘটনার জেরে কয়েকদিন ধরে খাগড়াছড়ির বিভিন্নস্থানে পাহাড়ি ও বাঙালিদের মধ্যে উত্তেজনা চলছে। হামলা-পাল্টা হামলায় কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও দোকানে ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। এ পরিস্থিতিতে খাগড়াছড়ি পৌরসভা, সদর উপজেলা ও গুইমারা এলাকায় প্রশাসন জারি করা ১৪৪ ধারা এখনো বহাল রয়েছে।
সড়ক অবরোধের কারণে জেলার বিভিন্ন সড়কে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। আজও খাগড়াছড়ির বিভিন্নস্থানে ব্যারিকেড বসিয়ে অবরোধ পালন করা হচ্ছে, যদিও অবরোধকারীদের প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। শহর ও শহরতলীর সড়কগুলো ফাঁকা পড়ে আছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া সাধারণ মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। লংগদু, বাঘাইছড়িসহ বিভিন্ন বাজারের কাঁচামালবাহী ট্রাক ও পিকআপ আটকে থাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
এদিকে, সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশ যৌথভাবে টহল জোরদার করেছে। ধর্ষণ মামলায় সন্দেহভাজন একজনকে আটক করা হলেও বাকি দুইজন এখনো পলাতক রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ চলবে বলে জুম্ম ছাত্র-জনতার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
খাগড়াছড়ি আধুনিক জেলা সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. রিপল বাপ্পি চাকমা বলেন, পুলিশ মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করার পর ময়নাতদন্ত করা হবে।
খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক এবিএম ইফতেখারুল ইসলাম বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিভিন্ন মহলের সঙ্গে আলোচনা চলছে। এখনো ১৪৪ ধারা বলবৎ রয়েছে।
জুম্ম-ছাত্র জনতার পোস্টে বলা হয়, রবিবার গুইমারায় সেনাবাহিনী ও পুলিশের গুলিতে এবং সেটেলারদের নির্যাতনে আহত জুম্ম ভাই-বোনদের উন্নত সুচিকিৎসা এবং শহীদ জুম্ম ভাইদের লাশের সৎকারের সুবিধার্থে ঢাকা-খাগড়াছড়ি এবং চট্টগ্রাম খাগড়াছড়ি সড়কে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত দুপুর ১২টা হতে সড়ক অবরোধ শিথিল থাকবে।
একইসঙ্গে আহতদের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে ঢাকা থেকে একটি চিকিৎসক দল আসবে, তাদের আগমনে যেন কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে সর্বস্তরের সহযোগিতা কামনা করা হয় পোস্টে। তবে দুই সড়ক বাদে জেলার বাকি সড়কগুলিতে অবরোধ চলবে বলেও পোস্টে জানান হয়েছে।
জুম্ম ছাত্র-জনতা নামে একটি সংগঠনের ব্যানারে ডাকা এ অবরোধে খাগড়াছড়ি জেলা থেকে দূরপাল্লার যাত্রী ও পণ্যবাহী যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। একই সঙ্গে বন্ধ রয়েছে জেলার অভ্যন্তরীণ সড়কের যান চলাচল।
সোমবার ২৯ সেপ্টেম্বর ভোর থেকে অবরোধের সমর্থনে জেলার বিভিন্ন স্থানে রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে পিকেটিং করেছে অবরোধকারীরা।
অন্যদিকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তি মাধ্যমে খাগড়াছড়ি প্রসঙ্গে বলা হয়, গত ২০২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়িতে মোটরসাইকেল চালক মামুন হত্যাকে কেন্দ্র করে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) মূল এবং অঙ্গসংগঠনসমূহ দীঘিনালা ও রাঙামাটিতে সাম্প্রদায়িক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। ফলশ্রুতিতে তিন জন নিহতসহ বেশ কিছু এলাকাবাসী আহত হয়। গত বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর এর ঘটনার এক বছর পূর্তি হিসাবে এই বছর ইউপিডিএফ এবং এর সহযোগী সংগঠনসমূহ পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ মিছিল এর আয়োজন করে এবং অনুরূপ ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটানোর চেষ্টা করে।
গত ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখ রাতে খাগড়াছড়ির সিঙ্গিনালা এলাকায় এক স্কুলছাত্রীর ধর্ষণের অভিযোগকে আমলে নিয়ে ইউপিডিএফ (মূল) এর দাবিকৃত সন্দেহভাজন শয়ন শীলকে সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় গত ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে গ্রেপ্তার করা হয় এবং পুলিশ হেফাজতে রিমান্ডে নেয়া হয়। ঘটনাটির সত্যতা বিচারে আইনি প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে।
শয়ন শীলকে গ্রেফতার করা সত্ত্বেও ইউপিডিএফ এর অঙ্গসংগঠন পিসিপি এর নেতা উখ্যানু মারমা ‘জুম্ম ছাত্র জনতার’ ব্যানারে গত ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে খাগড়াছড়িতে বিক্ষোভ মিছিল এবং প্রতিবাদী মানববন্ধনের ডাক দেয়। এর ধারাবাহিকতায় গত ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে ইউপিডিএফ এর আহ্বানে খাগড়াছড়িতে অর্ধবেলা হরতাল পালিত হয়। একই সময় দেশে বিদেশে অবস্থানরত ব্লগার এবং পার্বত্য অঞ্চলের কিছু দায়িত্বশীল ব্যাক্তিবর্গ কর্তৃক অনলাইনে বাঙালিদের উদ্দেশ্য করে বিভিন্ন রকম অপপ্রচার ও উস্কানিমূলক বক্তব্য দেয়া হয়।
গত ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে ইউপিডিএফ এর কর্মী উখ্যানু মারমার নেতৃত্বে এবং সামাজিক মাধ্যমে দেশী ও প্রবাসী ব্লগারসহ পার্বত্য জেলার কিছু দায়িত্বশীল ব্যক্তির উস্কানিমূলক প্রচারণার প্রভাবে সমগ্র খাগড়াছড়িতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। অবরোধ চলাকালে এক পর্যায়ে ইউপিডিএফ এর প্ররোচনায় উশৃঙ্খল এলাকাবাসী টহলরত সেনাদলের উপর ইট পাটকেল নিক্ষেপ করে। ফলশ্রুতিতে তিনজন সেনা সদস্য আহত হয়। সার্বিক পরিস্থিতি এবং উসকানির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সেনাবাহিনী অত্যন্ত ধৈর্য্য, সংযম ও মানবিকতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবেলা করে এবং বল প্রয়োগ থেকে বিরত থাকে।
গত ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে ইউপিডিএফ এবং অঙ্গ সংগঠনের কর্মীরা আবারো দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টির চেষ্টা চালায় এবং বিভিন্ন স্থানে বাঙালি সহ সাধারণ মানুষের উপর গুলি, ভাঙচুর, অ্যাম্বুলেন্সে আক্রমণ এবং রাস্তা অবরোধসহ নাশকতা করে সমগ্র খাগড়াছড়ি পৌরসভা এলাকার আইন শৃংখলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটায়। উক্ত দিন দুপুর নাগাদ সামগ্রিক বিষয়টি পাহাড়ি-বাঙালির একটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার রূপ নেয়। অবস্থা বিচারে জেলা প্রশাসন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক খাগড়াছড়ি ও গুইমারা এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। এমতাবস্থায়, সেনাবাহিনী, বিজিবি এবং আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী চরম ধৈর্য্যের সাথে সারা রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে এবং একটি অবশ্যম্ভাবী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিহত করা সম্ভবপর হয়।