।।বিকে ডেস্ক।।
জ্বালানি সংকট ও এলএনজি টার্মিনালে বিঘ্ন ঘটায় দেশজুড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ধস নেমেছে এবং তীব্র লোডশেডিং দেখা দিয়েছে। বর্তমান জাতীয় চাহিদা প্রায় ১৫,০০০ থেকে ১৫,৩০০ মেগাওয়াটের বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে [১২, ৯০০ মেগাওয়াটের কাছাকাছি], যার ফলে দুই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি ঘাটতি তৈরি হয়ে গ্রামে ও মফস্বলে দীর্ঘসময় লোডশেডিং হচ্ছে।
গ্যাস-কয়লার সরবরাহে টান, এলএনজি টার্মিনালে জটিলতা এবং বিদ্যুৎ আমদানি কমে যাওয়ায় একযোগে চাপে পড়েছে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন। বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যখন ১৮-১৯ হাজার মেগাওয়াটে উঠেছে, তখন জ্বালানি সংকটে সক্ষমতার বড় অংশ কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
ফলে জাতীয় গ্রিডে তৈরি হচ্ছে ভয়াবহ ঘাটতি; কয়েক দিন ধরে সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছাড়িয়ে যাচ্ছে ৩ হাজার মেগাওয়াট। কোনো কোনো সময়ে ঘাটতি ৩ হাজার ৭০০ মেগাওয়াটের কাছাকাছিও পৌঁছাচ্ছে।
শহরের তুলনায় পরিস্থিতি আরও নাজুক পল্লী এলাকায়। দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ বিদ্যুৎ গ্রাহক পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতায় থাকলেও চাহিদার তুলনায় তারা ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত কম বিদ্যুৎ বরাদ্দ পাচ্ছে। ফলে কোথাও ৮-১২ ঘণ্টা, আবার কোথাও ১৭-১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। নেত্রকোনার কোনো কোনো এলাকায় গ্রাহক পর্যায়ে ৭২-৭৯ শতাংশ পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের তথ্যও দিয়েছে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। তীব্র গরমে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষ। ব্যাহত হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রা।
লোডশেডিং ঘিরে এরই মধ্যে বিভিন্ন এলাকায় ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। টাঙ্গাইল, দিনাজপুর ও পাবনায় বিদ্যুৎ অফিসে হামলা, ভাঙচুর এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবরুদ্ধ করার ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কায় দেশের ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির অফিস, গ্রিড, উপকেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশ মহাপরিদর্শকের কাছে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশন। অর্থাৎ জ্বালানি সংকটের অভিঘাত এখন শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহেই সীমাবদ্ধ নেই; তা মাঠপর্যায়ে জননিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার জন্যও নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে।
তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি ঘাটতি : জাতীয় গ্রিডের তথ্য বলছে, গতকাল বুধবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রায় প্রতি ঘণ্টাতেই দুই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াটের ঘাটতি ছিল। বিকাল ৫টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ২৩৬ মেগাওয়াট। সরবরাহ হয়েছে ১৩ হাজার ৫৭২ মেগাওয়াট। ঘাটতি ছিল ২ হাজার ৬৬৪ মেগাওয়াট। বিকাল ৩টায় চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ২৩৭ মেগাওয়াট। সরবরাহ হয়েছে ১৩ হাজার ৮৫৫ মেগাওয়াট। ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৩৮২ মেগাওয়াট।
আগের দিন রাতের দিকে ঘাটতি আরও বেশি ছিল। রাত ২টায় চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৩৪৬ মেগাওয়াট। সরবরাহ হয়েছে ১৩ হাজার ২৩০ মেগাওয়াট। লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ১১৬ মেগাওয়াট। রাত ৩টায় ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৫৬ মেগাওয়াট। ভোর ৪টায় ২ হাজার ৯৫১ মেগাওয়াট।
এর আগের দিনগুলোতেও সর্বোচ্চ লোডশেডিং ৩ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। সোমবার রাত ৮টা পর্যন্ত সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট। এর আগের দিন ছিল ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট।
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু সক্ষমতা থাকলেও প্রয়োজনের সময় তা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। জ্বালানি সংকটই এর বড় কারণ।
গ্যাসে বড় ধাক্কা : বিদ্যুৎ উৎপাদনে সবচেয়ে বড় চাপ তৈরি হয়েছে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায়। মহেশখালীর সামিটের ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে বৈরী আবহাওয়ার কারণে নতুন কার্গো খালাস করা যাচ্ছে না। ফলে সেখান থেকে গ্যাস সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় ২০ কোটি ঘনফুটে।
এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালও চলছে আংশিক সক্ষমতায়। বয়লার-সংক্রান্ত সমস্যার কারণে টার্মিনালটি প্রায় ৫০ শতাংশ সক্ষমতায় চলছে। বর্তমানে সেখান থেকে দৈনিক প্রায় ২০ থেকে ২২ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে। স্বাভাবিক সময়ে এই টার্মিনালের সক্ষমতা ৫৫ থেকে ৬০ কোটি ঘনফুট।
দুটি টার্মিনাল মিলিয়ে জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ এখন প্রায় ৪১ কোটি ঘনফুট। আগামী ১৫ আগস্ট নতুন কার্গো যুক্ত না হওয়া পর্যন্ত সামিটের টার্মিনাল থেকে সরবরাহ বাড়ার সম্ভাবনা কম।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ২২০ কোটি ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে দেওয়া হয় ১০০ থেকে ১১০ কোটি ঘনফুট। এলএনজি সংকটে তা ৭০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমেছিল। গতকাল তা বাড়িয়ে প্রায় ৮০ কোটি ঘনফুট করা হয়েছে।
কয়লা ও আমদানিতেও সংকট : শুধু গ্যাস নয়, কয়লা সরবরাহেও সমস্যা তৈরি হয়েছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে কয়লা খালাসে বিঘ্ন ঘটেছে। ফলে বড় কয়েকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না।
পটুয়াখালীর নোরিংকো বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কমেছে। পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রেও উৎপাদনে চাপ রয়েছে। একই সময়ে জাতীয় গ্রিডের কারিগরি ও সরবরাহ সমস্যার কারণে ভারতের আদানি পাওয়ার থেকেও বিদ্যুৎ আমদানি মঙ্গলবার মধ্যরাত থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ফলে গ্যাস, কয়লা, তেল ও আমদানি সব উৎসেই কোনো না কোনো বাধা তৈরি হয়েছে। এর বিপরীতে তীব্র গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়েছে।
পিডিবি চেয়ারম্যান রেজাউল করিমের ভাষ্য, গত বছর একই সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ থেকে ১৬ হাজার মেগাওয়াট। এবার তা বেড়ে ১৮ থেকে ১৯ হাজার মেগাওয়াটে উঠেছে। গ্যাস না থাকায় অনেক কারখানা গ্রিডের বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে। বাসাবাড়িতেও লাইনের গ্যাস না থাকায় বৈদ্যুতিক চুলার ব্যবহার বেড়েছে।
পল্লী এলাকায় ভয়াবহ দুর্ভোগ : দেশের মোট প্রায় ৫ কোটি ২০ লাখ বিদ্যুৎ গ্রাহকের মধ্যে প্রায় ৪ কোটি গ্রাহক পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতায়। অর্থাৎ মোট গ্রাহকের প্রায় ৮০ শতাংশ। উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ৬০ শতাংশও এসব এলাকায় সরবরাহ করা হয়।
পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক দিন ধরে সমিতিগুলোর গড় চাহিদা ৮ থেকে ৯ হাজার মেগাওয়াট। বিপরীতে বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৫ থেকে ৬ হাজার মেগাওয়াট। ফলে কোথাও ৮, কোথাও ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে।
গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে ২৪ ঘণ্টায় ১২ ঘণ্টারও কম বিদ্যুৎ পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। গোপালগঞ্জে পরিস্থিতি আরও খারাপ। জেলা শহরে প্রায় ১৭ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকার কথা জানিয়েছে গ্রাহকরা। সেখানে চাহিদা প্রায় ১৮ মেগাওয়াট। বিপরীতে বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে ৯ থেকে ১০ মেগাওয়াট।
নেত্রকোনায় সংকটের মাত্রা আরও বেশি। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির হিসাবে, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমে যাওয়ায় গ্রাহক পর্যায়ে ৭২ থেকে ৭৯ শতাংশ পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। ১৫৭ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে বিভিন্ন সময়ে সরবরাহ মিলেছে প্রায় অর্ধেক।
দীর্ঘ সময় ফিডার বন্ধ থাকার পর বিদ্যুৎ এলে ফ্রিজ, পানির পাম্প, আইপিএসসহ বিভিন্ন যন্ত্র একসঙ্গে চালু হয়। এতে হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যায়। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়।