।।বিকে ডেস্ক।।
রংপুর নগরীতে তালাবদ্ধ একটি বাড়ি থেকে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক, তার স্ত্রী ও ছেলে-মেয়েসহ চারজনের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ।
শনিবার ২৩ আগস্ট রাত সাড়ে ১১টার দিকে নগরীর দাসপাড়া (মাছুয়াপাড়া) এলাকা থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রংপুর মেট্রোপলিটন কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল কাদের ।
নিহতরা হলেন—রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৩) ও ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তী (১২)।
জানা গেছে, নিহত গণপতি চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক। গত বছর শিক্ষকতা থেকে অবসর নেওয়ার পর নগরীর সমবায় মার্কেটে একটি হোমিওপ্যাথি চেম্বারে নিয়মিত চিকিৎসাসেবা দিতেন। তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী পরিবারের সঙ্গে থাকতেন। মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করেছিলেন। আর ছোট ছেলে ছিল রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
স্থানীয়রা জানান, বাড়িটি কয়েক দিন ধরেই তালাবদ্ধ ছিল। পরিবারটি সম্প্রতি বাড়িটির দোতলায় বসবাস শুরু করেছিল। নিচতলা তখনো নির্মাণাধীন। নতুন এলাকায় হওয়ায় প্রতিবেশীদের সঙ্গেও পরিবারের খুব বেশি ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়নি। কয়েক দিন ধরে পরিবারের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে একপর্যায়ে প্রীতিলতার বোন পূজা চক্রবর্তী সেখানে আসেন। বাড়িতে তালা দেখে ডাকাডাকি করেও কোনো সাড়া না পেয়ে তিনি পুলিশকে খবর দেন। পুলিশ এসে ফটক বন্ধ পেয়ে ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেয়।
পরে ফায়ার সার্ভিসের সহায়তায় ভাঙা হয় ঘরের দরজা। ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে একের পর এক মরদেহ। কারো মরদেহ সিঁড়ির কাছে, কারো খাটের নিচে, আবার সাবেক শিক্ষকের মরদেহ পড়েছিল ছাদের এক প্রান্তে। এভাবেই সামনে আসে রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় একই পরিবারের চারজনের রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনা।
পুলিশের ধারণা, চারজনকেই শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। বাড়ির ভেতরের জিনিসপত্র তছনছ এবং টাকা-পয়সা ও গয়না রাখার স্থান ভাঙা থাকায় ঘটনাটি ডাকাতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হতে পারে বলে ধারণা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে শুধু ডাকাতিই ছিল, নাকি এর আড়ালে অন্য কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সিআইডির প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডটি তিন থেকে চারদিন আগে ঘটে থাকতে পারে। ফলে এতটা সময় ধরে একটি পরিবার নিখোঁজ থাকার বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ঘটনাস্থলের সবচেয়ে ভয়াবহ দিকগুলোর একটি হলো, চারজনের মরদেহ এক জায়গায় ছিল না।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গণপতি চক্রবর্তী ও তার স্ত্রী প্রীতিলতার মরদেহ পাওয়া যায় দোতলার সিঁড়ির কাছে। মেয়ে প্রার্থীর মরদেহও সেখানে ছিল বলে জানানো হয়েছে। আর ছোট ছেলে আয়ুসের মরদেহ পাওয়া যায় একটি কক্ষের খাটের নিচে। গণপতি চক্রবর্তীর মরদেহ ছাদের এক প্রান্তে পড়েছিল বলেও পুলিশ জানিয়েছে। ঘরের ভেতর ছিল পচা লাশের তীব্র গন্ধ। কাপড়চোপড় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। মেঝেতে পড়েছিল গয়নার বাক্স। বিভিন্ন জিনিসপত্র এলোমেলো অবস্থায় পড়ে থাকায় প্রথম দেখাতেই ডাকাতির আলামত বলে মনে হয়েছে তদন্তকারীদের কাছে। তবে একটা প্রশ্নও উঠছে। ডাকাতির ঘটনা হলে পরিবারের চার সদস্যকে কেন এভাবে আলাদা আলাদা স্থানে পাওয়া গেল? তারা কি ডাকাতদের বাধা দিয়েছিলেন? নাকি হত্যাকারীদের উদ্দেশ্য ছিল শুধু লুটপাট নয়, আরও কিছু?
রংপুর মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (গোয়েন্দা) সনাতন চক্রবর্তী জানান, নিহতদের গলায় দড়ি প্যাঁচানো অবস্থায় পাওয়া গেছে। পুরো বাড়ি তছনছ করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ডাকাতির বিষয়টি সামনে রেখে তদন্ত করা হচ্ছে।
ঘটনার পর ঘটনাস্থলে গোয়েন্দা পুলিশ, সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিটসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক দল কাজ করেছে। তারা বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং ক্রাইম সিন বিশ্লেষণের পর মৃত্যুর সময় ও হত্যার ধরন সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
প্রীতিলতার ছোট বোন পূজা চক্রবর্তী বলেন, বৃহস্পতিবার বিকেলে দিদির সঙ্গে সর্বশেষ কথা হয়েছিল। ওইদিন রাত থেকে তাদের পরিবারের চারটি মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। শনিবার রাতে মোবাইল বন্ধ পেয়ে আমরা রংপুর নগরীর দাসপাড়া (মাছুয়াপাড়া) এলাকায় ছুটে আসি। বাড়ির প্রধান ফটক তালাবদ্ধ ছিল এবং ভেতরের সব বৈদ্যুতিক বাতি নেভানো ছিল। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে তালা ভেঙে বাড়ির ভেতরে ঢুকে মরদেহগুলো উদ্ধার করে।
তিনি বলেন, কারা, কেন, কখন, কীভাবে আমার দিদিসহ তার পরিবারের সবাইকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে, সেটা বুঝতে পারছি না। আমার দিদির স্বামী খুবই ভালো মানুষ ছিলেন। তার কোনো শত্রু ছিল না। তারা দাসপাড়া এলাকায় নতুন বাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করছিলেন।
গণপতি চক্রবর্তীর ভাতিজি সোমা চক্রবর্তী বলেন, কাকার সঙ্গে বৃহস্পতিবার বিকেলে কথা হয়েছিল। শনিবার রাতে খবর পেয়ে এসে দেখি তার মরদেহ। সঙ্গে কাকিমা, বোন ও ভাইয়ের মরদেহও পড়ে আছে। আমার কাকার কোনো শত্রু ছিল না। তিনি স্কুল থেকে অবসর নেওয়ার পর হোমিও চিকিৎসক হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন।
ওসি নাজমুল কাদের বলেন, পুলিশ, সিআইডি ও ডিবি তদন্ত শুরু করেছে। আপাতত আমরা চারজনের মরদেহ উদ্ধার করেছি। এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছুই উদঘাটন করতে পারিনি।
রংপুর মহানগর সিআইডির ইনচার্জ সুবীর চৌধুরী বলেন, চারটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। মা ও মেয়ের মরদেহ সিঁড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়। সাবেক স্কুলশিক্ষকের মরদেহ পাওয়া গেছে বাড়ির ছাদে এবং তার স্কুলশিক্ষার্থী ছেলের মরদেহ পাওয়া গেছে খাটের নিচে।
তিনি আরও বলেন, আমরা তদন্ত করছি। তদন্তে জানা যাবে কারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। সংকলিত।