গণভোট ও জুলাই সনদের (জুলাই চেতনা)-এর এখন আর কোন সাংবিধানিক ও আইনগত ভিত্তি নেই। সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদের আলোকে গণভোট অধ্যাদেশ-২০২৫ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম বৈঠকে উত্থাপিত না হওয়ায় এবং জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ জারী করার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির না থাকায়- এদুটি আইনের এখন আর কোন কার্যাকারিতা নেই এবং এদুটির অধিনে গৃহিত যাবতিয় কার্যক্রম অবৈধ ও অসাংবিধানিক হয়েগেছে। এগুলো নিয়ে জাতীয় সংসদের বৈঠক এবং অন্যত্র আলাপ আলোচনা, কথাবার্তা, বক্তৃতা-বিবৃতি হবে নিরর্থক, ভিত্তিহীন, অর্থের অপচয় এবং ক্ষেত্র বিষেশে অপরাধের শামিল।
২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের কার্যক্রম পরিচালনায় প্রতি মিনিটে গড়ে প্রায় ২ লাখ ৭২ হাজার ৩৬৪ টাকা খরচ হয়। । ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (TIB) এবং সংসদ সচিবালয়ের বিভিন্ন সূচক ও তথ্য বিশ্লেষণ করে এই তথ্য জানা গেছে।
প্রসংগ, গণভোট অধ্যাদেশ-২০২৫:
প্রথমত বাংদেশের সংবিধানে গণভোটের কোন বিধান নেই। রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ দিয়ে সংবিধান বহিরভূত কোন বিষয় কোন অধ্যাদেশে যুক্ত করতে পারবেন না।
দিত্বীয়ত রাষ্ট্রপতি ”বিষেশ উদ্দেশ্যে” সংবিধান বহিরভূত কোন অধ্যাদেশ জারী করলেও ”বিষেশ উদ্দেশ্য” সাধিত হওয়ার পর ঐ অধ্যাদেশের আর কার্যকারিতা থাকে না। বিষেশ উদ্দেশ্যে প্রণিত (গণভোট) অধ্যাদেশ দিয়ে ২য় কোন গণভোটও অনুষ্ঠান সম্ভব নয়। গণভোট অধ্যাদেশ-২০২৫ যদি সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম বৈঠকে উত্থাপন করে পরবর্তি ৩০দিনের মধ্যে বিল আকারে (আইনের ক্ষসরা) সংসদে পাশ করা হতো তাহলেও গণভোট আইন-২০২৬ একটি বৈধ আইন হিসাবে বিবেচিত হতো- কিন্তু কার্যকরি আইন হিসেবে নয়। কারণ ”বিশেষ উদ্দেশ্যেই” অধ্যাদেশটি জারি কয়ায় এবং এ অধ্যাদেশের অধীনে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়ায় এটি দেশের বৈধ আইন হিসেবে বিবেচিত হবে কিন্তু আর কার্যকর আইন হিসেবে বিবেচিত হবে না।
অন্যদিকে অধ্যাদেশটি জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম বৈঠকে উত্থাপিত না হওয়ায় এটি এখন আর বৈধ ও কার্যকরি আইন হিসেবেও বিবেচিত হবে না। বৈধতা ও কার্যকারিতা দুটিই হারিছে। ফলে ২০২৬ সালের অনুষ্ঠিত গণভোট ও এর ফলাফল অটোমেটিক বিলুপ্ত হয়েগেছে এবং ইতিহাসের অতল গহঃবরে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। এটি এখন জাতীর স্মুতিথেকেও মুছে যাবে।
রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ প্রণয়ণের-ক্ষমতা, সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯৩।
(১) [সংসদ ভাঙ্গিয়া যাওয়া অবস্থায় অথবা উহার অধিবেশনকাল ব্যতীত] কোন সময়ে রাষ্ট্রপতির নিকট আশু ব্যবস্থাগ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি বিদ্যমান রহিয়াছে বলিয়া সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হইলে তিনি উক্ত পরিস্থিতিতে যেরূপ প্রয়োজনীয় বলিয়া মনে করিবেন, সেইরূপ অধ্যাদেশ প্রণয়ন ও জারী করিতে পারিবেন এবং জারী হইবার সময় হইতে অনুরূপভাবে প্রণীত অধ্যাদেশ সংসদের আইনের ন্যায় ক্ষমতাসম্পন্ন হইবে:
তবে শর্ত থাকে যে, এই দফার অধীন কোন অধ্যাদেশে এমন কোন বিধান করা হইবে না,
(ক) যাহা এই সংবিধানের অধীন সংসদের আইন-দ্বারা আইনসঙ্গতভাবে করা যায় না;
(খ) যাহাতে এই সংবিধানের কোন বিধান পরিবর্তিত বা রহিত হইয়া যায়; অথবা
(গ) যাহার দ্বারা পূর্বে প্রণীত কোন অধ্যাদেশের যে কোন বিধানকে অব্যাহতভাবে বলবৎ করা যায়।
(২) এই অনুচ্ছেদের (১) *দফার অধীন প্রণীত কোন অধ্যাদেশ জারী হইবার পর অনুষ্ঠিত সংসদের প্রথম বৈঠকে তাহা উপস্থাপিত হইবে* এবং ইতঃপূর্বে বাতিল না হইয়া থাকিলে অধ্যাদেশটি অনুরূপভাবে উপস্থাপনের পর ত্রিশ দিন অতিবাহিত হইলে কিংবা অনুরূপ মেয়াদ উত্তীর্ণ হইবার পূর্বে তাহা অননুমোদন করিয়া সংসদে প্রস্তাব গৃহীত হইলে অধ্যাদেশটির কার্যকরতা লোপ পাইবে।
(৩) … আলোচ্যক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়
(৪) … আলোচ্যক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়
অতএব, গণভোটের চেপ্টার ক্লোজড।।। – এই অধ্যাদেশের অধীনে কৃতকর্মের দায়মুক্তিরও এখন আর কোন সুযোগ নেই।
প্রসংগ, জুলাই সনদ:
একটি রাষ্ট্র গঠিত হওয়ার পরথেকে সংবিধান প্রণয়ন ও কর্যকর হওয়ার দিন পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির প্রেসিডেন্সিয়াল ওয়ার্ডার (আইন) জারী করার ক্ষমতা থাকে। বাংলাদেশের সংবিধান কার্যকর হওয়ার দিন পর্যন্ত বাংদেশের রাষ্ট্রপতিরও সে ক্ষমতা ছিল। সংবিধানের ১৫২ (১) অনুচ্ছেদে আইন-এর সংগায় বর্ণিত ”আদেশ” শব্দদ্বারা প্রসিডেন্টের নামে গৃহিত (by order of the president) গেজেটে প্রকাশিত যাবতিয় সরকারী কার্যক্রমকে বুঝানো হয়েছে- প্রেসিডেন্সিয়াল ওয়ার্ডারকে নয়।
কারণ রাষ্ট্রপতিত্ব সংবিধান অনুজায়ী এই ধরণের ওয়ার্ডার জারীর ক্ষমতা সংবিধানে রাখা হয়নি। কিন্তু তার পরও তিনি “জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫” জারী করেছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী জনাব সালাউদ্দিন আহমদ এমপি বিষয়টি নিয়ে টেলিফোনে আলাপ চারিতায় সাংবিধানিক এখতিয়ার না থাকা সত্যেও তিনি কি করে “জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫” জারী করলেন জানতে চাইলে রাষ্ট্রপতি তাকে বলেছিলেন “আমিতো জারী করিনাই, আমাকে দিয়ে জারী করানো হয়েছে” রাষ্ট্রপতির এই উত্তরে এটি সুস্পষ্টভাবে প্রতিয়মান হয়েছে যে, কোন ব্যক্তি বা মহল ভয়-ভীতি দেখিয়ে তাকে দিয়ে এআদেশটি জারী করিয়ে নিয়েছে।
রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন এখন আর রাষ্ট্রপতি পদে নেই, তাকে অবশ্যই বলতে হবে “রাষ্ট্রপতির চেয়েও ক্ষমতাধর ব্যক্তি বা মহল আর কে ছিল?”
সংবিধান অনুজায়ী জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ জারী করার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির ছিল না। এবং তিনি স্বেচ্ছায়-স্বজ্ঞানে এতে সই করেন নি। এটি চন্দ্র ও সূর্যের মত প্রমাণিত ও দিব ও রাত্রির মত সুস্পষ্ট।
আতএব, জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ শুরুতেই একটি অসাংবিধানিক ও বেআইনি আইন। যার কার্যকাতি ও বৈধতা নেই। এধরণের কার্যক্রমকে ইংরেজীতে Void Definition (অকার্যকর আইন) বলে। ফলে এটিও সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম বৈঠকে উত্থাপিত না হওয়ায় এটি সংসদের অনুমোদিত আইন নয়। ফলে এই আইনের অধীনে ইতিপূর্বে গৃহিত যাবতিয় কার্যক্রম (২য় শপথ গ্রহন ও অর্থ ব্যায় সহ) অসাংবিধানিক, বেআইনি ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।
জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫
[আমার এই বক্তব্যের সাথে দ্বিমত পোষণ করার অধিকার সবার রয়েছে।]