।।বিকে আন্তর্জাতিক ডেস্ক।।
দীর্ঘ চার মাসের সংঘাতের পর স্থায়ী শান্তি চুক্তির প্রথম ধাপ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) আনুষ্ঠানিকভাবে সই হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ইলেকট্রনিকভাবে এতে স্বাক্ষর করেছেন।
বুধবার ১৭ জুন ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের ভার্সাই প্রাসাদে এ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। বার্তাসংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
উভয় পক্ষ জানিয়েছে, চুক্তিটি ইতোমধ্যে কার্যকর হয়েছে। তবে চুক্তি কার্যকরের প্রথম দিনেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, ‘ইরান চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করলে যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় সামরিক হামলা চালাবে এবং প্রয়োজনে দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তাদেরও লক্ষ্যবস্তু করবে।
ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, তারা যদি চুক্তি ভঙ্গ করে, তাহলে আমরা তাদের ওপর ভয়াবহ বোমা হামলা চালাব। আমি তা চাই না, আমি চাই তারা চুক্তি মেনে চলুক।
তবে যুদ্ধ শুরুর আগে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করার যে প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছিলেন, সেখান থেকে সরে আসার ইঙ্গিতও দেন ট্রাম্প। প্যারিসে তিনি বলেন, অন্য দেশগুলোর কাছে যদি ক্ষেপণাস্ত্র থাকে, তাহলে ইরানের কিছু ক্ষেপণাস্ত্র থাকা অন্যায্য নয়।
অন্যদিকে, তেহরানে চুক্তিকে বড় কূটনৈতিক বিজয় হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ বলেন, ‘সামরিক অভিযানের মাধ্যমে যা অর্জন করতে চেয়েছিলাম, আলোচনার মাধ্যমে আমরা তার চেয়েও অনেক বেশি পেয়েছি।’
ইরানের সঙ্গে হওয়া সমঝোতা স্মারকের সরকারি নথি বুধবার ১৭ জুন প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ শিরোনামের ১৪ দফা এই নথিতে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া, ইরানের ওপর কিছু আর্থিক বিধিনিষেধ শিথিল, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নিষ্ক্রিয় করার ন্যূনতম পদ্ধতি এবং ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
মার্কিন প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নথিটি প্রকাশ করে জানান, জনসমালোচনার মুখে এর পূর্ণাঙ্গ পাঠ প্রকাশ করা হয়েছে। শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে এই সমঝোতা স্মারকে সই হওয়ার কথা রয়েছে। এরপরই চূড়ান্ত চুক্তির শর্ত নিয়ে ৬০ দিনের আলোচনা শুরু হবে।
নথি অনুযায়ী, দুই দেশ একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডগত অখণ্ডতাকে সম্মান জানাবে এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না বলেও নথিতে উল্লেখ আছে। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে আলোচনায় বসতে তারা রাজি হয়েছে। পারস্পরিক সম্মতিতে এই সময়সীমা বাড়ানো যাবে।
সমঝোতা স্মারকে বলা হয়েছে, সই হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে নৌ-অবরোধ প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু করবে এবং ৩০ দিনের মধ্যে তা পুরোপুরি তুলে নেবে। এই সময়ের মধ্যে সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল ধাপে ধাপে যুদ্ধপূর্ব অবস্থার কাছাকাছি ফিরিয়ে আনা হবে। চূড়ান্ত চুক্তি হলে তার ৩০ দিনের মধ্যে ইরানের আশপাশ থেকে যুক্তরাষ্ট্র তাদের বাহিনী সরিয়ে নেবে বলেও অঙ্গীকার করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ইরান ৬০ দিনের জন্য পারস্য উপসাগর থেকে ওমান সাগর এবং উল্টো পথে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ ও বিনা খরচে চলাচল নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। নথিতে বলা হয়েছে, জাহাজ চলাচল তাৎক্ষণিকভাবে শুরু হবে, তবে প্রযুক্তিগত ও সামরিক প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং মাইন অপসারণের কাজ ৩০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে। হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ প্রশাসন ও সামুদ্রিক সেবা ব্যবস্থার বিষয়ে ওমান এবং পারস্য উপসাগরীয় উপকূলবর্তী দেশগুলোর সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী আলোচনাও করবে তেহরান।
ট্রাম্পের সমঝোতা স্মারকে সই করার একটি ছোট্ট ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পোস্ট করেছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ। তিনি পোস্টে লেখেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভার্সাইয়ে আজ রাতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চুক্তিতে সই করেছেন।’
মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ইংরেজি ও ফারসি ভাষায় ডিজিটাল স্বাক্ষরের মাধ্যমে চুক্তিটি অনুমোদন করেছেন। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বুধবার থেকেই এটি কার্যকর হয়েছে।
ফ্রান্সের এভিয়ান-লে-ব্যাঁ শহরে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনে অংশ নেওয়া নেতারা এ চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা এক যৌথ বিবৃতিতে লেবাননে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে ইসরায়েল এই আলোচনার অংশ ছিল না এবং দক্ষিণ লেবাননে তাদের সামরিক উপস্থিতি অব্যাহত রয়েছে। দেশটি জানিয়েছে, প্রয়োজন হলে তারা সামরিক শক্তি প্রয়োগের অধিকার সংরক্ষণ করবে।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে। যুদ্ধের প্রথম দিনেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও বেশ কয়েকজন সামরিক কমান্ডার নিহত হন। পরবর্তীতে সংঘাতটি আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেয়। এতে ইরান ও লেবাননসহ বিভিন্ন স্থানে সাত হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়। যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির চাপ এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতে খাদ্য সংকটের আশঙ্কা দেখা দেয়।
টানা ৪০ দিন ধরে সংঘাত এবং তারপর যুদ্ধবিরতির নামে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে স্থবির অবস্থার পর গত মে মাসের প্রথম সপ্তাহে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের মাধ্যমে ইরানের কাছে নতুন এই চুক্তির খসড়া পাঠিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।