।।বিকে রিপোর্ট।।
জুলাই আন্দোলনের সময় কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার ৩০ জুন দুপুর ২টা ৩০ মিনিটের দিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন।
প্যানেলের অপর সদস্যরা হলেন- বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
এদিন দুপুর ১টা ৪২ মিনিটে মামলার একমাত্র আসামি ইনুকে হাজতখানা থেকে ট্রাইব্যুনালের এজলাসকক্ষে থাকা কাঠগড়ায় তোলা হয়। এর ১০ মিনিট পর ২১১ পৃষ্ঠার রায় পড়া শুরু হয়।
ইনুর বিরুদ্ধে আনা আটটি অভিযোগ পড়েন ট্রাইব্যুনাল-২ এর দ্বিতীয় সদস্য বিচারক শাহরিয়ার কবীর। সাক্ষীদের কিছু বিবরণ ও তথ্যপ্রমাণের দিক তুলে ধরেন প্রথম সদস্য মঞ্জুরুল বাছিদ। রায়ের পুরো কার্যক্রম বাংলাদেশ টেলিভিশনের সরাসরি সম্প্রচার করা হয়েছে।
হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে আনীত মোট আটটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে ট্রাইব্যুনাল এই দণ্ডাদেশ দেন। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের পর থেকে শুরু হওয়া বিচারিক কার্যক্রম, সাক্ষ্যগ্রহণ এবং যুক্তিতর্ক শেষে আদালত আজ এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলেন।
মামলার নথিপত্র অনুযায়ী, হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে নির্মমভাবে হত্যার নির্দেশ প্রদানসহ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচার হামলার উসকানি দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।
প্রসিকিউশন কর্তৃক উপস্থাপিত তথ্যমতে, ১৮ জুলাই ভারতীয় গণমাধ্যমে আন্দোলনকারীদের ‘সন্ত্রাসী’ ও ‘সাম্প্রদায়িক’ আখ্যা দিয়ে তিনি যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, তা ছিল মূলত সহিংসতা প্ররোচনার শামিল। এ ছাড়া ১৯ জুলাই অনুষ্ঠিত ১৪-দলীয় জোটের সভায় ‘শুট অ্যাট সাইট’ বা দেখামাত্র গুলির সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নে তার সক্রিয় ভূমিকা ছিল বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়।
তদন্ত প্রতিবেদন ও মামলার শুনানিতে উঠে এসেছে যে, কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে ফোন করে আন্দোলনকারীদের তালিকা তৈরি, তাদের আটক ও নির্যাতনের নির্দেশ প্রদানের পেছনেও ইনুর প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা ছিল। শুধু তাই নয়, হেলিকপ্টার ব্যবহার করে বম্বিং ও মারণাস্ত্র প্রয়োগের পরিকল্পনাসহ আন্দোলন দমনে বিভিন্ন ধরনের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডে তার সংশ্লিষ্টতার অকাট্য প্রমাণ ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হয়। প্রসিকিউশন পক্ষ থেকে মামলায় ১০ জন সাক্ষী হাজির করা হয়েছিল, যার বিপরীতে আসামিপক্ষ দুজন সাফাই সাক্ষী উপস্থাপন করে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা করে।
বিশেষ করে ৫ আগস্ট কুষ্টিয়া শহরে ইউসুফ শেখ, উসামা, সুরুজ আলী, আশরাফুল ইসলাম, বাবলু ফরাজী ও আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন-এই ছয়জনকে হত্যার নির্দেশনা এবং সারা দেশে ১ হাজার ৪০০ মানুষকে প্রাণঘাতী হামলা ও ২৫ হাজারের বেশি ছাত্র–জনতাকে আহত করার পেছনে ইনুর দায়বদ্ধতা আদালতের কাছে স্পষ্ট হয়েছে।
বিগত ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ তদন্ত শুরুর পর দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ষষ্ঠ মামলার রায়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এই রায় প্রদান করলেন।
উল্লেখ্য, গত বছরের ২৫ মার্চ ইনুর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়। তদন্ত সংস্থা প্রসিকিউশনের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয় গত বছরের ১১ সেপ্টেম্বর। প্রসিকিউশন ২৫ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করলে ওই দিনই ট্রাইব্যুনাল তা আমলে নেন। অভিযোগ গঠন করা হয় ২ নভেম্বর। আর সূচনা বক্তব্য শুরু হয় ৩০ নভেম্বর।
ইনুর বিরুদ্ধে মামলার তদন্ত কর্মকর্তাসহ ১০ জন সাক্ষী দিয়েছেন। আর আসামিপক্ষে দুজন সাফাই সাক্ষ্য দেন। যুক্তিতর্ক শুরু হয় চলতি বছরের ১৩ এপ্রিল। যুক্তিতর্ক শেষ হলে ১৩ মে থেকে রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়। এই মামলায় হাসানুল হক ইনু একমাত্র আসামি। তিনি গ্রেফতার হয়ে কারাগারে রয়েছেন।