Breaking News:


ইরানের তেল স্থাপনায় হামলাঃ তেহরানে সড়কের পাশে ‘আগুনের নদী

  • ১১:৩১ এএম, সোমবার, ৯ মার্চ, ২০২৬

।।বিকে আন্তর্জাতিক ডেস্ক।।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এবার ইরানের তেল স্থাপনাকে নিশানা করেছে। তেলের ডিপো ও শোধনাগারে হামলার পর ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় রাজধানী তেহরান ও এর পশ্চিমে কয়েকটি অঞ্চলে ।

রবিবার ৮ মার্চ যুদ্ধের নবম দিনে দেশটির তেল স্থাপনায় দফায় দফায় হামলায় হয়েছে। নালায় ছড়িয়ে পড়া তেল থেকে সড়কের পাশে ‘আগুনের নদী’ তৈরি হয়। হামলায় অন্তত ৪১ জন নিহত হয়েছেন।

তেহরান ও এর পশ্চিমে আলবোরজ প্রদেশের কারাজ শহরে কয়েকটি তেল স্থাপনায় গতকাল হামলা হয়েছে বলে জানায় ইরানের তেল মন্ত্রণালয়। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলার পরমুহূর্তেই কুণ্ডলী পাকানো ভয়াবহ আগুনে দিনের মতো আলোর সৃষ্টি হয়।

যুদ্ধের মধ্যেই ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতোবা খামেনি

গতকালের ওই হামলার জবাবে সৌদি আরব, কুয়েত ও জর্ডানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে ইরান। সৌদি আরবের আল-খার্জ গভর্নরেটের একটি কম্পাউন্ডে ‘ক্ষেপণাস্ত্র’ আঘাত হানলে এক বাংলাদেশি ও এক ভারতীয় নিহত হন।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলার শুরুতে নিশানা ছিল মূলত তেহরানের সামরিক স্থাপনা ও শীর্ষস্থানীয় নেতারা। যদিও তারা বেসামরিক স্থাপনায়ও হামলা চালিয়েছে। গতকাল তাদের হামলার নিশানা করা হয় ইরানের তেল তথা জ্বালানি স্থাপনাকে।

এর জবাবে কুয়েতে বিমানবন্দর, জ্বালানি ডিপো, নিরাপত্তা ভবনে হামলা করেছে ইরান ।এসব হামলায় দুজন নিহত হয়েছেন। সার্বিক  পরিস্থিতিতে তেল উৎপাদন কমানোর ঘোষণা দিয়েছে কুয়েত। গতকাল ইসরায়েলের তেল আবিব, হাইফাসহ কয়েকটি শহরে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় ইরান। এতে ইসরায়েলে তিনজন আহত হয়েছেন। বাহরাইনে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভূপাতিত করার সময় টুকরা অংশ পড়ে আহত হয়েছেন তিনজন। ইরাকের এরবিলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতেও হামলা হয়েছে।

ইরানের পাশাপাশি লেবাননেও হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল। গতকাল লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সঙ্গে লড়াইয়ে দুই সেনা নিহত হয়েছেন। আর লেবাননে ইসরায়েলের নির্বিচার হামলায় নিহত বেড়ে ৩৯৪ জনে দাঁড়িয়েছে।

ইরানে বেসামরিক স্থাপনায় নজিরবিহীন হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, একটা সময় আসবে যখন ইরানে ‘আত্মসমর্পণ করছি’ বলার মতো কোনো লোক থাকবে না। তবে তাঁর এ হুঁশিয়ারির মধ্যেই নতুন সর্বোচ্চ নেতা বেছে নেওয়ার কথা জানিয়েছে ইরানের বিশেষজ্ঞ পর্ষদ (অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্ট)। যদিও গতকাল শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত নাম ঘোষণা দেওয়া হয়নি। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, হামলার বিরুদ্ধে দৃঢ় প্রতিরোধ গড়ে তুলবে ইরান। এসব হামলার কঠোর জবাব দেবে তাঁর দেশ।

তেহরানের শাহরান তেলের ডিপোতে হামলার পরের দৃশ্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ছড়িয়ে পড়েছে। ওই ভিডিওতে দেখা যায়, বিধ্বস্ত ডিপোর তেল নালা দিয়ে প্রবাহিত হতে শুরু করলে সড়কের পাশে ‘আগুনের নদীর’ মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

এদিকে তেলের স্থাপনায় হামলার ফলে বিষাক্ত বৃষ্টি ঝরার বিষয়ে সতর্ক করেছে ইরানি রেড ক্রিসেন্ট। এটি ত্বক ও ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এ ধরনের বৃষ্টির সময় লোকজনকে বাসাবাড়িতে অবস্থান করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

তেল স্থাপনায় হামলার পর নাগরিকদের তেল নেওয়ার সীমা কমিয়ে দিয়েছে তেহরানের প্রশাসন। শহরের গভর্নর মোহাম্মদ সাদেক মোতামেদিয়ান বলেছেন, একজন ব্যক্তি দিনে ২০ লিটার তেল নিতে পারবেন। আগে দিনে ৩০ লিটার নেওয়া যেত। তবে জনগণকে উদ্বিগ্ন না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে গভর্নর বলেন, শিগগিরই জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।

তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফুয়াদ ইজাদি আল-জাজিরাকে বলেছেন, ইরানের জ্বালানি স্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্প খাত লক্ষ্য করে ইসরায়েলের হামলা এ যুদ্ধের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মোড়। তেহরানসহ ইরানের শহরগুলো এই প্রথম এ ধরনের হামলা দেখেছে। তিনি আরও বলেন, ‘এখন স্থানীয় সময় প্রায় দুপুর, কিন্তু ধোঁয়ার কারণে মনে হচ্ছে যেন রাত নেমে এসেছে। আমরা সূর্য দেখতে পাচ্ছি না।’

মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট গতকাল সিএনএনকে বলেন, তেল বা প্রাকৃতিক গ্যাস শিল্পে হামলা চালানো কোনো পরিকল্পনা ওয়াশিংটনের নেই। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র নয়, ইরানের তেল স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। এদিকে ইসরায়েলের সেনাবাহিনী বলেছে, তেহরানে ইরানের মহাকাশ সংস্থা এবং দেশটির ৫০টি গোলাবারুদ গুদামে হামলা চালানো হয়েছে। হামলা হয়েছে কোম শহরেও।

ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র এফি ডেফরিন গতকাল বলেন, ইসরায়েলি বাহিনী এখন পর্যন্ত ইরানে প্রায় ৩ হাজার ৪০০টি হামলা চালিয়েছে এবং দেশটির ১৫০টির বেশি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা অকেজো করে দিয়েছে।

ইরানের মূল লক্ষ্যবস্তু যুক্তরাষ্ট্র

ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) গতকাল ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রর বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে ২৭তম দফায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা করেছে। টেলিভিশন দেওয়া বক্তব্যে আইআরজিসির মুখপাত্র আলী মোহাম্মদ নায়েনি বলেন, ইরান এখন পর্যন্ত যে হামলা চালিয়েছে, তার ৬০ শতাংশ এই অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি এবং তাদের ‘কৌশলগত স্বার্থ’ নিশানা করে। বাকি ৪০ শতাংশে নিশানা ছিল ইসরায়েলি শাসকগোষ্ঠীর বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তু।

আইআরজিসির মুখপাত্র আরও বলেন, ‘আমরা এ যুদ্ধে আমেরিকানদের প্রধান শত্রু মনে করি এবং এ কারণেই তাদের শাস্তি দেওয়ার বিষয়টি আমাদের কাছে অগ্রাধিকার পাচ্ছে। আমেরিকানরা ৭০ বছর ধরে এই অঞ্চলে সামরিক ঘাঁটি তৈরি করে রেখেছে।’ আইআরজিসি আরও দাবি করেছে, তারা ২৪ ঘণ্টায় যুক্তরাষ্ট্রের ‘থাড’ ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত চারটি রাডার ধ্বংস করেছে। এ ছাড়া জ্বালানি স্থাপনায় হামলা অব্যাহত থাকলে এ অঞ্চলে থাকা মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট জ্বালানি স্থাপনায় পাল্টা হামলার হুমকি দিয়েছে আইআরজিসি। এই বাহিনীর মুখপাত্র বলেন, ‘তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ২০০ ডলার দেখতে চাইলে এই খেলা খেলতে পারো।’

সোস্যাল মিডিয়াতে নিউজটি শেয়ার করুন

আরও পড়ুন
© All rights reserved © 2025. Bangalir Khobor
Developed by Tiger Infotech