বাংলা একাডেমি সরিয়ে ফেলেছে শতাধিক বই

প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হিসাব গুনতে গুনতে অমর একুশে বইমেলার পঞ্চম দিন পার হলো। মেলায় আগত অনেক প্রকাশকের মধ্যে হতাশা আছে, আবার অনেকের মধ্যে আছে আশাবাদী মনোভাব।

এর মধ্যে রোববার বিকালের বৃষ্টি এবং মেঘাচ্ছন্ন আকাশ নগরবাসীর জন্য কিছু স্বস্তি বয়ে আনলেও বইমেলার স্টলে স্টলে ছিল আতঙ্ক। বৃষ্টির পর কাদামাটিতে পাঠকের খড়া তো হবেই, সেই সঙ্গে বই নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও থাকে। এমন ভাবনার মধ্যে স্টলে স্টলে সাজানো বই মনোযোগ দিয়ে দেখছেন একজন পাঠক।

আজিমপুরবাসী শাজাহান মিয়ার কাছে জানতে চাওয়া হলো-তিনি কী খোঁজ করছেন মেলায়। উত্তর দিতে গিয়ে তিনি পালটা প্রশ্ন ছুড়লেন-কোনো স্টলে কি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কিংবা আওয়ামী লীগ নেতাদের কোনো বই পেয়েছেন? তবে পুরো মেলা ঘুরে এ ধরনের বইয়ের খোঁজ পাওয়া যায়নি। প্রকাশকদের কাছে জানতে চাইলে অনেকেই কৌশলে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কেউ বলেন পুনর্মুদ্রণের জন্য বই প্রেসে রয়েছে আবার কেউ বলেন ভুলে স্টলে আনা হয়নি।

জানা গেছে, বাংলা একাডেমি, ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল), আগামী প্রকাশন, সময় প্রকাশন, চারুলিপি, উৎস, অন্বেষা, তাম্রলিপি, অন্য প্রকাশ, পাঞ্জেরী, কথা প্রকাশসহ প্রায় সব প্রকাশনীতেই কমবেশি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতা কিংবা বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বই প্রকাশ করেছেন। বঙ্গবন্ধুর লেখা ‘কারাগারের রোজনামচা’, ‘আমার দেখা নয়া চীন’ সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের আত্মজীবনী ‘আমার জীবননীতি আমার রাজনীতি’সহ তার জন্মশতবর্ষে শতাধিক বই প্রকাশ করে বাংলা একাডেমি। এছাড়া বঙ্গবন্ধুকে নিবেদিত কবিতা, শেখ হাসিনাকে নিবেদিত কবিতার বইও প্রকাশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে এসব বই বিক্রয়কেন্দ্রে দেখা যায়নি। এমনকি ২০২৫ সালে পুনঃপ্রকাশিত বইয়ের তালিকায়ও ওইসব বইয়ের নাম নেই।

ইউপিএল শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ প্রকাশ করেছে। বইটিও স্টলে দেখা যায়নি। আগামী প্রকাশনী থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার লেখা ‘সবুজ মাঠ পেরিয়ে’, ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’সহ অন্তত ১২টি বই প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া এইচ টি ইমামের লেখা ‘বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১’ বইটিও আগামী প্রকাশনী থেকে বের হয়েছে। এসবের একটি বইও স্টলে সাজানো নেই। সময় প্রকাশন থেকে প্রকাশিত ‘সব মনে নেই’, ‘গাঙচিল’ এই দুটি বই স্টলে দেখা যায়নি। চারুলিপি থেকে ওবায়দুল কাদেরের লেখা ‘যখন সাংবাদিক ছিলাম’ বইটি প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া শেখ হাসিনা সম্পাদিত একটি বই, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আবদুল মোমেন, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের বই প্রকাশ করেছে চারুলিপি প্রকাশন। ত্রয়ী প্রকাশনী থেকে প্রকাশ হয়েছিল শেখ ফজলুল করিম সেলিমের লেখা ‘জাতীয় সংসদে ৩২ বছর’ বই। এছাড়া তাম্রলিপি ও অন্বেষা প্রকাশনী ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের বই, অন্য প্রকাশ, পাঞ্জেরী, কথা প্রকাশসহ প্রায় নব্বই ভাগ স্টলে আওয়ামী লীগ নেতাদের কিংবা আওয়ামী লীগ নিয়ে গবেষণার বই ছিল। সেসব বই চোখে পড়েনি।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গ কথা বলে জানা গেছে, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষে বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি, জাতীয় জাদুঘর, নজরুল ইনস্টিটিউটসহ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুবিষয়ক বই প্রকাশের প্রতিযোগিতা ছিল। এমনও হয়েছে এক বই মোড়ক পরিবর্তন করে একাধিক স্থানে প্রকাশ করে বাজার ধরার চেষ্টা করেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এসব বই লুকিয়ে অনলাইনে বিক্রি অব্যাহত রাখে। তবে সামনে রেখে বিক্রি বন্ধ করে দেয়। ২০২৫ সালের বইমেলায় এসব প্রকাশকের ওপর ‘মব’ হয়। একাধিক প্রকাশককে জেলে যেতে হয়। অনেককে থাকতে হয়েছে আত্মগোপনে। বর্তমানে নতুন সরকার এলে পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হয়েছে তবে ভয় কাটেনি প্রকাশকদের। ফলে বড় অঙ্কের লোকসানে পড়তে হচ্ছে বলে নাম প্রকাশ না করা শর্তে জানান তারা।

বই রাখা না রাখা নিয়ে কোনো নির্দেশনা নেই : বাংলা একাডেমির সচিব ও মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য-সচিব ড. সেলিম রেজা যুগান্তরকে সোমবার সন্ধ্যায় জানান, অমর একুশে বইমেলায় মুজিববর্ষ উপলক্ষ্যে প্রকাশিত বই কিংবা বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ নেতাদের বই বাংলা একাডেমির নিজস্ব বিক্রয়কেন্দ্রে হয়তো নেই, তবে মেলায় এ রকম নির্দেশনা কাউকে দেওয়া হয়নি। স্টলে না রাখার বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ মনে করেন এসবের কারণ গালগল্পে ভরা বই।

তিনি বলেন, ‘এসব প্রকাশ্যে আনার বিষয়ে অনেকে বলছেন অর্থনৈতিক ক্ষতির কথা। কিন্তু লাভ তো কম হয়নি? তাই না?’ তবে প্রকাশকরা কেন আনছেন না তা প্রকাশকরাই ভালো বলতে পারবেন।

মাহবুব উল্লাহ বলেন, ‘আমি যতটুকু জানি এসব বই মেলায় আনা না আনা নিয়ে কোনো বাধা নেই।’ মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য-সচিব ড. সেলিম রেজা জানান, মেলার পঞ্চম দিনে বইমেলায় টাস্কফোর্সের ‘অভিযান’ চালানো হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটিকে ‘অভিযান’ না বলে নিয়মিত কার্যক্রম বলা যেতে পারে। তবে মেলায় বড় ধরনের কোনো অনিয়ম পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, ‘একটি স্টল নীতিমালা লঙ্ঘন করে নির্ধারিত উচ্চতার চেয়ে প্রায় এক ফুট বেশি উচ্চতায় নির্মাণ করেছিল। আমরা তা কমিয়ে দিতে নির্দেশনা দিয়েছি।’ স্টলে নাম জানতে চাইলে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের স্টলের কথা বলেন।

মেলামঞ্চে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় স্মরণ : সোমবার বিকালে মেলামঞ্চে সার্ধশত জন্মবর্ষ : শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় শীর্ষক আলোচনা হয়। প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে হামীম কামরুল হক বলেন, বাংলা সাহিত্যের এক কীর্তিস্তম্ভের নাম শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তার উপন্যাসগুলোর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল নারীজীবনের মুক্তি ও বৃহত্তর সমাজের কল্যাণ সাধন। পাঠকের চাহিদা পূরণ করে তিনি একের পর এক উপন্যাস লিখে গেছেন। দেশি-বিদেশি সাহিত্য, রাজনীতি, অর্থনীতি, চিকিৎসাবিজ্ঞানসহ বহু বিষয়ে তিনি নিবিড়ভাবে অধ্যয়ন করেছিলেন। পড়াশোনার মাধ্যমেই ইতিহাস, মনস্তত্ত্ব, সমাজ ও দর্শনের হালনাগাদ খোঁজখবর রাখতেন।

আলোচকের বক্তব্যে পারভেজ হোসেন বলেন, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে শরৎচন্দ্রের অবস্থান অত্যন্ত দৃঢ়। তার রচিত উপন্যাস পাঠের ব্যাপকতা আছে বলেই তিনি এত বড় ঔপন্যাসিক হয়ে উঠেছিলেন। তার উপন্যাসে জীবনের মহত্ত্ব যেমন আছে, তেমনি আছে অন্তর্বেদনা, নর-নারীর পাস্পরিক অনুভূতির টানাপোড়েন ও সমাজের নিপীড়িত মানুষের আর্তনাদ। তিনি অত্যন্ত সাবলীল ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে নারীর সামাজিক ও পারিবারিক অবস্থান ও তাদের মর্মবেদনা চিত্রায়িত করেছেন।

সভাপতির বক্তব্যে সফিকুন্নবী সামাদী বলেন, বাংলা কথাসাহিত্যে শরৎচন্দ্রের অবদানকে অস্বীকার করা প্রায় অসম্ভব। পরবর্তী অনেক বিখ্যাত লেখকসাহিত্যিকই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শরৎচন্দ্রের কাছে ঋণী। উপন্যাসের মধ্য দিয়ে তিনি তৎকালীন ভারতবর্ষের রাজনীতি, অর্থনীতি, শোষণ ও সমস্যাগুলো নিখুঁতভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। লেখক বলছি অনুষ্ঠানে নিজেদের বই নিয়ে আলোচনা করেন ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী ও এজাজ ইউসুফী।

আলোচনা শেষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আবৃত্তি পরিবেশন করেন শাহনাজ পারভীন লিপি, শামীমা চৌধুরী, রোকসানা আক্তার এবং ঝর্ণা আলমগীর। সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী শিমু দে, অণিমা রায়, ফাহিম হোসেন চৌধুরী, পাপড়ি বড়ুয়া, ফারাহ হাসান মৌটুসী ও খোকন চন্দ্র দাস। যন্ত্রাণুষঙ্গে ছিলেন কাজী মো. ইমতিয়াজ সুলতান (তবলা), এবিএম তানভীর আলম সজীব (কিবোর্ড), গাজী আবদুল হাকিম (বাঁশি) ও মো. ফারুক (অক্টোপ্যাড)।

বইমেলায় শামীম হোসেনের ‘দোলায়িত নদীগাছ’ : রাজশাহী ব্যুরো জানায়, প্রকাশিত হয়েছে শামীম হোসেনের কবিতার নতুন বই ‘দোলায়িত নদীগাছ’। গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে চন্দ্রবিন্দু। প্রচ্ছদ করেছেন রাজীব দত্ত। কবি শামীম হোসেন বলেন, ‘দোলায়িত নদীগাছ’ পাঁচ বছর বিরতির পর বেরোলো। এ বইতে রয়েছে বিশেষ কিছু কবিতা, যা পাঠককে ভাবিবে তুলবে।

আজকের বইমেলা : আজ মেলা শুরু হবে দুপুর ২টায় এবং চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। বিকাল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে জন্মশতবর্ষ : তাজউদ্দীন আহমদ। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন মহিউদ্দিন আহমদ। আলোচনায় অংশ নেবেন সাজ্জাদ সিদ্দিকী। সভাপতিত্ব করবেন অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান। বিকাল ৪টায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

সোস্যাল মিডিয়াতে নিউজটি শেয়ার করুন

আরও পড়ুন
© All rights reserved © 2025. Bangalir Khobor
Developed by Tiger Infotech