।।বিকে আন্তর্জাতিক ডেস্ক।।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রকে তারা একটি চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছেন। যেটি স্বাক্ষরিত হলে সাতদিনের মধ্যে তারা গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি খুলে দেবেন।
শুক্রবার ২৫ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সময় নিউইয়র্কে সাংবাদিকদের আরাঘচি বলেন ‘যদি প্রয়োজনীয় শর্ত মানা হয়’ তাহলে চুক্তিটি করা সম্ভব। আর নতুন প্রস্তাবে যা বলা হয়েছে তা জুনে হওয়া ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক চুক্তিতেই আছে বলে জানান তিনি।
বার্তাসংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ইরানের প্রস্তাবের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা বলেছেন মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর মাধ্যমে ইতিবাচক আলোচনা চলছে। যারমধ্যে পারমাণবিক ইস্যুও আছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি দখলদার ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে যৌথ হামলা চালায়। এর জবাবে ইরান ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন অবকাঠামো লক্ষ্য করে ব্যাপক পাল্টা হামলা চালায়। এরসঙ্গে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়।
হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ বন্ধে ইরানের দেওয়া শান্তি প্রস্তাবের মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রত্যাখ্যান করেছেন।
যদিও রয়টার্স তাৎক্ষণিকভাবে এ প্রতিবেদনটির সত্যতা নিশ্চিত করতে পারেনি।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে নিউইয়র্কে ইরান এ কূটনৈতিক উদ্যোগের কথা জানায়। ইরানের দাবি, কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রস্তাবটি পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাবটি গ্রহণ করা হলে সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা সম্ভব হবে।
শুক্রবার জাতিসংঘে সাংবাদিকদের ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি চুক্তিতে পৌঁছাতে এবং হরমুজ প্রণালি খুলতে আন্তরিক হয়, তাহলে প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি সম্পন্ন রয়েছে। চুক্তি হলে যুদ্ধরত পক্ষগুলো পারস্পরিকভাবে সম্মত বিষয় নিয়ে বৃহত্তর আলোচনায় বসতে পারবে বলেও জানান তিনি।
সেসব আলোচনায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিও স্থান পেতে পারে। তবে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র শান্তি প্রস্তাব গ্রহণ করলেও পারমাণবিক কর্মসূচিতে তেহরান কোনো ছাড় দেবে না। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কিংবা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে পাঠানোর অধিকার থেকেও সরে আসবে না ইরান।
আরাগচির ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের প্রস্তাবে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধের কথা রয়েছে। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ তুলে নিতে, জব্দ করা ইরানি অর্থ ছাড় করতে এবং দেশটির ওপর আরোপিত তেল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে।
এর আগে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে চলা আলোচনা নিয়ে এক মার্কিন কর্মকর্তা এগুলোকে ‘ইতিবাচক ও গঠনমূলক’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। তবে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প ইরান তার দাবিগুলো পূরণ করবে কি না, তা নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে সন্দিহান। তিনি তার সহযোগীদের বলেছেন, ইরানে আবারও বোমা হামলা চালানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে বর্তমান যুদ্ধ শুরু হয়। এরপর কয়েক দফা বিরতি ও পুনরায় হামলার মধ্য দিয়ে সংঘাত চলেছে। এতে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছে, ইরানের প্রচলিত সামরিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দেশটির দুর্বল অর্থনীতি আরও চাপে পড়েছে।
যুদ্ধের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে পুরো অঞ্চলে। ইরান ও তার মিত্ররা পাল্টা হামলা চালিয়েছে। ওমানের সঙ্গে মিলে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণে থাকা ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতিরাও সৌদি আরবের স্বার্থে হামলা চালিয়ে আসছে। ইরানপন্থী ইরাকি মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে সৌদি তেল সরবরাহের একটি পাইপলাইনে হামলার অভিযোগও উঠেছে। অন্যদিকে লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ ইসরায়েলি বাহিনীর সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়েছে।
এদিকে হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করতে ইরান ও ওমানের মধ্যে হওয়া সমঝোতার বিষয়ে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহানকে অবহিত করেছেন আরাগচি। শনিবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ তথ্য জানিয়েছে।
একই সময়ে সৌদি আরবের ওপর হুতি হামলাও অব্যাহত রয়েছে। শনিবার সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, হুতিদের উৎক্ষেপণ করা দুটি ড্রোন, যা রাজধানী রিয়াদের দিকে যাচ্ছিল, এবং খামিস মুশাইতের দিকে ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে।
জুলাইয়ে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণার পর থেকে হুতিরা দেশটির ওপর হামলা চালিয়ে আসছে। সৌদি শহর, জ্বালানি অবকাঠামো ও নৌপথ এসব হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। এতে বৈশ্বিক তেল সরবরাহের ওপর নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির বিকল্প হিসেবে উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ পথ লোহিত সাগরীয় নৌপথও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা জোরদারে তুরস্ক ও পাকিস্তানও সহযোগিতা বাড়াচ্ছে। শুক্রবার রিয়াদে দেশ দুটির প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা সৌদি কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিরাপত্তা পরিস্থিতি, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, সামরিক সমন্বয় এবং বাহিনীগুলোর সমন্বিত কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা করেন।