।।বিকে ডেস্ক।।
বাংলাদেশের ঋণমানের পূর্বাভাস ‘নেতিবাচক’ থেকে আবার ‘স্থিতিশীল’ করেছে মুডিস রেটিংস। সংস্থাটি বলেছে, রাজনৈতিক ও বৈদেশিক চাপ কমেছে। রিজার্ভ বেড়েছে। প্রবাসী আয়েও রেকর্ড হয়েছে। এসব কারণে পূর্বাভাস বদলানো হয়েছে।
তবে দেশের ব্যাংক খাতের বড় দুর্বলতা রয়েছে। সরকারের রাজস্ব আয়ও কম। রাজস্বের বড় অংশ ঋণের সুদ দিতে চলে যায়। এসব কারণে মূল ঋণমান ‘বি২’ রাখা হয়েছে।
মঙ্গলবার ১৫ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক ঋণমান যাচাইকারী সংস্থা মুডিস তাদের নতুন মূল্যায়ন প্রকাশ করে। সেখানে এ তথ্য জানা যায়।
এর আগে ২০২৪ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের ঋণমান ‘বি১’ থেকে কমিয়ে ‘বি২’ করেছিল মুডিস। পূর্বাভাসও ‘স্থিতিশীল’ থেকে ‘নেতিবাচক’ করা হয়েছিল। রাজনৈতিক ঝুঁকি ও প্রবৃদ্ধি কমার আশঙ্কায় তখন এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সংস্থাটি।
আন্তর্জাতিক ঋণমান যাচাইকারী সংস্থা মুডিস। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এই সংস্থা ব্যবসা ও আর্থিক খাতের নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তার লক্ষ্যে তথ্য ও বিশ্লেষণ দিয়ে সহায়তা করে। এটি স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদে ঝুঁকি মূল্যায়ন ও ঋণমান নির্ণয়ের কাজ করে আসছে।
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কমেছে
মূল্যায়ন প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলেছে, নির্বাচনের পর রাজনৈতিক ক্ষমতা হস্তান্তর এবং সরকারের শক্তিশালী জনসমর্থনের কারণে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় সংস্কার বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি কমেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্গঠন, আরও নমনীয় বিনিময় হার এবং রেকর্ড প্রবাসী আয়ের কারণে বাংলাদেশের বহিঃখাতের অবস্থাও উন্নত হয়েছে। প্রবাসী আয় বাড়ায় জ্বালানি আমদানির বাড়তি খরচের চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
মুডিস জানিয়েছে, আইএমএফের পরবর্তী ঋণ কর্মসূচির শর্ত নিয়ে আলোচনা চলছে। সংস্কারের গতি নিয়েও কিছু মতপার্থক্য রয়েছে। এরপরও আইএমএফ ও আন্তর্জাতিক অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ রয়েছে। এই সম্পর্ক বৈদেশিক অর্থায়ন ও সংস্কারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ নিয়ে বলেন, ‘আমি বলব, বাংলাদেশের ওপর মুডিসের আস্থা ফিরে এসেছে। এর মূল কারণ হচ্ছে আমাদের যথাযথ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা। এর মধ্যে রয়েছে আমাদের বিনিয়ন্ত্রণ পদক্ষেপ, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার উন্নয়ন, দেশের ব্যবসা খাতে ইতিবাচক প্রবণতা ও প্রবাসী আয়ের ভালো প্রবাহ।’
মন্ত্রী আরও বলেন, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীরা ফিরে এসেছেন। ব্যাংক খাতেও উন্নতি দেখা যাচ্ছে। শুধু বর্তমান পরিস্থিতি নয়, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাও মুডিস বিবেচনায় নিয়েছে।
রিজার্ভ ও প্রবাসী আয় বেড়েছে
মুডিসের হিসাবে, ২০২৪ সালের শেষে বাংলাদেশের রিজার্ভ ছিল ২ হাজার ১৪০ কোটি ডলার। ২০২৬ সালের মাঝামাঝি তা বেড়ে ৩ হাজার ২৯০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। এই অর্থ দিয়ে চার মাসের বেশি সময়ের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব।
মুডিস বলেছে, ব্যাংকের মাধ্যমে রেকর্ড প্রবাসী আয় এসেছে। বিনিময় হার আরও নমনীয় হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের আগের কিছু অসংগতিও দূর হয়েছে। এসব কারণে রিজার্ভ বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগে টাকার বিনিময় হার ধরে রাখতে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করত। এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিট হিসাবে বৈদেশিক মুদ্রা কিনছে।
তবে জ্বালানির দাম বাড়লে, প্রবাসী আয় কমলে বা গ্যাস সরবরাহে আবার সমস্যা হলে এই উন্নতি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এরপরও বাইরের অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের তুলনায় ভালো অবস্থানে রয়েছে বলে জানিয়েছে মুডিস।
এদিকে এ নিয়ে গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, দেশের মোট রিজার্ভ এখন ৩ হাজার ৬২৭ কোটি ডলার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সামগ্রিক লেনদেনের ভারসাম্যে ৬৬০ কোটি ডলার উদ্বৃত্ত হয়েছে। একই সময়ে প্রবাসী আয় এসেছে ৩ হাজার ৫৫৯ কোটি ডলার। বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে বিনিময় হারও স্থিতিশীল রয়েছে।
ধীরে বাড়বে প্রবৃদ্ধি
মুডিস বলেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল সাড়ে ৩ শতাংশ। পরের অর্থবছরে তা বেড়ে ৪ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৩ শতাংশ হতে পারে। বিনিয়োগ ও শিল্পের কার্যক্রম স্বাভাবিক হলে ২০২৭-২৮ অর্থবছর থেকে প্রবৃদ্ধি প্রায় ৪ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
মুডিস বলেছে, জ্বালানিসংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও পণ্যের সরবরাহে সমস্যা প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করবে। মূল্যস্ফীতি আপাতত প্রায় ৯ শতাংশে থাকবে। পরে তা ধীরে কমতে পারে। আর তৈরি পোশাক খাত এখনো রপ্তানির প্রধান ভিত্তি। রেকর্ড প্রবাসী আয় মানুষের ভোগ ব্যয় ধরে রাখতেও সহায়তা করছে।
বড় দুর্বলতা ব্যাংক খাত
মুডিস বলেছে, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ। ব্যাংকগুলোকে প্রয়োজনীয় মূলধন দিতে জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশের সমান অর্থ লাগতে পারে। এই অর্থ কয়েক বছর ধরে দিতে হবে। এই অর্থ দেওয়া সরকারের জন্য বড় চাপ হবে। কারণ, সরকারের রাজস্ব আয় কম। আবার ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়াও বাড়ছে। সরকার বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাতের জন্য অর্থ কমে যেতে পারে।
তবে মুডিস বলেছে, ব্যাংক খাতের প্রধান সমস্যা তারল্য নয়। মূল সমস্যা মূলধনের ঘাটতি। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত এক বছরে ব্যাংক খাতের আমানত প্রায় ১২ শতাংশ বেড়েছে। অবশ্য ব্যাংকের সম্পদের মান যাচাই, আমানত সুরক্ষা আইন এবং আইএমএফের সঙ্গে মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা তৈরির কাজ এগিয়েছে। ব্যর্থ ব্যাংকের সাবেক মালিকেরা যেন আবার মালিকানা নিতে না পারেন, সে জন্য একটি বিধানও বাতিল করা হয়েছে। সংস্থাটির মতে, ব্যাংক খাতের সমস্যা সমাধানে এখনো বিস্তারিত ও বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা নেই। এ সমস্যা কাটাতে কয়েক বছর লাগতে পারে।
রাজস্ব ও জ্বালানির ঝুঁকি
মুডিস বলেছে, ঋণমান পাওয়া দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের রাজস্ব আয় সবচেয়ে কম দেশগুলোর একটি। সরকারি ঋণ জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশ। এই ঋণ এখনো সহনীয়। তবে মোট রাজস্বের প্রায় ৩০ শতাংশ ঋণের সুদ দিতেই চলে যায়। আশঙ্কা হচ্ছে, নিয়মিত বাজেট ঘাটতি ও ব্যাংক খাতে সম্ভাব্য সহায়তার কারণে সরকারি ঋণ বাড়তে পারে। তবে সহজ শর্তে বিদেশি ঋণ পাওয়ার সুযোগ থাকায় ঋণের খরচ কিছুটা কমছে।
মুডিস বলেছে, একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে সমস্যার কারণে বিদ্যুৎ, শিল্প ও সার উৎপাদনে গ্যাসের ঘাটতি হয়েছিল। এতে দেশের জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে। এ ছাড়া স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হলে রপ্তানিতে প্রতিযোগিতা কঠিন হতে পারে। সহজ শর্তে বিদেশি অর্থ পাওয়ার সুযোগও কমতে পারে। পরিবেশ, সমাজ ও সুশাসনের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের দুর্বলতা আছে। সংস্থাটি বন্যা, দুর্বল অবকাঠামো, কম আয়, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও আইনের শাসনের সমস্যার কথা উল্লেখ করেছে। তবে গত এক দশকে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, দারিদ্র্য কমা ও মৌলিক সেবার উন্নতিকেও স্বীকার করেছে।
মুডিসের হিসাবে, ২০২৫ সালে বৈদেশিক ঋণ ছিল জিডিপির ২৪ দশমিক ৯ শতাংশ। সরকারের আর্থিক ঘাটতি ছিল জিডিপির ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। ১৯৮৩ সালের পর বাংলাদেশ কোনো বন্ড বা ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়নি।
বিদেশি ঋণসীমা বাড়ার আশা
বাংলাদেশ ব্যাংক মুডিসের এই মূল্যায়নকে স্বাগত জানিয়েছে। গতকাল এ নিয়ে এক বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, দেশের অর্থনীতিতে গতি আনতে সম্প্রতি ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা সুবিধা দেওয়া হয়েছে। খেলাপি ঋণ সহনীয় পর্যায়ে রাখতে বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে এক্সিট পলিসির সুবিধা, বন্ধ কারখানা চালু করা, ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট বা ডামা প্রণয়ন, অর্থঋণ আদালত আইন সংশোধনের উদ্যোগ এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা।
অভ্যন্তরীণ লেনদেনে স্বচ্ছতা বাড়াতে নগদ লেনদেনের বদলে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে নগদবিহীন লেনদেন উৎসাহিত করা হচ্ছে।
চলতি হিসাবের আওতাভুক্ত বৈদেশিক লেনদেনের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য সহজীকরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বৈদেশিক বাণিজ্যিক লেনদেন সহজ করতে সরবরাহব্যবস্থায় অর্থায়ন বা সাপ্লাই চেইন ফাইন্যান্স সুবিধা চালু করা হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রির পর বিনিয়োগ প্রত্যাহার করতে চাইলে ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়াই ওই অর্থ বিদেশে পাঠাতে পারবেন। এ সুযোগও সম্প্রতি দেওয়া হয়েছে।
মুডিসের ঋণমানের প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সাবেক প্রধান মুহিত রহমান। বর্তমানে তিনি ওয়ান ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। সামগ্রিক বিষয় নিয়ে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘মুডিসের রেটিংকে বিশ্বের বড় ঋণদাতারা বেশ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। আমদানি করার জন্য আমাদের বিদেশি ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ঋণসীমা প্রয়োজন হয়। মুডিসের রেটিং কমে গেলে ঋণসীমাও কমিয়ে দেওয়া হয়।’
মুহিত রহমান বলেন, পূর্বাভাস স্থিতিশীল হওয়ায় বিদেশি ব্যাংকগুলো বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর ডলারে ঋণসীমা বাড়াতে শুরু করবে। এতে ঋণপত্র খোলা সহজ হবে। ডলারের সরবরাহ বাড়লে আমদানির খরচেও প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা কর্মসূচিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন মুহিত রহমান। তিনি বলেন, এতে মূলধনি যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি বাড়বে। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়বে। বন্ধ কারখানা চালু হলে কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধিও বাড়বে। সূত্র-প্রথম আলো।