।।বিকে ডেস্ক।।
গাজীপুরের ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ডুয়েট) নতুন উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের দুই পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে উভয় পক্ষের ইট-পাটকেলের আঘাতে পুলিশ, ইউএনওসহ ১৫জন আহত হয়েছেন। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে টিয়ার শেল নিক্ষেপ করেছে।
রবিবার ১৭ মে সকাল ১০টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়টির মূল ফটকে এ ঘটনা ঘটে। এরপর থেমে থেমে সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া বিকেল ৩টা পর্যন্ত চলে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ অশান্ত ও নতুন ভিসিকে প্রত্যাখ্যান করে এমন অরাজকতা সৃষ্টি করেছে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছে জামায়াত ও শিবিরের নেতারা।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১৪ মে ডুয়েটের উপাচার্য হিসেবে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকবালকে নিয়োগ দেওয়া হয়। নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারির পর ওই দিন রাত সাড়ে নয়টা থেকে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করেন।
রবিবার চতুর্থ দিনের মতো সকাল আটটা থেকে ডুয়েট শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকেন। একপর্যায়ে নবনিযুক্ত ভিসির ক্যাম্পাসে যোগদানের খবর ছড়িয়ে পড়লে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেন। এসময় দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বেশ কয়েক রাউন্ড টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবি, দুপুরের দিকে নবনিযুক্ত ভিসির পক্ষে কিছু বহিরাগত লোক এসে ক্যাম্পাসে অবস্থান নিলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ বেঁধে যায়। দুই পক্ষের মধ্যে ব্যাপক ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা বলেন, ডুয়েট একটি বিশেষায়িত প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ায় এখানকার অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতা ভিন্ন। ডুয়েটের শিক্ষা ব্যবস্থা, শিক্ষার্থীদের বাস্তবতা ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব শিক্ষকদের অভিজ্ঞতা তুলনামূলক বেশি। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থে বহিরাগত কাউকে না এনে অভ্যন্তরীণ যোগ্য ও জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের মধ্য থেকেই উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন। ডুয়েটের শিক্ষক নেতারাও জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের মধ্য থেকে ভিসি নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন।
ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, নতুন ভিসি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকবাল দায়িত্ব নিতে সকাল ১০টার দিকে ডুয়েটে গেলে সাবেক ভিসি জয়নাল আবেদীন, রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. আবু তৈয়ব, ডুয়েট শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক খসরু মিয়া, সাধারণ সম্পাদক কাজী রফিকের উস্কানিতে শিবিরের ডুয়েট শাখার সভাপতি আব্দুল আহাদ, সাধারণ সম্পাদক তাসনীমের নেতৃত্বে শিবিরের ডুয়েট শাখার এবং পূর্ব থেকে বাইরে থেকে নিয়ে আসা শিবিরের ৩ শতাধিক নেতাকর্মী ডুয়েটের মূলফটকের সামনে জড়ো হয়ে গেটে তালা লাগিয়ে দেয়। একপর্যায়ে গেট ভেঙে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করলে শিবিরের লোকজন পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট নিক্ষেপ করতে থাকে। এতে পুলিশসহ অনেকেই আহত হয়েছেন।
তারা আরও বলেন,সাবেক ভিসি জয়নাল আবেদীনের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। তার দুর্নীতি নিয়ে বহু নিউজ ছাপা হয়েছে। নতুন ভিসি একজন যোগ্য ও মেধাবী শিক্ষক।
এ ব্যাপারে মহানগর ছাত্রদলের সভাপতি রুহানুজ্জামান শুক্কুর বলেন, ‘রোববার সকালে নতুন ভিসি ক্যাম্পাসের বাইরে একটি মাইক্রোবাসে যোগদানের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। ভিসিকে স্বাগত জানিয়ে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ ছাত্রদলের ব্যানারে মূল ফটক খুলে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করলে ছাত্রশিবিরের নেতৃত্বে তাদের ওপর হামলা চালানো হয়। এসময় বৃষ্টির মতো ভেতর থেকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে তারা। এতে শিক্ষার্থী, পুলিশসহ ১৫ জন আহত হয়েছেন। নতুন ভিসির বিরোধীতা করে তারা ক্যাম্পাসে অরাজকতা সৃষ্টির অপচেষ্টা করছে।’
তবে ছাত্রদলের দাবিকে নাকচ করে গাজীপুর মহানগর জামায়াতের নায়েবে আমির হোসেন আলী বলেন, ‘এই হামলায় ছাত্রশিবির কেন থাকবে। নতুন ভিসি নিয়োগ বাতিল চেয়ে যে আন্দোলন, এটা সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। এখানে শিবিরের কিছু নাই।’
এ ব্যাপারে ডুয়েট শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক খসরু মিয়া বলেন, ‘ডুয়েটে আজ (রোববার ) পরীক্ষা ছিল। এতে দুইশত শিক্ষার্থী অংশ নেয়। পরীক্ষার পর শিক্ষকদের সঙ্গে বসে আলাপ আলোচনা করে ক্যাম্পাসের পুরো পরিস্থিতি নতুন নিয়োগকৃত ভিসিকে জানানোর কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই বহিরাগত কিছু লোক ও আমাদের কতিপয় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ লেগে যায়। এখন আমাদের শিক্ষার্থীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। যেহেতু ভিসি, প্রো ভিসি অনুপস্থিত তাই রাতে বহিরাগতদের হামলার শঙ্কায় রয়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।’
তিনি আরও বলেন, ‘ডুয়েট শিক্ষক সমিতি রেজুলেশনে করে শিক্ষামন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয় যেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্য থেকে কাউকে ভিসি নিয়োগ দেওয়া হয়। এটা সাধারণ শিক্ষার্থীদের ও দাবি। আমরা এখনও তাদের এই দাবির পক্ষে। তবে সরকার যে নতুন ভিসি নিয়োগ দিয়েছেন আমরা সরকারের সিদ্ধান্তের বিপক্ষে না, শিক্ষক সমিতির পরবর্তী মিটিংয়ে এ ব্যাপারে রেজুলেশন করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
জিএমপি সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘ডুয়েটের ভাইস চ্যান্সেলর নিয়োগকে কেন্দ্র করে কয়েক দিন ধরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। সকালে ভিসি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করতে গেলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে একটি অংশ গেটের ভেতরে অবস্থান নিয়ে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এতে গেটের বাইরে থাকা গাজীপুর মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার তাহেরুল হক চৌহান, উর্ধ্বতন ৩ পুলিশ কর্মকর্তাসহ ৮ পুলিশ সদস্য, গাজীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাজ্জাত হোসেন ও সাধারণ ছাত্রসহ ১৪-১৫ জন আহত হয়েছে। ক্যাম্পাসের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। সূত্র- আমাদের সময়।