।।বিকে আন্তর্জাতকি ডেস্ক।।
স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ছিটমহল সেউতায় আকস্মিক বন্যার মতো অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ঢল নেমেছে।
শুক্রবার ৩১ জুলাই মতো প্রায় ৫০ হাজারেরও বেশি অভিবাসনপ্রত্যাশী এসেছিলেন, তাদের মধ্যে থেকে এ পর্যন্ত কমপক্ষে ৫৭ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
এই মৃতদের অনেকেই মরক্কোর ফনিদেক থেকে ঝুঁকি নিয়ে সাঁতরে পাড়ি দেওয়ার সময় ডুবে গেছেন। এছাড়া পদদলিত হয়েও মারা গেছেন অনেকে। ভবিষ্যতে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বলছে, অল্প সময়ের মধ্যে বিপুলসংখ্যক মানুষের আগমনে সেউতার আশ্রয়কেন্দ্র ও প্রশাসনিক সক্ষমতার ওপর তীব্র চাপ তৈরি হয়েছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, সেউতার আঞ্চলিক সরকারের প্রধান জুয়ান জেসুস ভিভাস স্পেন সরকারকে দ্রুত হস্তক্ষেপ করার আহ্বান জানিয়েছেন। পরিস্থিতি পর্যালোচনায় শুক্রবার স্পেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফার্নান্দো গ্রান্দে-মারলাস্কার সেউতা সফরের কথা রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, অনেক অভিবাসনপ্রত্যাশী সাঁতরে কিংবা ইনফ্লেটেবল রিংসহ ভাসমান সরঞ্জাম ব্যবহার করে সেউতার উপকূলে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। আবার কেউ কেউ সীমান্তঘেরা একটি প্রবেশপথ দিয়ে দৌড়ে ভেতরে ঢুকে পড়ছেন।
অভিবাসনপ্রত্যাশীরা মরক্কোতে ফিরে যাওয়া শুরু করেছেন বলেও জানা গেছে। এক বিবৃতেতে স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ৪৮ হাজার ৩০০ অভিবাসনপ্রত্যাশী ফিরে গেছে। বাকিরাও শিগগিরই ফিরে যাবে।
এদিকে সাঁতরে স্পেনে যেতে ইচ্ছুক অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ঢল থামাতে স্পেন-মরক্কো সাগর সীমান্তের সৈকত জুড়ে সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করেছে মরক্কো। সেউতা সীমান্তে সামরিক বাহিনী মোতায়েন করেছে স্পেনও। দুই সীমান্তে সামরিক বাহিনীর তৎপরতার কারণে গতকাল বিকেল থেকেই সেউতায় অভিবাসনপ্রত্যাশীদের প্রবেশ বন্ধ হয়েছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
সেউতা ও মেলিলা— ভূমধ্যসাগরের তীরে অবস্থিত স্পেনের এই দুটি ছিটমহল শহর মিলে আফ্রিকার সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একমাত্র স্থলসংযোগ তৈরি করেছে। ইউরোপে পাড়ি জমাতে চাওয়া মানুষেরা প্রায়ই এই দুই সীমান্ত দিয়ে দলে দলে ঢোকার চেষ্টা করেন।
সেউতায় পৌঁছাতে অভিবাসনপ্রত্যাশীরা অনেক সময় মরক্কোর ফনিদেক শহর থেকে সাঁতার কাটেন। স্প্যানিশ ভূখণ্ডে পৌঁছাতে তাঁদের প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। আবার অনেকেই কাছের বেলইউনেশ শহর দিয়েও পার হওয়ার চেষ্টা করেন। কারণ, ওই পথে দূরত্ব কিছুটা কম।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ শুক্রবার সেউতা সফর করেছেন। সেখানে তিনি বলেছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় তার সরকার সব ধরনের প্রস্তুতি ও সক্ষমতা কাজে লাগাচ্ছে। সীমান্ত পার হওয়ার এই ঘটনাকে স্পেনের ভূখণ্ডগত সার্বভৌমত্বের ‘লঙ্ঘন’ বলে মন্তব্য করেছেন সানচেজ।
আকস্মিক সীমান্ত পার হওয়ার এই হিড়িকের সঙ্গে স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক একটি রায়ের যোগসূত্র দেখছে সেউতা কর্তৃপক্ষ। চলতি মাসের শুরুতে দেওয়া ওই রায়ে বলা হয়েছিল, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া সমুদ্রপথে আসা অভিবাসীদের কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে ফেরত পাঠাতে পারবে না। তবে সীমান্ত বেড়া টপকে বা স্থলপথে স্পেনে প্রবেশকারীদের ক্ষেত্রে এই রায় প্রযোজ্য নয়।
শুক্রবার সানচেজ বলেন, আদালতের রায় নিয়ে গুজব ছড়িয়েছে মানবপাচারকারী মাফিয়ারা। এ কারণেই অভিবাসীদের এমন ঢল নেমেছে। তিনি আরও বলেন, ‘মরক্কোর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে আমরা জানতে পেরেছি, মানব পাচারকারী চক্রগুলো সুপ্রিম কোর্টের ওই রায়কে নিজেদের সুবিধামতো ব্যাখ্যা করেছে। গত কয়েক ঘণ্টায় সেই মনগড়া ব্যাখ্যা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে।
স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি, মানবপাচারকারী চক্রগুলো ওই রায়ের সুযোগ নিয়ে বিশেষ করে তরুণ নথিবিহীন অভিবাসীদের সেউতায় যেতে উৎসাহিত করছে।
মন্ত্রণালয় বলছে, অভিবাসনসহ সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় মরক্কোর সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা রয়েছে। দুই দেশই অবৈধভাবে সেউতায় প্রবেশকারীদের দ্রুত ফেরত পাঠানোর বিষয়ে সমন্বিত পদক্ষেপে সম্মত হয়েছে।
এদিকে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি স্পেনকে সাময়িকভাবে শেনজেন অঞ্চল থেকে বহিষ্কারের আহ্বান জানিয়েছেন।
এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, সেউতার সাম্প্রতিক দৃশ্যগুলো প্রমাণ করে যে অনিয়ন্ত্রিত অবৈধ অভিবাসন ইউরোপের সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।