।।বিকে ডেস্ক।।
দেশের সরকারি জলমহাল ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, জলাশয় দখল ও দূষণ রোধ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং প্রকৃত মৎস্যজীবীদের অধিকার নিশ্চিতে নতুন ‘সরকারি জলমহাল আইন, ২০২৬’-এর খসড়া প্রস্তুত করেছে সরকার।
খসড়া আইনে জলমহাল অবৈধভাবে দখল, ভরাট, দূষণ, প্রাকৃতিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি এবং জলজ সম্পদ বিনষ্টের মতো অপরাধের বিরুদ্ধে কারাদন্ড ও অর্থদন্ডসহ কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
এ বিষয়ে ভূমিমন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান মিনু বলেন, দেশের নদী, খাল, বিল, হাওর, বাঁওড় ও অন্যান্য সরকারি জলমহাল শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, এগুলো আমাদের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং লাখো মানুষের জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দীর্ঘদিন ধরে জলমহাল দখল, ভরাট, দূষণ ও অব্যবস্থাপনার কারণে এসব সম্পদ হুমকির মুখে পড়েছে।
এ বাস্তবতা বিবেচনায় সরকার একটি যুগোপযোগী ও কার্যকর সরকারি জলমহাল আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে।
তিনি বলেন, নতুন আইনের মাধ্যমে জলমহালের সুরক্ষা, টেকসই ব্যবস্থাপনা এবং প্রকৃত মৎস্যজীবীদের অধিকার নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে অবৈধ দখল, ভরাট, পরিবেশ বিনষ্ট এবং জলজ সম্পদ ধ্বংসের মতো অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে, যাতে কেউ সরকারি জলমহাল ক্ষতিগ্রস্ত করার সাহস না পায়।
মন্ত্রী আরও বলেন, এই আইন শুধু শাস্তিমূলক আইন নয়; এটি জলমহাল সংরক্ষণ, পরিবেশ রক্ষা, মৎস্যসম্পদের উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রাকৃতিক সম্পদ সুরক্ষার একটি সমন্বিত আইন। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত নিয়ে আইনটি চূড়ান্ত করা হবে, যাতে এটি বাস্তবমুখী ও কার্যকর হয়।
ভূমি মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে সরকারি জলমহাল ব্যবস্থাপনা বিভিন্ন বিধিমালা, প্রশাসনিক আদেশ ও নীতিমালার মাধ্যমে পরিচালিত হলেও একটি পূর্ণাঙ্গ আইন না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে জটিলতা তৈরি হয়।
নতুন আইন প্রণয়নের মাধ্যমে জলমহাল সংরক্ষণ, ব্যবস্থাপনা এবং ব্যবহারকে একটি সমন্বিত আইনি কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশের নদী, খাল, বিল, হাওর, বাঁওড়, জলাভূমি ও অন্যান্য সরকারি জলাশয়ের বড় একটি অংশ বিভিন্ন সময়ে অবৈধ দখল, ভরাট ও দূষণের শিকার হয়েছে।
এর ফলে জলজ প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হওয়ার পাশাপাশি মাছের উৎপাদন কমে যাচ্ছে এবং পরিবেশগত ভারসাম্যও হুমকির মুখে পড়ছে।
নতুন আইনের মাধ্যমে এসব কর্মকান্ড নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
খসড়া আইনের বিধান অনুযায়ী, দেশের সব সরকারি জলমহালের একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি করা হবে।
প্রতিটি জলমহালের আয়তন, অবস্থান, শ্রেণি ও ব্যবহারের ধরন নিবন্ধিত থাকবে। এতে জলমহাল সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ ও নজরদারি সহজ হবে এবং দখল বা শ্রেণি পরিবর্তনের ঘটনা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
খসড়ায় জলমহালকে পরিবেশগত গুরুত্বের ভিত্তিতে শ্রেণিবিন্যাসেরও প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
কোনো জলমহাল যদি জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, মাছের প্রজনন বা পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়, তাহলে সরকার সেটিকে সংরক্ষিত জলমহাল হিসেবে ঘোষণা করতে পারবে।
সংরক্ষিত জলমহালে বিশেষ অনুমতি ছাড়া কোনো ধরনের উন্নয়ন কার্যক্রম বা বাণিজ্যিক ব্যবহার নিষিদ্ধ থাকবে।
আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে প্রকৃত মৎস্যজীবীদের স্বার্থ সংরক্ষণ। খসড়া অনুযায়ী, জলমহাল ইজারা প্রদানের ক্ষেত্রে নিবন্ধিত মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি ও স্থানীয় প্রকৃত জেলেদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর মাধ্যমে জলমহাল নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে।
নতুন আইন কার্যকর হলে প্রকৃত জেলেদের অধিকার নিশ্চিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
খসড়ায় জলমহাল সংরক্ষণে পরিবেশগত দায়বদ্ধতার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান জলমহালের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন, দূষণ সৃষ্টি, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস কিংবা জলজ পরিবেশের ক্ষতি করলে তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।
আইনের শাস্তি সংক্রান্ত অধ্যায়ে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অবৈধভাবে সরকারি জলমহাল দখল করলে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদ-, ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদ- অথবা উভয় দ-ে দ-িত হতে পারেন।
একইভাবে অনুমতি ছাড়া জলমহাল ভরাট, মাটি ফেলা বা এর শ্রেণি পরিবর্তনের চেষ্টা করলেও একই ধরনের শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া কোনো ব্যক্তি যদি বাঁধ, স্থাপনা বা অন্য কোনো অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে জলমহালের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত করেন, তাহলে তার বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জলমহাল থেকে অবৈধভাবে বালু, মাটি, পাথর বা অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলনকেও দ-নীয় অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
খসড়ায় বিষ প্রয়োগ, বৈদ্যুতিক ফাঁদ ব্যবহার বা অন্য কোনো পদ্ধতিতে মাছ ও জলজ প্রাণী ধ্বংসের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। এ ধরনের কর্মকান্ডের ফলে জলজ জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করা যাবে।
আইনে সরকারি নির্দেশনা অমান্য করার ক্ষেত্রেও শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। জলমহাল সংরক্ষণ বা ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত কোনো নির্দেশনা লঙ্ঘন করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কারাদন্ড বা অর্থদন্ডের মুখোমুখি হতে পারেন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গুরুতর অপরাধগুলোকে আমলযোগ্য ও অজামিনযোগ্য করার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে, যাতে অবৈধ দখলদার ও পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকা-ের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
পরিবেশবিদদের মতে, দেশের জলমহালগুলো শুধু মাছ উৎপাদনের উৎস নয়, বরং বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি ধারণ, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে এসব জলাশয় রক্ষায় একটি শক্তিশালী আইন সময়ের দাবি ছিল।
মৎস্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবিকা সরাসরি জলমহালের ওপর নির্ভরশীল। জলমহাল সংরক্ষণ এবং প্রকৃত জেলেদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে মৎস্য উৎপাদন বাড়বে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
তবে পরিবেশবিষয়ক সংগঠনগুলো বলছে, শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না, এর কার্যকর বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে। জলমহাল ইজারা প্রদান, ব্যবস্থাপনা ও তদারকিতে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে আইনের প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে।
সরকারি সূত্র জানিয়েছে, খসড়া আইনের ওপর বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিশেষজ্ঞ, পরিবেশবিদ, মৎস্যজীবী সংগঠন এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নেওয়া হচ্ছে। এসব মতামত পর্যালোচনা শেষে আইনটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে। সংকলিত।।