।।বিকে আন্তর্জাতিক ডেস্ক।।
গাজায় চলমান গণহত্যা, লাখো ফিলিস্তিনির বাস্তুচ্যুতি, ইরানের সাথে যুদ্ধ, এবং নিজের বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্যেই আজ ইসরায়েলে পার্লামেন্ট (নেসেট) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
মঙ্গলবার স্থানীয় সময় সকাল ৭টায় (বাংলাদেশ সময় বেলা ১১টা) ভোটগ্রহণ শুরু হবে এবং চলবে রাত ১০টা (বাংলাদেশ সময় রাত ২টা) পর্যন্ত।
ইসরায়েলের প্রায় ৭৩ লাখ ভোটার আজ নেসেটের ১২০টি আসনের জন্য ভোট দিচ্ছেন। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৬১টি আসন। নিয়ম অনুযায়ী, ভোটাররা সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে নয়, রাজনৈতিক দলগুলোকে ভোট দেন এবং নেসেটে জায়গা পেতে একটি দলকে ন্যূনতম ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ ভোট পেতে হয়।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু তাঁর দল ‘লিকুদ’ এবং কট্টর ডানপন্থী ও উগ্র ধর্মীয় দলগুলোর (জিউইশ পাওয়ার, রিলিজিয়াস জায়োনিজম, শাস প্রভৃতি) সমন্বয়ে গঠিত শিবিরের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। অন্যদিকে ‘ইয়াশার’, ‘টুগেদার’, ‘ইসরায়েল বেইতেনু’ ও ‘ডেমোক্র্যাটস’দের নিয়ে গঠিত বিরোধী শিবিরের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকট, সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের নাম আলোচনায় রয়েছে।
দেশটির সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে এই নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এবারের নির্বাচন আসলে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সামনে টিকে থাকার লড়াই।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ভয়াবহ হামলা ঠেকাতে ব্যর্থতা, গাজায় নিষ্ঠুর ও দীর্ঘ সামরিক অভিযান পরিচালনা করা, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতার প্রেক্ষাপটে ভোটারদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ তাকে বহু আগেই বিচারের কাঠগড়ায় তুলেছেন। এই অংশটি যদি কোনো কারণে সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়, তাহলে আপাতভাবে বলা যায় যে এই নির্বাচনের মধ্যে দিয়েই নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শেষ হবে।
তবে এটাও অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে ১৯ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা এই ঝানু ইসরায়েলি রাজনীতিবিদ রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকার ক্ষেত্রে অত্যন্ত দক্ষ। দেশটিতে জাতীয়তাবাদী রাজনীতি ক্রমশ শক্তিশালী হয়েছে এবং নির্বাচনের ফলাফল যদি তার পক্ষে পুরোপুরি না-ও যায়, তাহলেও ইসরায়েলের খণ্ডিত রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সরকার গঠনের জন্য তিনিই সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পারেন।
এবারের নির্বাচনে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ইসরায়েলের সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট। সাম্প্রতিক বিভিন্ন জনমত জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ভোটারদের কাছে গ্রহনযোগ্যতার নিরিখে নেতানিয়াহু এবং আইজেনকোট প্রায় সমানে সমান অবস্থানে রয়েছেন।
ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইয়াইর লাপিদ ও নাফতালি বেনেটের সঙ্গে জোট বেঁধেছেন আইজেনকোট এবং জনমত জরিপ বলছে, নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ও তাদের ডানপন্থী মিত্রদের সঙ্গে গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন জোটের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে।
সাবেক সেনাপ্রধান আইজেনকোট নিরাপত্তা ইস্যুতে কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত। তার পেছনে ইসরায়েলের ডানপন্থী ও মধ্যপন্থী—উভয় শিবিরেরই সমর্থন রয়েছে।
নেতানিয়াহু তার নির্বাচনী প্রচারণায় যুদ্ধকালীন নেতৃত্ব এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার মিত্রতার ওপর জোর দিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাকে সমর্থন জানিয়েছেন এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে ইসরায়েলের পাশে দাঁড়িয়েছেন। রোববার নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, ট্রাম্প ইরানের হুমকিকে ‘চিরতরে’ নির্মূল করতে আবারও পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত—তবে তা কেবল তখনই সম্ভব, যদি নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকেন।
অপরদিকে আইজেনকোটের অভিযোগ, নেতানিয়াহু ‘ভীতি প্রদর্শন, মিথ্যাচার ও হুমকির ওপর ভিত্তি করে’ প্রচারণা চালাচ্ছেন। তিনি আরও বলেছেন, ট্রাম্প নিশ্চয়ই ‘জনগণের দ্বারা নির্বাচিত যেকোনো নেতার সঙ্গেই পূর্ণ সহযোগিতার ভিত্তিতে’ কাজ করবেন।
জনমত জরিপে ইসরায়েলের উগ্র ডানপন্থি নেতা ইতামার বেন গিভরের রাজনৈতিক দল জিউইশ পাওয়ারের জনপ্রিয়তা বাড়তে দেখা গেছে। বিভিন্ন জরিপের ফলাফল বলছে, নেতানিয়াহু যদি জয়ী হলেও তার দল লিকুদ পার্টি এককভাবে সরকার গঠন করতে পারবে না। সরকার গঠনের জন্য তাকে নির্ভর করতে হবে দুই কট্টর ডানপন্থি নেতা ইতামার বেন-গভির ও বেজালেল স্মোৎরিচের ওপর। ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগে পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে এ দুই নেতার ওপর।
তবে জরিপ এ-ও বলছে যে নেতানিয়াহু বা আইজেনকোট—কারোরই ক্ষমতায় যাওয়ার কোনো সুনিশ্চিত পথ নেই। ১২০ আসনের পার্লামেন্টে যদি কেউই জোট সরকার গঠন করতে না পারেন, সেক্ষেত্রে আগামী বছর নতুন নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহু তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে ক্ষমতায় থেকে যেতে পারেন।