।।বিকে রিপোর্ট।।
চট্টগ্রামের বহুল আলোচিত আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ হত্যা মামলায় ইসকনের সাবেক সংগঠক চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীসহ ৩৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছেন আদালত। একইসঙ্গে আদালত রাষ্ট্রপক্ষকে সাক্ষীদের পর্যায়ক্রমে হাজির করে সাক্ষ্যগ্রহণেরও আদেশ দিয়েছেন।
সোমবার ১৯ জানুয়ারি সকালে হাজতে থাকা চিন্ময়সহ ২৩ জনের উপস্থিতিতে চট্টগ্রাম বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. জাহিদুল হক মোট ৩৯ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আদেশ দেন।
এর মধ্য দিয়ে চাঞ্চল্যকর আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ হত্যা মামলাটির বিচার কার্যক্রম শুরু হল। একইসঙ্গে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আকস্মিকভাবে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের অধিকার আদায়ের আন্দোলন শুরু করে লাইমলাইটে আসা চিন্ময় প্রথম কোনো মামলার বিচারের মুখোমুখি হচ্ছেন।
এদিন চিন্ময় দাসসহ মামলাটিতে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে থাকা আসামিদের কড়া নিরাপত্তার মধ্যে আদালতে হাজির করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করে চট্টগ্রাম আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট রায়হানুল ওয়াজেদ চৌধুরী বলেন, গত ১৪ জানুয়ারি বিচারিক আদালতে মামলার প্রথম ধার্য তারিখ ছিল।
এর আগে, সকালে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে চিন্ময়সহ ২৩ আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে পুলিশ, সেনাবাহিনী ও বিজিবি মিলিয়ে শতাধিক সদস্য আদালত প্রাঙ্গণে মোতায়েন করা হয়।
এদিন আসামিদের উপস্থিতি ও চার্জগঠনের জন্য দিন নির্ধারিত ছিল। যেহেতু মামলার প্রথম তারিখ, তাই নথিপত্র পর্যালোচনা করা হয়েছিল। সব আসামির উপস্থিতিতে ১৯ জানুয়ারি চার্জগঠনের তারিখ নির্ধারণ করেন আদালত। নির্ধারিত তারিখে শুনানি শেষে আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের নির্দেশ দেন।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের ২৬ নভেম্বর রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীর জামিন আবেদন নামঞ্জুর করা হয়। আদেশের পর তিনি দীর্ঘ সময় এজলাসে অবস্থান করেন এবং পরে অনুসারীদের দ্বারা বেষ্টিত অবস্থায় আদালত ভবনের সামনে থাকা প্রিজন ভ্যানে প্রায় তিন ঘণ্টা অবস্থান করেন। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত তার অনুসারী ও সমর্থকদের প্রতিশোধমূলক সহিংসতায় উসকানি দেওয়া হয়। এর ফলে আদালত প্রাঙ্গণ ও আশপাশের এলাকায় ব্যাপক বিশৃঙ্খলা, ভাঙচুর ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। এ সময় কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা চালানো হয় এবং আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়ার অপচেষ্টার ঘটনাও ঘটে।
একই অপরাধী উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে পরবর্তীতে চট্টগ্রাম আদালতের প্রবেশপথে আইনজীবী আলিফের ওপর অতর্কিত হামলা চালানো হয়। ধারালো অস্ত্র, লাঠি, রড ও পাথর দিয়ে তার শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নির্মমভাবে আঘাত করা হয়। ভুক্তভোগীর ঘাড়ে ধারালো অস্ত্রের দুটি গভীর কোপসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে মোট ২৬টি আঘাত করা হয়, পুরো শরীরে কালশিটে দাগ সৃষ্টি করা হয় এবং একটি পা ভেঙে দেওয়া হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
মামলার তদন্তকালে ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীদের জবানবন্দি, জব্দকৃত আলামত, সুরতহাল প্রতিবেদন, ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক প্রতিবেদন এবং আসামিদের ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিসহ একাধিক অকাট্য প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে। এ ঘটনায় মোট ৩৯ জনকে আসামি করা হয়েছে।
চিন্ময় বাদে বাকি আসামিরা হলেন- চন্দন দাস মেথর, রিপন দাস, রাজীব ভট্টাচার্য্য, শুভ কান্তি দাস, আমান দাস, বুঞ্জা, রনব, বিধান, বিকাশ, রমিত প্রকাশ দাস, রুমিত দাস, নয়ন দাস, ওমকার দাস, বিশাল, লালা দাস, সামীর, সোহেল দাশ রানা, শিব কুমার, বিগলাল, পরাশ, গণেশ, ওম দাস, পপি, অজয়, দেবীচরণ, দেব, জয়, লালা মেথর, দুর্লভ দাস, সুমিত দাস, সনু দাস, সকু দাস, ভাজন, আশিক, শাহিত, শিবা দাস, দ্বীপ দাস ও সুকান্ত দত্ত।
মামলার ৩৯ জন আসামির মধ্যে ১৬ জন এখনও পলাতক আছেন। তাদের বিরুদ্ধে আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা হারি করা আছে।
এর আগে ২০২৪ সালের ২৯ নভেম্বর দিবাগত রাতে নগরের কোতোয়ালি থানায় ভুক্তভোগী আইনজীবী সাইফুলের বাবা জামাল উদ্দিন বাদী হয়ে হত্যা মামলাটি করেন। এতে এজাহারে ৩১ জনের নাম উল্লেখ করা হয়।
২০২৫ সালের ১ জুন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তৎকালীন কোতোয়ালী জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার মাহফুজুর রহমান আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। এতে তদন্তকালে এজাহারনামীয় গগন দাশ, বিশাল দাশ ও রাজকাপুর মেথরের সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় তাদের অব্যাহতির আবেদন করা হয়। একই সঙ্গে নতুন করে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসসহ আরও ১০ জনকে অন্তর্ভুক্ত করে আসামির সংখ্যা বাড়ানো হয়। পরে গত বছরের ২৫ আগস্ট চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এস এম আলাউদ্দিন মাহমুদের আদালত চার্জশিটের গ্রহণযোগ্যতার শুনানি শেষে মোট ৩৯ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট গ্রহণ করেন।