।।বিকে ডেস্ক।।
চট্টগ্রাম নগরীর লালদীঘির পাড়ে জেলা পরিষদ ভবনে অবস্থিত অগ্রণী ব্যাংক করপোরেট শাখার ক্যাশ ভল্ট থেকে ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকার গরমিল ও হদিস না পাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
এ ঘটনায় গত ১০ আগস্ট ব্যাংকের করপোরেট শাখার জেনারেল ম্যানেজার মোস্তাক আহমেদ বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় একটি মামল করেন।
মামলার পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে দুজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করেছে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- ব্যাংকের সিনিয়র কর্মকর্তা ও ক্যাশ ইনচার্জ মো. কামরুল হোসেন (৪১) এবং মো. জাফরুল্লাহ তানভীর (২৫)। মামলায় আরও দুজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার এজাহারে বলা হয়, কামরুল হোসেন ওই শাখার ক্যাশ ও ভল্টের দায়িত্বে ছিলেন। গত ৯ আগস্ট নিয়মিত ব্যাংকিং কার্যক্রম ও লেনদেন শেষে নগদ অর্থের হিসাব মেলাতে গিয়ে ভল্টে সংরক্ষিত অর্থে গরমিল ধরা পড়ে। পরে ভল্টের হিসাব, সংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্র ও নথি যাচাই করে ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকার ঘাটতি পাওয়া যায়। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ বিষয়ে জানতে চাইলে কামরুল হোসেন কোনো সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেননি।
তদন্ত কর্মকর্তা ও কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. ইকবাল হোসেন জানান, ব্যাংকের ভল্ট থেকে টাকা সরিয়ে তা ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হয়েছিল। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে কামরুল হোসেন জানান, ভল্টে টাকা জমা দেওয়ার সময় ১ হাজার টাকার বড় বান্ডিলের ভেতরে ১০০ টাকা বা তার কম মূল্যমানের ছোট নোট ঢুকিয়ে বান্ডিল সাজানো হতো। ফলে, বাইরে থেকে দেখে বান্ডিল পূর্ণ মনে হলেও বাস্তবে ভল্টে টাকার পরিমাণ কম থাকত।
পুলিশের তদন্তে আরও উঠে আসে, অন্য আসামি জাফরুল্লাহ তানভীরের সহযোগিতায় ওই অর্থ ব্যবসায়ে খাটানো হয়। হাটহাজারীর উত্তর বুড়িশ্চর এলাকায় ‘ইশরাত অ্যাগ্রো’ নামে একটি গরুর খামার গড়ে তোলা হয়, যেখানে বর্তমানে বিভিন্ন জাতের ৬০টি গরু রয়েছে। মামলার পর পুলিশ দুই আসামির ব্যবহার করা দুটি মোবাইল ফোন, হোয়াটসঅ্যাপের যোগাযোগ ও তথ্য রেকর্ডসহ ৬৪ জিবি ক্ষমতার একটি পেনড্রাইভ জব্দ করেছে।
এদিকে, মামলার অন্য আসামি জাফরুল্লাহ তানভীরের বাবা আজিম উল্লাহ ছেলেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করেছেন। সাংবাদিকদের তিনি জানান, তার ছেলে কোনো ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারী বা অগ্রণী ব্যাংকের লালদীঘি শাখার গ্রাহকও নন। তিনি আগে থেকেই নিজস্ব উদ্যোগে গরুর খামারের ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন।
তার দাবি, ক্যাশ ইনচার্জ কামরুল হোসেন গত ৯ আগস্ট রাতে ফোন করে তার ছেলেকে ব্যাংকে ডেকে নেন এবং পরবর্তী সময়ে পুলিশ দিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করান। তার ছেলেকে পরিকল্পিতভাবে এ ঘটনায় ফাঁসানো হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
পুলিশ ও ব্যাংকের উচ্চপদস্থদের ভাষ্য, ভল্টে ১০০ টাকার নোট রেখে ১ হাজার টাকার নোট সরানো হয়। কিন্তু ১৪ মাস ধরে টাকা সরানো হলেও সেটি উচ্চপদস্থদের জানতে এত সময় লাগল কেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাছাড়া বিষয়টি ধরা পড়ার পরও তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি পুলিশকে না জানিয়ে ব্যাংক কর্মকর্তারা নিজেরাই তা মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা করেন; কিন্তু জাফর উল্লাহ তানভীরকে ব্যাংকে আটকে রাখার ঘটনা জানার পর তার বাবাই পুলিশ নিয়ে ব্যাংকে হাজির হন।
ব্যাংকের বিভিন্ন শাখার কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ওই শাখার ব্যবস্থাপক ও মহাব্যবস্থাপক ছাড়া ভল্টের টাকা সরানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কাজেই মহাব্যবস্থাপক মোস্তাক আহমেদ এ দায় এড়াতে পারেন না। অথচ এ ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার তিনিই বাদী। একাধিক ব্যাংক কর্মকর্তা বলেছেন, ক্যাশ ইনচার্জের ওপর দায় চাপিয়ে ওই শাখার উচ্চপদস্থরা পার পাওয়ার চেষ্টা করছেন।
বিষয়টি নিয়ে কথা বলার জন্য গতকাল বৃহস্পতিবার লালদীঘি জোনাল শাখার মহাব্যবস্থাপক মোস্তাক আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি মোবাইল ফোন রিসিভ করেননি। লালদীঘি পূর্ব করপোরেট শাখার উপমহাব্যবস্থাপক এবিএম সাইফুদ্দিন খান চৌধুরীকে কয়েকবার কল দিলেও তিনি সাড়া দেননি। একপর্যায়ে সরাসরি ব্যাংকের ওই শাখায় গেলেও ঢুকতে দেওয়া হয়নি। ডেস্কে বসা একজন কর্মকর্তা জানালেন, ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে এসব বিষয়ে কথা বলতে নিষেধ করা হয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তা মো. ইকবাল হোসেন জানান, ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা রুজু করা হয়েছে এবং দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতরা ইতোমধ্যে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। মামলার অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে এবং ঘটনার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। সূত্র-আমাদের সময়।