।।বিকে ডেস্ক।।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত বিতর্কিত বিলের প্রতিবাদে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক বর্জন করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
রবিবার ৩০ আগস্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে জামায়াতের দুই সদস্য ড. মো. নাজিবুর রহমান ও অ্যাডভোকেট আল ফারুক আবদুল লতিফ উপস্থিত থাকলেও বিলটি পর্যালোচনার জন্য উত্থাপনের পর তারা বৈঠক বর্জনের সিদ্ধান্ত নেন।
বৈঠক বর্জনের কারণ ব্যাখ্যা করে জামায়াতে ইসলামীর সংসদীয় দলের মুখপাত্র ড. মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান বলেন, ‘বহু বিতর্কিত জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সংক্রান্ত বিলটি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কনভেনশন ও বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ নিয়ে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন অংশীজন ও সুধী সমাজও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।’
তিনি বলেন, বিলটি সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানোর পর কমিটিকে মাত্র দুই দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। অথচ এই ধরনের একটি গুরুত্বপূর্ণ আইন পর্যালোচনার ক্ষেত্রে অংশীজন, মানবাধিকারকর্মী এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে মতবিনিময়ের সুযোগ থাকা প্রয়োজন।
জামায়াতের এই নেতা বলেন, মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত আগের অধ্যাদেশ বাতিলের পর সরকার আরও শক্তিশালী একটি আইন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি, নতুন করে যে আইনটি আনা হয়েছে, সেটিকে আরও দুর্বল করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলে কমিশনের স্বাধীনভাবে তদন্ত করার ক্ষমতাও সীমিত করা হয়েছে।
নাজিবুর রহমান অভিযোগ করেন, এভাবে তড়িঘড়ি করে বিলটি পাস করানোর প্রক্রিয়ায় সংসদীয় স্থায়ী কমিটিকে রবার স্ট্যাম্পে পরিণত করা হচ্ছে। আমরা এ ধরনের প্রক্রিয়ার অংশ হতে চাই না এবং এর কোনো দায়ভারও নিতে চাই না।
তিনি বলেন, মানবাধিকার রক্ষার কথা বলা হলেও প্রস্তাবিত আইনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে জনগণের অধিকার সুরক্ষার যথেষ্ট ব্যবস্থা রাখা হয়নি। সে কারণে আমরা এটিকে একটি কালো আইন হিসেবে দেখছি।
বৈঠকের আগে সংসদে বিলটি নিয়ে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ ছিল কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে নাজিবুর রহমান বলেন, এই আইন নিয়ে আজকে নতুন করে আলোচনা হচ্ছে না। এটি আগে অধ্যাদেশ আকারে ছিল। সেই অধ্যাদেশ বাতিলের সময়ও আমরা আপত্তি জানিয়েছি এবং নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছি। কিন্তু আমাদের কোনো বক্তব্যই আমলে নেওয়া হয়নি।
সংসদে বিরোধী দলের সদস্যদের মতপ্রকাশের সুযোগ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন জামায়াতের এই নেতা।
তিনি বলেন, সংসদে বিরোধী দলের মত দমন করার জন্য হুমকির পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, ওই পাশে যারা আছেন, তারা আপনাদের তিনগুণ। আপনারা যদি শব্দ করেন, তারাও শব্দ করবেন। এ ধরনের বক্তব্য সংসদ সদস্য হিসেবে আমাদের কথা বলার অধিকার ও মর্যাদাকে আঘাত করছে।
নাজিবুর রহমান আরও বলেন, ‘সেদিন সংসদ থেকে আমরা যে ওয়াকআউট করেছিলাম, সেটিও ছিল এই সংসদীয় ফ্যাসিবাদের প্রতিবাদে। মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত বিল নিয়ে সংসদের ভেতরে-বাইরে এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষ কমিটির রিপোর্টেও আমাদের বক্তব্য রয়েছে। কিন্তু সরকার সেগুলো আমলে নিচ্ছে না।
নাজিবুর রহমান বলেন, এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে আমরা যুক্ত থাকতে চাই না। তাই আজকের স্থায়ী কমিটির বৈঠক আমরা বর্জন করেছি। সংসদেও এই আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়ার সঙ্গে আমরা সম্পৃক্ত হব না এবং এর প্রতিবাদ অব্যাহত রাখব।
বর্জন করে আসার সময় আমরা সুস্পষ্ট বক্তব্য দিয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, যেহেতু সরকার ভুক্তভোগী জনগণ, অংশীজন এবং দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতামত উপেক্ষা করে একতরফাভাবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ-২০২৫ রহিত করেছে।
যেহেতু অধ্যাদেশটি বাতিলের সভায় সরকার আরও শক্তিশালী ও কার্যকর আইন প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তার চেয়ে দুর্বল এবং সীমিত পরিসরে একটি বিল সংসদে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রস্তাবিত বিলটি জাতীয় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈশ্বিক যে জোট রয়েছে (GANHRI নামে পরিচিত), এর স্বীকৃত মানদণ্ড, প্যারিস প্রিন্সিপলস এবং প্রাসঙ্গিক আন্তর্জাতিক কনভেনশন ও ঘোষণাগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তিনি আরও বলেন, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক স্থায়ী কমিটিকে মাত্র দুই কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে জনগণের সঙ্গে যথাযথ মতবিনিময় এবং স্বাধীনভাবে বিলটি পর্যালোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ কার্যত সীমিত করা হয়েছে। ফলে কমিটিকে একটি রাবার স্ট্যাম্পে পরিণত করার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। সেহেতু আমরা কমিটির বিরোধীদলীয় সদস্যরা এই বিলের কোনো আলোচনা বা পর্যালোচনায় অংশ না নেওয়া এবং বিলটি পাসের প্রক্রিয়ার কোনো পর্যায়ে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং বৈঠকে আর না থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা বক্তব্য দিয়ে কোনো আলোচনায় অংশ নিইনি। বৈঠক থেকে আমরা চলে এসেছি।